লাইমস্টোন সিটি থেকে

বন্ধুদের সঙ্গে কায়াকিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন লেখক (সর্ব বামে)
জুবায়ের হোসেন কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে কানাডায় থিতু হয়েছেন। লিখেছেন তার অভিজ্ঞতা
হঠাৎ সেদিন আমার মাস্টার্স সুপারভাইজার কেভিনের খুদে বার্তা পেলাম। লিখেছেন যে একজন বাংলাদেশি ছাত্র ওর গ্রুপে মাস্টার্স করতে আসতে চায়— আমি কি তার সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারব কি না। আরও বলল, ‘বিশ্বাসই হচ্ছে না— তোমার মাস্টার্স শেষ হয়েছে ১০ বছর আগে!’
আমার মনে পড়ে গেল, ২০১৪ সালের এপ্রিলে প্রথম কানাডা আসার স্মৃতি। অনেক দিন চেষ্টা করার পর আল্লাহর রহমতে কানাডার শীর্ষস্থানীয় কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে ফান্ডিংসহ সুযোগ পেয়ে যাই। শহরের নাম কিংস্টন। যে বাসায় প্রথম উঠি, সেটি প্রিন্সেস স্ট্রিটের একটি স্টুডেন্ট হাউজিং। মজা করে বলতাম, এই রাজা-রানী-রাজকন্যার শহরে শুরু হলো আমার জীবনের নতুন এক অধ্যায়!
কিংস্টন বেশ সাজানো ছিমছাম ছোট একটা শহর। কুইন্স ক্যাম্পাস দেখতে ছবির মতো, যেন ইতিহাস আর প্রকৃতির এক অপূর্ব মিলনস্থল। চারপাশের ঐতিহাসিক চুনাপাথরের ভবনগুলো ক্যাম্পাসকে দিয়েছে এক অনন্য, অভিজাত সৌন্দর্য, যার জন্য কিংস্টনকে বলা হয় ‘লাইমস্টোন সিটি’। দূর থেকে দেখলে ঐতিহাসিক লাইমস্টোন ভবনের কোনো কোনোটিকে অনেকটা পুরনো দুর্গের মতো মনে হয়। আর একেবারে পাশেই বিস্তৃত লেক অন্টারিও— উত্তর আমেরিকার পাঁচটি সবচেয়ে বড় হ্রদের একটি। মধ্যাহ্ন বিরতিতে বা বিকালে প্রায়ই এ হ্রদের ধারে ঘুরতে চলে যেতাম। (সম্প্রতি এই লেক অন্টারিওর নাম বদলে ‘লেক আমেরিকা’ করতে চেয়ে একে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প!)
শুরুতে কানাডার সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা বুঝতে বেশ বেগ পেতে হতো। কানাডা অনেক বৈচিত্র্যময় একটি দেশ; নানা দেশ, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের মিলনস্থল। কিন্তু কেউ সহজে আগ বাড়িয়ে আলাপ জমাতে আসে না। আবার কথা হলেও কোনো টিভি শো, সিনেমা, খেলাধুলা, রাজনীতি কিংবা স্থানীয় কোনো ঘটনার প্রসঙ্গ হঠাৎ কথার মধ্যে চলে আসত; কিন্তু তার পেছনের গল্প বা প্রেক্ষাপট জানা না থাকায় অনেক সময় কথাটার আসল অর্থই ধরতে পারতাম না। খুব একটা দরকার না থাকলেও আমি ক্যাম্পাসে ও বাইরে পার্টটাইম কাজ শুরু করি এবং কয়েকটি স্টুডেন্ট ক্লাবেও যোগ দিই। এতে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়, আর ধীরে ধীরে তাদের কথাবার্তা, রসবোধ ও সাংস্কৃতিক রেফারেন্সগুলোও বুঝতে শুরু করি। অল্প সময়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা অমূল্য। পড়াশোনার বাইরের এই অভিজ্ঞতাগুলো কানাডায় আমার জীবন ও পথচলাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
নিজের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতি থেকেও শেখার চেষ্টা করা উচিত। বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে মিশলে এটা সহজ হয়
আমি মনে করি, নিজের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতি থেকেও শেখার চেষ্টা করা উচিত। বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে মিশুন। এতে শুধু বন্ধুত্বই নয়, নতুন সমাজ ও জীবনযাপন সম্পর্কে অনেক কিছু শেখা যায়।
আমার সুপারভাইজার অবশ্য শুরু থেকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। যখন আমি তার গ্রুপে মাস্টার্স করার জন্য আবেদন করি তখন কেভিন বলেছিলেন, একজন শিক্ষার্থী যেন তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন হবে, তা আগে থেকেই ভালোভাবে বুঝতে পারে। সবকিছু জেনে-বুঝে তারপর যেন সিদ্ধান্ত নেয়। সত্যি বলতে, তার এই ভাবনাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। সব মিলিয়ে পুরো ডিপার্টমেন্টে ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের মধ্যে একে অন্যের প্রতি যে সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখেছি, তা খুব ভালো লেগেছে।
আমার সুপারভাইজারের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা আমার পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই নানানভাবে কাজে এসেছে। যখনই কোনো প্রয়োজনে তার সাহায্য চেয়েছি, তাকে পাশে পেয়েছি; চাকরির রেফারেন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং লাইসেন্সের জন্য রেফারেন্স কিংবা ক্যারিয়ার নিয়ে পরামর্শ— সব ক্ষেত্রেই তিনি আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে তার খুব ভালো ধারণা ছিল। তাই আমি সবসময় চেষ্টা করেছি সেই আস্থার মর্যাদা রাখতে। তবে আমি দেখেছি, কিছু শিক্ষার্থী সুপারভাইজারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখে না কিংবা ব্যক্তিগত কোনো সুবিধার জন্য পড়াশোনা বা ডিগ্রি শেষ না করেই মাঝপথে চলে যায়। এতে শুধু ওই শিক্ষার্থীরই সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; একই দেশ থেকে ভবিষ্যতে যারা আসবে, তাদের জন্যও সুযোগ ও আস্থার দরজা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।



