ফুঁসছে আজাদ-কাশ্মীর

মুজাহিদ অনীক
পাকিস্তানের সমগ্র ক্ষমতাকাঠামো দেশটির বিশেষ স্বশাসিত অঞ্চল কাশ্মীর উপত্যকায় ইতিহাসের সবচেয়ে তিক্ততাপূর্ণ অসন্তোষের মুখোমুখি। আজাদ-কাশ্মীর নামে পরিচিত অঞ্চলটিতে গত জুন মাস থেকে এ পর্যন্ত সহিংসতায় হতাহতের তালিকায় বেসামরিক নাগরিকের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন।
অঞ্চলটির সচেতন মহল ১৯৭৪ সালের অন্তর্বর্তী সংবিধানের নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিব্যবস্থায় বদল চাইছে। ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তু স্বশাসিত শাসনব্যবস্থার অন্দরে পাক ‘এস্টাবলিশমেন্ট’-এর কর্তৃত্বপরায়ণ ছায়া।
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত অঞ্চলটির পাক-নিয়ন্ত্রিত অংশটি বর্তমান পরিস্থিতির মতো উত্তাপ এর আগে দেখেনি।
সংঘাত-সহিংসতার মধ্যে গত ২৭ জুলাই আজাদ-কাশ্মীরে প্রথম দফার নির্বাচন হয়ে গেছে, যেখানে ১৩টি আসনের মধ্যে ৯টি দখল করেছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন)। নির্বাচন ছাপিয়ে আলোচনায় জায়গা করেছে সংস্কারমূলক দাবি। নেতৃত্বে রয়েছে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) নামে একটি মোর্চা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী এবং নানা শ্রেণির মানুষ জড়ো হয়েছেন এ মঞ্চে। তিন বছর ধরে তাদের কর্মসূচি রুখতে চূড়ান্ত মারমুখী আর্মি-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন। বিক্ষোভ থামাতে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে নিয়মিত বাহিনী কার্যত খাদ্যপণ্য অবরোধ আরোপ করেছে। নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর পাশাপাশি গণগ্রেপ্তার ও নিপীড়ন চালাচ্ছে। গত জুনে জেএএসির প্রধান নেতা শওকত নওয়াজ মীরকে গ্রেপ্তার করে রাষ্ট্রদ্রোহসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে আত্মগোপনে থেকে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন বাকি নেতারা। সরকার জেএএসি নিষিদ্ধ করেছে।
নির্বাচনের বাকি দুধাপে আরও প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে। কারণ, বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল রাওয়ালকোটের নির্বাচন এখনো বাকি। ১০ আগস্ট পুঞ্চ বিভাগের ভোট হতে পারে চূড়ান্ত সহিংস। পুঞ্চের রাওয়ালকোটে সবচেয়ে তীব্র আন্দোলন ও সহিংসতা দেখা গেছে।
বস্তুত ইসলামাবাদে এস্টাবলিশমেন্ট তথা সামরিক বাহিনীর আশীর্বাদ ছাড়া যেমন ক্ষমতার পালাবদল হয় না, একই ধারা ১৯৪৭ সাল থেকে নানা সময়ে আজাদ-কাশ্মীরেও দেখা গেছে। সেনাবাহিনীর সমঝে চলা কেন্দ্রীয় সরকারের তল্পিবাহক শাসকই সবসময় ক্ষমতার স্বাদ নিয়ে আসছে। কিন্তু আজাদ-কাশ্মীর পাকিস্তানের সংবিধানসম্মত কোনো ভূখণ্ড বা প্রদেশ নয়। বিদ্যমান বিধিব্যবস্থা অনুযায়ী মুজাফফরাবাদে একপ্রকারের আপাত স্বাধীন ও অধিকতর স্বশাসিত সরকারকাঠামো জারি থাকার কথা এবং তা ইসলামাবাদের সমান্তরালে। অথচ মুজাফফরাবাদের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী পদের মুখ বদল হয়ে আসছে ইসলামাবাদের ইশারায়। ওদিকে ইসলামাবাদের হর্তাকর্তা বেসামরিক কেউ নয়, উর্দিধারীরা। বৈপরীত্যটা এখানেই।
আজাদ-কাশ্মীরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি, বলপ্রয়োগ, বেসামরিক নাগরিকজীবনে হস্তক্ষেপে ঘটনা বিস্তর। জল ও খনিজসম্পদের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ করায়ত্ত করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কাঠামোবদ্ধ লুণ্ঠনের নিয়ন্ত্রণ আর্মির আজ্ঞাবহদের হাতে। একটি কথা প্রচলিত রয়েছে, আজাদ-কাশ্মীরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যত ক্ষমতা, তার চেয়ে অধিক ক্ষমতা আর্মির ১২তম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের, যেটি আজাদ-কাশ্মীরকে সামরিক আচ্ছাদনে মুড়িয়ে রাখা সামরিক বাহিনীর কমান্ড। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাতপূর্ণ নিয়ন্ত্রণরেখার প্রতিরক্ষা এই ডিভিশনের আওতায়।
