ঢাকার জন্য বিকেন্দ্রীকরণই মূল স্লোগান

ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও ইমেরিটাস প্রফেসর নজরুল ইসলাম বিশিষ্ট নগরবিদ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। তার সঙ্গে কথা বলেছেন শম্পা বিশ্বাস।
আপনার শরীর এখন কেমন?
এই বয়সে শরীর মাঝেমধ্যে ভালো থাকে, মাঝেমধ্যে থাকে না। আমার হার্টে তিন মাস আগে পেসমেকার বসানো হয়েছে। বয়স চলছে ৮৭ বছরের ওপর।
ছোটবেলার কথা মনে পড়ে?
আমার জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৩৯ সালে। আমি ও আমার বড় ভাই বিখ্যাত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেদায়েতুল ইসলাম— আমাদের দুজনের জন্ম নানাবাড়িতে; এখনকার শরীয়তপুর জেলার চরকুমারিয়াতে। তখন ছিল ফরিদপুর জেলার ভেদেরগঞ্জ থানার চর এলাকা। জন্মের প্রথম পাঁচ বছর আমরা গ্রামেই ছিলাম। বাবা আব্দুল কাদির ফরিদপুর জজকোর্টে চাকরি করতেন। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে আইএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৩৫ সালে বিএ পাস করেছিলেন। তখনকার দিনে আমাদের এলাকায় বিএ পাস ছিলেন হাতেগোনা দুয়েকজন; তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। আমার বয়স যখন পাঁচের মতো, মানে ১৯৪৪-৪৫ সালে, দুর্ভিক্ষের পর আমরা মায়ের সঙ্গে সব ভাইবোন ফরিদপুরে বাবার কাছে চলে গেলাম। দাদা আমাদের নিয়ে গেলেন নৌকায় করে— ভেদেরগঞ্জ থেকে পদ্মা নদী হয়ে ফরিদপুর। বিরাট নৌকা; বাড়ির সব মালপত্র, পুরো পরিবার নিয়ে নৌভ্রমণ। উত্তাল পদ্মা নদী দিয়ে সুবিধামতো পাল তুলে নৌকা যেত। আবার যখন বাতাস থাকত না, তখন নদীর পাড় দিয়ে গুণ টেনে নিয়ে যাওয়া হতো নৌকাটি। এভাবে আমরা গ্রাম থেকে চার দিন চার রাত নদীপথে ভ্রমণ করে ফরিদপুর পৌঁছেছিলাম। এটি আমার জন্য খুব স্মরণীয় স্মৃতি। এরপর বাবা ১৯৪৭ সালে ফরিদপুর থেকে বদলি হয়ে ঢাকা হাইকোর্টে চলে এলেন। এখানে পেলেন বেঞ্চ ক্লার্কের চাকরি। ঢাকায় বাবা তখন একাই এসেছিলেন; আমরা ফরিদপুরে রয়ে গেলাম।
বাবার কাছে তখনকার ঢাকার গল্প কেমন শুনেছেন?
তখন তো ঢাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া যেত না। পাকিস্তান হওয়ার পর ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হলো। প্রচুর মানুষ নতুন চাকরি িনয়ে এখানে চলে এলো। সরকারের রিকুইজিশন করা ছোট্ট একটি বাসা পেয়েছিলেন বাবা। তখন তার ছোট ভাই, মানে আমার ছোট চাচা শিল্পী আবদুর রাজ্জাক তার সঙ্গে থাকতেন।
আমি ম্যাট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন, ইন্টারমিডিয়েটে ফার্স্ট ডিভিশন, অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট উইথ রেকর্ড, এমএ-তে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট উইথ রেকর্ড মার্কস! তারপরও আমার চাকরি হয়নি
বিখ্যাত চিত্রশিল্পী আবদুর রাজ্জাক?
হ্যাঁ। তিনি সেকেন্ড ডিভিশনে আইএসসি পাস করেছেন। বাবা ও দাদার ইচ্ছা ছিল, ছোট চাচা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বেন। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। আর্ট কলেজে পড়তে চাইলেন। জয়নুল আবেদিন চারুকলা ইনস্টিটিউট শুরু করেছেন এর এক বছর আগে। ছোট চাচা দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র হয়ে ঢুকলেন ১৯৪৮ সালে। তখন বাবার সঙ্গে থাকতেন পুরান ঢাকার কাপ্তানবাজার; ঠাঁটারীবাজারের নবাবপুর এলাকায়। আর্ট কলেজটি ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক, ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলের পেছন দিকের ছোট দুই রুমে।
আপনি ঢাকায় এলেন কবে?
আমি ক্লাস ফাইভ শেষ করে আর আমার বড় ভাই ম্যাট্রিক পাস করে স্টিমারে ১৯৫০ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় এলাম। আমরা পুরান ঢাকায় থাকতাম তখন। ১৯৫১ সালে ক্লাস সিক্সে বাসার কাছেই নবকুমার স্কুলে (নবকুমার ইনস্টিটিউশন ও ড. শহীদুল্লাহ কলেজ) প্রাইভেটে ভর্তি হলাম। দুই মাসের মধ্যে স্কুলটি সরকারি হয়ে গেল। স্কুলে লেখাপড়ায় ভালো ছিলাম, বয়স্কাউট করতাম। খেলাধুলায়ও ভালো ছিলাম। স্কুলজীবন খুব আনন্দের ছিল। ওখান থেকে ১৯৫৬ সালে ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাস করলাম। আমাদের সময় ছাত্রসংখ্যা কম ছিল। স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম ২৬ জন। চারজন ফার্স্ট ডিভিশন, বাকি ২২ জন সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে পাস করলাম। থার্ড ডিভিশন পায়নি কিংবা ফেল করেনি কেউ। ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়া বাকি তিনজনের দুজন পরে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, আরেকজন ব্যারিস্টার হয়েছে। বিখ্যাত ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, মানিক মিয়ার ছেলে। আমিও খুব ভালো ছাত্র ছিলাম।
আপনি তো ছবিও আঁকতেন। এটি কি ছোট চাচার কাছ থেকে পাওয়া?
হ্যাঁ, চাচার কাছ থেকে শিখেছি। তিনি আমার শিক্ষক। এ ছাড়া মোহাম্মদ কিবরিয়া ছিলেন আমার স্কুলের ড্রয়িং টিচার। খুব বড় শিল্পী, বিখ্যাত। পরে আর্ট কলেজের টিচার হয়েছেন। তাদের সবার আঁকা ছবি আছে আমার সংগ্রহে। (দেয়ালে টাঙানো ছবি দেখিয়ে) এই যে এটি এস এম সুলতান, এটি কামরুল হাসান, এদিকে আছে কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক, কিবরিয়া, জয়নুল আবেদিন—বড় বড় শিল্পীর আঁকা ছবি।
আপনার প্রিয় শিল্পী জয়নুল আবেদিন তো আপনার আত্মীয়?
জয়নুল আবেদিনকে আমি স্কুলজীবন থেকেই চিনি। আমার চাচার শিক্ষক। আমাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। পরে অবশ্য আমার চাচার সঙ্গে জয়নুল আবেদিনের ভাতিজির বিয়ে হয়। সে হিসেবে জয়নুল আবেদিন আমার আত্মীয়। তিনি আমার খুব পছন্দের মানুষ। আমাকেও খুব পছন্দ করতেন। পরবর্তীকালে তার অনেক ঘনিষ্ঠ হয়েছি। তার ওপর দু-তিনটি বই লিখেছি। সেগুলো শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে।
আগের সরকার মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু করল। একের পর এক কাজ করেছে। কিন্তু সব ঢাকাকেন্দ্রিক। বর্তমান সরকার বসে নেই; ইলেকট্রিক ট্রেন করবে। কিন্তু আবার ঢাকা! কোথায় ঢাকাকে ডিসেন্ট্রালাইজ করবে, তা নয়; আরও সেন্ট্রালাইজ করার চিন্তা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিকেন্দ্রীকরণ শুরু করেছিলেন উপজেলায়। ওটাকে যদি ঠিক রাখত, অনেক সুবিধা হতো
আপনার ভাইবোনরা কে কোথায় এখন?
আমরা ছিলাম চার ভাই ও তিন বোন। প্রথম বোনটি, মানে আমাদের তিন ভাইয়ের পরে যার জন্ম, সে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় মারা গেছে। আরেক বোন মারা েগছে ৫৯ বছর বয়সে; কিডনি ডায়ালাইসিসের সময়। তার স্বামী ডাক্তার, ছেলেরাও। সবচেয়ে ছোট বোন ফারজানা ইসলাম তো বিখ্যাত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিল। খুবই ব্রিলিয়ান্ট সে। শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী ছিল; ফার্স্ট হয়েছিল, পিএইচডি করেছে। এখন সে খুব অসুস্থ। নিয়মিত কিডনি ডায়ালাইসিস করাতে হয়। আমরা চার ভাই-ই বেঁচে আছি; তবে সবার বেশ বয়স হয়েছে। বড় ভাইয়ের বয়স ৯২ বছর; বড় ডাক্তার তিনি— সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. হেদায়েতুল ইসলাম। আমি প্রফেসর। আমার ইমিডিয়েট ছোট ভাই ড. মঞ্জুরুল ইসলাম প্রফেসর; শরীয়তপুরের জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য। সে লেখক ও পাবলিশার। স্কলার্স পাবলিকেশনের কর্ণধার। প্রকাশনায় সে এক্সপার্ট। পিএইচডি করেছে। তারও বয়স ৮৫-এর বেশি। সবচেয়ে ছোট ভাইটির বয়স ৭৯ বছর। সে আমেরিকায় থাকত, সেই দেশের নাগরিক; এখন ঢাকায় থাকে।
আপনার সন্তানরা বিদেশে থাকে। তাদের জন্য মন কেমন করে নিশ্চয়ই?
আমাদের দুই মেয়ে। সন্তানদের জন্য তো মন খারাপ লাগে, কিন্তু তারা আসলে কাজের খাতিরেই দূরে থাকে। বড় মেয়ে মাশরুফা আয়েশা নুশরাত হলো ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স ও এমএ এবং ইংল্যান্ড থেকে মাস্টার্স করেছে। এখন পিএইচডি করছে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ডালাসে। তাই স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে আমেরিকাতেই থাকে। ওর স্বামী ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) ইংরেজির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। আমার ছোট মেয়ে ড. কান্তি অনন্ত্য নুজহাত অর্থনীতিতে পিএইচডি। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। এখন স্বামী-সন্তানদের নিয়ে কানাডার টরন্টোতে থাকে। সময়-সুযোগ পেলেই মেয়েরা দেশে আসে। গত জুলাইয়ে আমি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম; তখন ছোট মেয়ে এসে এক মাস ছিল আর বড় মেয়ে আট দিনের মতো।
আপনার স্ত্রী?
আমার স্ত্রী রওশন আরা বেগম ছিলেন বাংলার অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-এমএ। ঢাকা কলেজে ছিলেন হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট; অবসর নিয়েছেন অধ্যাপক হিসেবে।
আপনি বয় স্কাউট হিসেবে বিদেশে গেছেন।
আমি আইএসসির রেজাল্ট জানার পর একটি সুযোগ পেয়ে ইরানে গেলাম। ইরান তখন খুব আধুনিক দেশ। শাসক ছিলেন রেজা শাহ পাহলভী। ১৯৫৮ সালে ওখানে আন্তর্জাতিক বয় স্কাউট জাম্বুরি হলো। পাকিস্তান থেকে অংশ নিয়েছিল ৫০ জন; পূর্ব পাকিস্তান থেকে আমরা মাত্র দুজন ছিলাম, যার মধ্যে আমিই একমাত্র বাঙালি, অপরজন অবাঙালি। আমরা ওখানে প্রায় এক সপ্তাহ ক্যাম্প করেছি, তারপর বেড়ালাম দুই সপ্তাহ। এরপর পাকিস্তানে আমার বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ালাম প্রায় এক মাস। ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। আমার বড় ভাই আমাকে ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি করিয়েছিলেন।
তাহলে ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগে গেলেন কীভাবে?
আমি তো সায়েন্স থেকে আইএসসি পাস। ঠিক করলাম, ইংরেজিতে পড়ব না। ভূগোল বিভাগে যোগাযোগ করলাম। সেটির হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট ছিলেন ড. নাফিস আহমেদ; খুব বিখ্যাত লোক। তিনি আমাকে বললেন, ‘চলে এসো’। ইংরেজি বিভাগ থেকে ট্রান্সফার নিয়ে চলে এলাম। তখন ভর্তি হওয়া, ট্রান্সফার নেওয়া— এসব প্রক্রিয়া খুব সহজ ছিল। তা ছাড়া আমার রেজাল্ট খুব ভালো ছিল বলে সহজেই হয়ে গেল। আমাদের সময়ে ভূগোল বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম সম্ভবত ১৪ জন। তিনজন মেয়ে, বাকিরা ছেলে। তার মধ্যে ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়া চার-পাঁচজন; তবে সবার চেয়ে ভালো রেজাল্ট আমার। নাফিস আহমেদসহ অন্যান্য সিনিয়র শিক্ষকের সবাই অবাঙালি— ভারতীয়, উর্দুভাষী ছিলেন।
আপনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, সে সময়ের কথা শুনতে চাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষাজীবন ছিল ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল। আইয়ুব খান যখন মার্শাল ল দিয়ে শুরু করল, আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। খুব অশান্ত পরিবেশ, হইচই, ছাত্র আন্দোলন চলছিল সে সময়ে।
আপনি ডাকসুতে ছিলেন?
