বৃদ্ধরা চায় আসুক অভিবাসী

উনিভের্সিদাদ পলিতেকনিকা দে মাদ্রিদ (মাদ্রিদ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়)
প্রবাসে আসার পর সবচেয়ে বেশি যে কষ্ট হয় বলে শুনেছি, তা হলো ভাতের কষ্ট। বাঙালি প্রয়োজনে পানি খাবে না; কিন্তু ভাত তার খেতেই হবে! কিন্তু প্রথম যে জিনিসের অভাব আমাকে নাড়া দেয়, তা ভাত নয়; বরং আওয়াজ। প্রথম যখন আয়ারল্যান্ডে পড়তে যাই, ঘুম হতো না। এক সপ্তাহ লেগেছিল এটা বুঝতে, আমার কান ঢাকার শোরগোলে এতটাই অভ্যস্ত যে তার পক্ষে এরকম নিশুতি শহরে থাকা অসম্ভব।
এর পর জল অনেক দিকে গড়িয়েছে, আমি কিছুদিন চাকরি করতাম স্পেনের লেওন নামের এক গ্রামে (ওরা বলতে চায় শহর; কিন্তু ৮০ হাজার মানুষের বাস যেই জায়গায়, সেটাকে ঢাকার কেউ জিন্দেগিতে শহর বলবে না), এখন চাকরি করি মাদ্রিদ শহরে। নিঃসন্দেহে উত্তর ইউরোপের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত, অনেক বেশি কোলাহলে ভরপুর ভূমধ্যসাগর আর তার উপকূলের দেশেরা। মাদ্রিদ প্রায়ই ভয় দেখানো সুরে বলে, তার জনসংখ্যা অনেক, বার্লিন আর প্যারিসের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৃতীয় বৃহত্তম শহর, এমনকি লেওন গ্রাম থেকে মাদ্রিদ আসার সময়, এলাকার খালাম্মাদের অনুযোগ ছিল, যেও না মাদ্রিদ, পথ খুঁজে পাবে না। এই ইউরোপীয়দের কীভাবে বোঝাই, আমার জন্ম ঢাকায়, যেখানে এখন অন্যূন সাড়ে ৩ কোটি মানুষের বাস। বাংলাদেশ ইজ এ নাম্বারস গেম, এটা স্প্যানিশ ভাষীদের বোঝানো শক্ত।
অবশ্য সাধারণ জনগণ না বুঝলেও ইমিগ্রেশন হয়তো বোঝে, আর তাই এই নাম্বারের ভয় দেখিয়ে আমাদের সঙ্গে চলে ইমিগ্রেশনকালীন নানাবিধ আইনি মারপ্যাঁচ। পৃথিবীর খুব কম দেশে আমাদের পাসপোর্ট নিয়ে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করা যায়। অথচ আমি বাংলাদেশিদের মতো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রবাসী খুব বেশি দেখিনি। এমন কোনো দেশ নেই, এমন কোনো আইন নেই, যেখানে বাঙালি গিয়ে তার নিয়মানুবর্তিতা দেখায়নি। এমনকি প্যারাগুয়ের প্রত্যন্ত জঙ্গলের মধ্যে সিউদাদ দেল এস্তে নামক স্থলবন্দরে বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে উঠেছে, যেন এক মিনি বেনাপোল। মেক্সিকো সিটি গিয়ে দেখি, রোমা নামের এক প্রসিদ্ধ বড়লোকি এলাকার মধ্যে পেল্লায় সাইজের রেস্টুরেন্ট, নাম তার ঢাকা বিরিয়ানি। ভাত খেতে ইচ্ছা হলে মাদ্রিদের কেন্দ্রে আছে ডাউনটাউন লাভাপিয়েস, যেখানে ১৭ হাজার বাংলাদেশির বসবাস।
স্পেনেই আটকা পড়ে আছেন অনেক বাংলাদেশি যারা এখন চাইলে দেশে ফিরতে পারবেন না
স্পেনের মানুষ খুবই নির্জলা, সহজ-সরল গোছের। লেওন ছেড়ে মাদ্রিদ আসার সময় ক্যাফেতে ক্যাফেতে খালাম্মাদের না যাওয়ার আকুতি সহজে ভুলে যাওয়ার নয়। এর কারণও আছে। স্পেনের জনসংখ্যা বহুদিন ধরে পড়তির দিকে, গ্রামের পর গ্রাম খালি হয়ে পড়ে আছে। স্পেনের বৃদ্ধ জনগণ ডানদিকে হেলতে চায় না, হেলতে চায় তরুণসমাজ। যার কারণে গ্রামে বসবাসরত বৃদ্ধ স্প্যানিশরা চায়, একটু অভিবাসীরা আসুক, একটু মানুষ আসুক তার গলিতে।
স্পেনে অভিবাসীদের বড় অংশই (অর্ধেকের বেশি) আসে লাতিন আমেরিকা (কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা ইত্যাদি) থেকে। এখানে কেউ সেই অর্থে ইংরেজি পারে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্লাইড হয়তো ইংরেজিতে, ক্লাস নিতে হচ্ছে স্প্যানিশে। স্প্যানিশ ভাষীদের মধ্যে আমাদের সম্পর্কে ধারণা এতই অপ্রতুল যে, একবার কলম্বিয়ার বোগোতা শহরে দুই সিগারেট বিক্রেতা আমার সামনেই অনেকক্ষণ নিজেদের মধ্যে তর্ক করল, বাংলাদেশ কী বলিভিয়ার পাশে নাকি ব্রাজিল, আর এরপর এক বাচ্চা ছেলে এসে তাদের জানাল, না, দেশটা আরবের পাশে!
বাঙালির এই অভাব থেকে এক দীর্ঘকালীন শূন্যতা তৈরি হয়, যেমন— আস্ত একেকটা দিন চলে যেতে পারে যেদিন বাংলায় কারও সঙ্গে কথা হয়নি। ঢাকা শহরে যে একাকিত্ব চাইলেও পাওয়া যেত না, প্রবাসে সেই একাকিত্ব কমবেশি আমাদের সবাইকেই তাড়া করে বেড়ায়। অনেকে বলে প্রবাসীরা বাংলাদেশের কথা কতটুকু মনে রাখে? অথচ পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশিদের যত বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়, তা নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো মাথাব্যথা হয় না। এই স্পেনেই আটকা পড়ে আছেন অনেক বাংলাদেশি, যারা পরিবারের দুর্দিনেও এখন চাইলে দেশে ফিরতে পারবেন না।
লেখক: মাদ্রিদ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কর্মরত




