‘ইয়া, ইয়া... স্পাসিবা!’

‘সেনায়া প্লোশাদ’-এর একটি বারে লেখক ও তার বন্ধুরা ছবি: লেখক
আমি তখন ফিনল্যান্ডের বাসিন্দা; সেই ছাত্রজীবনের একটা বড় এবং আকর্ষণীয় অংশ জুড়ে ছিল রাশিয়া ভ্রমণ। পড়াশোনার খাতিরে আমাকে প্রায়ই সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমাতে হতো ভলগা নদীর দেশে। আর সেই ভ্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল জাদুকরি শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ। জারের আমলের স্থাপত্য, জমকালো ইতিহাস আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়া এই শহরটি প্রথম দেখাতেই যে কারও মন হরণ করতে বাধ্য। কিন্তু আজ কোনো রাজপ্রাসাদ বা মিউজিয়ামের গল্প নয়; বলব সেন্ট পিটার্সবার্গের এক সাধারণ বারে ঘটে যাওয়া এক চিরস্মরণীয় অভিজ্ঞতার কথা।
সেবার সেন্ট পিটার্সবার্গে ছিল আমার প্রথম সফর। ইউরোপের তীব্র শীতের আমেজ গায়ে মেখে আমি আর আমার সহপাঠীরা মিলে ঠিক করলাম, শহরের প্রাণকেন্দ্র ‘সেনায়া প্লোশাদ’-এর একটি বারে যাব। ভেতরে পা রাখতেই এক অদ্ভুত ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল। চমৎকার আবহ, ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকা সুরের মূর্ছনা আর প্রাণবন্ত মানুষের ভিড়— সব মিলিয়ে এক দারুণ পরিবেশ। কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা বড় টেবিল দখল করে বসলাম। পানীয়র গ্লাসে চুমুক আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার তুমুল কলতানে চারপাশটা মুখর হয়ে উঠেছিল।
তখনো আমরা কেউ ভালো রুশ ভাষা জানতাম না। তাই স্থানীয় কারও সঙ্গে যে যেচে আলাপ জমাব, তেমন কোনো ভাবনা কল্পনাতেও ছিল না। কিন্তু ভাগ্য বোধ হয় সেই রাতে আমাদের জন্য অন্যরকম এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল।
ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েটি হ্যালো বলতেই তরুণটি ফোনটা আমার হাতে তুলে দিল এবং ইশারায় জানাল, আমি যেন তার প্রেমিকার সঙ্গে দুটো কথা বলি!
আড্ডার মাঝপথে হঠাৎ করেই একদল রুশ তরুণ-তরুণী আমাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। অত্যন্ত অমায়িক ভঙ্গিতে তারা ‘হ্যালো’ বলল। কিছুটা অবাকই হলাম। কারণ, আমরা ইংরেজিভাষী আর তারা ইংরেজি বলতে পারছিল না। অন্যদিকে, আমাদের ঝুলিতে তখন রুশ ভাষার পুঁজি বলতে কেবল দু-একটা ভাঙা শব্দ। কিন্তু ভাষার এই দুর্ভেদ্য প্রাচীর যে মানুষের আন্তরিকতার কাছে কতটা তুচ্ছ হতে পারে, তা পরের কয়েক মিনিটেই প্রমাণিত হয়ে গেল।
ইশারা-ইঙ্গিত আর ভাঙা ভাঙা রুশ শব্দের জগাখিচুড়ি পাকিয়ে যখন তাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম, তখনই আসলে বুঝতে পারলাম কেন তারা আমাদের, বিশেষ করে আমার টেবিলে এসে কথা বলছে। অপ্রত্যাশিত এই কারণটা জেনে আমি আক্ষরিক অর্থেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম!
তাদের দলের একজন জানাল, সে বা তার বন্ধুরা এর আগে কখনো সামনাসামনি কোনো কৃষ্ণাঙ্গ বা বাদামি চামড়ার মানুষ দেখেনি! আমিই ছিলাম তাদের জীবনে দেখা প্রথম বাদামি বর্ণের মানুষ।
দূর দেশ থেকে আসা এক ভিনদেশি মানুষকে চোখের সামনে দেখে তাদের চোখে-মুখে তখন এক অপার কৌতূহল। দলটির একজন অত্যন্ত ভদ্রভাবে এবং কিছুটা ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, সে কি একবার আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে পারে? হেসে হাতটা বাড়িয়ে দিলাম এবং তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম। হাত মেলাতে পেরে সেই তরুণের মুখের যে চওড়া হাসি, তা আজও চোখে ভাসছে।
খুশির ঠেলায় পকেট থেকে মোবাইল বের করে সরাসরি তার প্রেমিকাকে ফোন দিল। ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েটি হ্যালো বলতেই তরুণটি ফোনটা আমার হাতে তুলে দিল এবং ইশারায় জানাল, আমি যেন তার প্রেমিকার সঙ্গে দুটো কথা বলি!
ব্যাপারটা যেমন অদ্ভুত, তেমনই মজার। আমি রুশ ভাষা জানি না আর মেয়েটি ইংরেজি বোঝে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সেই অবস্থাতেও আমরা ফোনে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম। আজও সেই কথোপকথন আমার মনে খুব স্পষ্ট। ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েটির এক্সাইটমেন্ট আর অবিরাম রুশ ভাষায় কথা বলা আমি শুনছিলাম আর এপাশ থেকে মাথা নেড়ে অনবরত বলে যাচ্ছিলাম— ‘ইয়া, ইয়া... স্পাসিবা!’ (হ্যাঁ, হ্যাঁ... ধন্যবাদ)। কারণ আমার রুশ ভাষার দৌড় তখন ওই ‘স্পাসিবা’ শব্দটুকুই। ভাষা না বুঝলেও ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা উচ্ছ্বাস আর আন্তরিকতা বুঝতে কোনো অভিধানের প্রয়োজন হয়নি।
এরপর পড়াশোনার এক্সচেঞ্জ সেমিস্টারসহ বহুবার আমি সেন্ট পিটার্সবার্গে গিয়েছি। রাশিয়ার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ঘুরেছি, অজস্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু প্রথম সফরের সেই ঘটনা আমার মনের ক্যানভাসে এমনভাবে খোদাই হয়ে গেছে যে, তা কোনোদিন ফিকে হওয়ার নয়। প্রবাস জীবনের যত স্মৃতি আমার ঝুলিতে আছে, তার মধ্যে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে মধুর ও শ্রেষ্ঠ।