জেএএসির সাম্প্রতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে এস্টাবলিশমেন্ট এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আঞ্চলিক রাজনীতিকে যেকোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টাকে মানুষ আর সহ্য করতে চাইছে না। ২০২৩ সালে ভর্তুকি মূল্যের আটার মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জেএএসি মোর্চা এখন অঞ্চলটির রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত ও অন্যায্য প্রশ্নটি সামনে এনেছে। তারা আইনসভায় সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল চাইছে।
ঘটনা হলো, ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থী, যারা পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করেন, তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংবিধানে ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়। এসব ভোটারের কেউই আজাদ-কাশ্মীরে বসবাস করেন না। তাদের ভোটাভুটিও নির্দিষ্ট কেন্দ্রে হয় না। নানা জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে এই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এসব আসনের ভোট প্রক্রিয়া যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি এসব আসনে নির্বাচিত প্রার্থীরা কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীর অনুগ্রহধন্য হয়ে থাকেন। জেএএসির অভিযোগ, অঞ্চলের বাইরে থেকে এস্টাবলিশমেন্টের ক্রীড়নক হয়ে কাজ করেন এসব ‘নির্বাচিত’ প্রতিনিধি। রিফিউজি স্ট্যাটাস নিয়ে নির্বাচিতরা চিরাচরিতভাবে এস্টাবলিশমেন্টের অঙ্গুলিহেলনে চলেন।
সংস্কারের দাবিতে হাওয়া লাগে গত বছরের শেষদিকে উপত্যকায় রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে। চৌধুরী আনোয়ারুল হক ২০২১ সালে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর প্রার্থী হিসেবে আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্পিকারের চেয়ারে বসেন। পরে পিটিআইয়ের সঙ্গ ত্যাগ করে পিএমএল-এন এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) সমর্থন নিয়ে আঞ্চলিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু কেন্দ্রে পিএমএল-এনের সরকার গঠন হলে আঞ্চলিক সরকারের সঙ্গে বিবাদ তৈরি হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ফয়সাল মুমতাজ রাঠৌরকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসায় কেন্দ্রীয় সরকার। রাঠৌরকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসাতে আইনসভায় সংরক্ষিত আসনের ১২ জনকে ‘কিংমেকার’ হিসেবে ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় শাসকদল পিএমএল-এন। জেএএসি অভিযোগ করছে, আজাদ-কাশ্মীরের ইতিহাসে বারবারই কেন্দ্রীয় সরকার এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এ ধরনের অনৈতিক কাজ করছে।
রাজনৈতিক হিস্যার পাশাপাশি জেএএসি আজাদ-কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সম্পদের হিস্যার প্রশ্নও সামনে এনেছে। পাকিস্তানের জাতীয় গ্রিডে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হয়, যা উৎপাদিত হয় আজাদ-কাশ্মীরের নীলম-ঝিলম নদীর স্রোতধারা থেকে। অঞ্চলের বাসিন্দারা নিজেদের সম্পদে স্বল্পমূল্যে উৎপাদিত বিদ্যুৎ উচ্চমূল্যে কিনতে আগ্রহী নন। মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং নিয়েও তারা ক্ষুব্ধ। কারণ তারা মনে করেন, আজাদ-কাশ্মীরে জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের চেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় এখানে। কিন্তু তাদের উৎপাদিত বিদ্যুতে ইসলামাবাদ ও পাঞ্জাবকে আলোকিত রেখে আজাদ-কাশ্মীরকে অন্ধকারে রাখে পাকিস্তানি সরকার। নাগরিক সমাজ এ বিষয়কে দেখছে সম্পদ লুণ্ঠন হিসেবে।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক




