ঢাবিতে নতুন ‘উইচ-হান্টিং’ ও ক্ষমতার রাজনীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ ব্যানারে ২৩১ জন শিক্ষকের একটি তালিকা উপাচার্যের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘নীল দল’কে নিষিদ্ধ করার জোর আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক সিন্ডিকেট সভায় এরই মধ্যে তিনজন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং চারজনকে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সমর্থিত অন্তত ৬৮ শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
এ উদ্যোগগুলোর পেছনে প্রধানত বিএনপিপন্থী ‘সাদা দল’ ও জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সদ্য গঠিত ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক’ (ইউটিএল)-এর প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। যদিও সাদা দলের একটি অংশ ২৩১ জনের এ তালিকার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে; কিন্তু সার্বিক প্রক্রিয়ায় তাদের রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম খোঁজার উদ্দেশ্যে তদন্ত কমিটি গঠন এ প্রতিশোধমূলক উদ্যোগেরই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিগত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের চরম স্বৈরাচারী আমলে সাদা দলের ভূমিকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি-সচেতন মহলে গভীর প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে। আওয়ামী শাসনামলে যখন ভিন্নমতের ওপর নিপীড়ন চরমে পৌঁছেছিল, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমুখী ইস্যুতে শিক্ষার্থীরা যখন ছাত্রলীগের হাতে নির্মমভাবে প্রহৃত হচ্ছিল, তখন সাদা দল প্রায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়, নীরব ও ভীতু ভূমিকা পালন করেছে।
সাদা দলের তিন শতাধিক সদস্য থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের ব্যানারে কোনো দৃশ্যমান প্রতিরোধ কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের মাত্র ১০-১২ জন শিক্ষক যখন নানা ঝুঁকি নিয়ে ক্ষমতাশীলদের রোষানলে পড়েছেন, প্রমোশন আটকানোসহ প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে লাগাতার রাজপথে আন্দোলন ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তখন সাদা দলের শিক্ষকরা শুধু আনুষ্ঠানিক নির্বাচনে প্যানেল জমা দিয়ে বিপুল ব্যবধানে হেরে চুপচাপ বসে থাকতেন।
২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন কিংবা পরবর্তী বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সতর্ক, অনাগ্রহী ও সীমিত। এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শেষভাগে, গণঅভ্যুত্থান যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখনই শুধু তাদের ব্যানার নিয়ে রাজপথে সোচ্চার হতে দেখা যায়।
প্রতিকূল পরিবেশে দাঁড়িয়ে যারা সাধারণ নীতিগত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, আজ নতুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সরকারি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সুবিধা পেয়ে তারা ঢালাও প্রতিশোধমূলক আচরণে অবতীর্ণ হয়েছেন
যারা গত দেড় দশকে চরম নীরবতা পালন করেছেন এবং রাজনৈতিক ও আইনি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও তরুণ বা সহকর্মী শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াতে সাহস পাননি, ক্ষমতার পরিবর্তন হতেই শত শত শিক্ষকের তালিকা তৈরি করা কিংবা পুরো নীল দলকে নিষিদ্ধ করার মতো ‘সাহসী’ ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছেন। তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিকূল পরিবেশে দাঁড়িয়ে যারা সাধারণ নীতিগত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, আজ নতুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সরকারি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সুবিধা পেয়ে তারা ঢালাও প্রতিশোধমূলক আচরণে অবতীর্ণ হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বাধীন, উদার ও গণতান্ত্রিক মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্র। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা বা ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সহযোগী হওয়া আর সরাসরি ফৌজদারি অপরাধে লিপ্ত হওয়া— দুটি কোনোভাবেই এক বিষয় নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ অনুসারে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। নীল দলের শিক্ষকরা বিগত সরকারের আমলে দলীয় আনুগত্য দেখিয়েছেন কিংবা সুবিধাভোগী ছিলেন, যা নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কঠোর সমালোচনার যোগ্য। তবে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শত শত শিক্ষককে ঢালাওভাবে বাতিল বা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও মৌলিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
স্বৈরাচারী সরকারের দোসরদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মোকাবিলা করাই সঠিক গণতান্ত্রিক পথ। প্রশাসন এক দলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে আর শিক্ষক সমিতি বা বিরোধী মতামত ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের হাতে থাকবে— এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করে। কিন্তু পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী নীল দলের মতোই যদি নতুন ক্ষমতাধর বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা দমনপীড়ন ও ঢালাও প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু করেন, তবে তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যকে শুধু কলঙ্কিতই করবে না; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে নতুন করে বিষাক্ত করে তুলবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ নামে ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা প্রণয়ন, বিচার প্রমাণের আগেই তা সংবাদমাধ্যমে প্রচার করে সামাজিক হেনস্তা ও ঢালাও শাস্তিমূলক পদক্ষেপকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাংঘর্ষিক বলে চিহ্নিত করেছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’। সংগঠনটির মতে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সহকর্মীদের ওপর এমন প্রতিশোধমূলক আচরণ পূর্ববর্তী ক্ষমতান্ধ আওয়ামী শাসনের নিপীড়নমূলক আচরণেরই হুবহু পুনরাবৃত্তি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে ভয়ের সংস্কৃতি বন্ধ করা, উইচ-হান্টিং রোধ করা এবং বিদ্যায়তনিক মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছে:
১. সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ: যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও লিখিত অভিযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
২. নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত: প্রতিটি উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত পরিচালনা করতে হবে।
৩. আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার: অভিযুক্ত প্রত্যেক শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক সুযোগ দিতে হবে।
৪. অধ্যাদেশ অনুসরণ: সম্পূর্ণ প্রমাণের ভিত্তিতে এবং ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩’-এ নির্ধারিত স্তরবিন্যস্ত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই শুধু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
৫. ঢালাও ব্যবস্থা প্রত্যাহার: রাজনৈতিক মত, আদর্শ, পরিচয় বা ঢালাও তালিকার ভিত্তিতে গৃহীত সব প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করে তা প্রত্যাহার করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিগত স্বৈরাচারী ব্যবস্থার জাঁতাকল থেকে মুক্ত করার অর্থ এই নয় যে সেখানে নতুন কোনো দলের দলীয় আক্রোশ ও ক্ষমতার দাপট প্রতিষ্ঠিত হবে। অতীতে যারা গর্তে লুকিয়ে ছিলেন ও নীরব থেকে নিজেদের পেশাগত সুবিধা গুছিয়েছেন, আজ ক্ষমতার হাওয়া বদলে তাদের এমন আক্রমণাত্মক ‘উইচ-হান্টিং’ কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক পরিবেশকেই ধ্বংস করছে। সঠিক গণতান্ত্রিক চর্চা, নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া এবং অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা বজায় রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষয়িষ্ণু মান রক্ষা করা সম্ভব। অন্যথায় অতীতের সেই পুরনো স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক কারবারেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্দি থেকে যাবে।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্য ও লেখক