আমি ১৯৬০-৬১ সালে ডাকসুর ইলেক্টেড মেম্বার ছিলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশই ছিল অন্য রকম। ডাকসুও অন্য রকম ছিল। এখন তো ডাকসুর ভিপি নিজেকে মন্ত্রীর চেয়ে বেশি মনে করে!
অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরিটি প্রথমে হয়নি। আপনি কি বৈষম্যের শিকার ছিলেন?
অবশ্যই! এটি দুঃখের কাহিনি, কিন্তু আমি এখন আর এ নিয়ে ভাবি না। আমি ম্যাট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন, ইন্টারমিডিয়েটে ফার্স্ট ডিভিশন, অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট উইথ রেকর্ড, এমএ-তে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট উইথ রেকর্ড মার্কস! তারপরও আমার চাকরি হয়নি। উর্দুভাষী ড. নাফিস আহমেদ আমাকে পছন্দ করতেন না। কেননা আমি বাঙালি এবং সাধারণ পরিবারের ছেলে। যদি উচ্চ পরিবারের বাঙালি হতাম, তাহলে খাতির করতেন। এসব বৈষম্য তখন ছিল। আমাকে শিক্ষক হিসেবে না নিয়ে একজন উর্দুভাষী কলেজ টিচার বয়স্ক লোককে নিয়োগ দেওয়া হলো। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত যোগ দেননি। কয়েক মাস পর ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) বদল হয়ে গেলেন। নতুন ভাইস চ্যান্সেলর ড. ওসমান গনি বিখ্যাত মানুষ। তার ছেলে ওসমান ফারুক আমার বন্ধু, যিনি পরবর্তীকালে মন্ত্রী ছিলেন, এখনো এমপি। নতুন ভিসি আসার পর আমার নিয়োগ হলো। যে ড. নাফিস আহমেদ আমাকে একসময় চাকরিতে ঢুকতেই দেননি, আমি শিক্ষক হওয়ার পর তিনি কিন্তু আমার খুব প্রিয়জন হলেন। আমার কাজকর্ম পছন্দ করতেন। আমাকে খুব আদর করতেন।
তার মধ্যে এই পরিবর্তন এলো কীভাবে?
তিনি বুঝতে পারলেন, কাজটি ঠিক হয়নি। বিভাগে যোগ দিয়ে আমি নগর গবেষণা কেন্দ্র করলাম, সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ— এটি তার খুব পছন্দ হয়েছিল।
কোন উদ্দেশ্যে নগর গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন?
এমএতে আমার থিসিস ছিল ১৬০৮ থেকে ১৯৬২— চারশ বছরের ঢাকা। আমি তো নগরেই বাস করি, নগর নিয়ে লেখালেখি করতাম। ওই থিসিসের মাধ্যমেই শুরু হলো আমার নগর চিন্তা, নগর গবেষণা। তারপর কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে কানাডায় গেলাম পিএইচডি করতে।
কিন্তু শেষ না করেই ফিরে এসেছিলেন!
ওখানে পিএইচডি করতাম নগর নিয়েই। আমার স্কলারশিপ ছিল তিন বছরের; তিন বছরই ছিলাম। পড়াশোনা, ঘোরাঘুরি, ছবি আঁকা আর লেখালেখি করলাম। কিন্তু মূল গবেষণায় আমার মন ছিল না। কাজটি ভালো হয়নি, খুব খারাপ হয়েছে, সেটি পরে বুঝেছি। পরে আর পিএইচডির চেষ্টাই করলাম না। অনেকে দেশে ফিরে আবার চেষ্টা করে, বিদেশে যায়; আমি আর যাইনি। আমার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ। দেশে ফিরেছিলাম ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে। এর পর থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আমি খুব একটা প্রোডাক্টিভ ছিলাম না। ১৯৭১ সালে তো মুক্তিযুদ্ধ হলো। স্বাধীনতার পর আমি নগর গবেষণায় মনোযোগ দিলাম।
নগর গবেষণা কেন্দ্র কীভাবে শুরু হয়েছিল?
বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবান জিওগ্রাফি পড়াতাম আমি। সেখানে এমএ ক্লাসের ছাত্র আর আমার থিসিস স্টুডেন্ট— মোট ১২ থেকে ১৫ জনের একটি গ্রুপ তৈরি করলাম ‘আরবান স্টাডি গ্রুপ’। তখন এটি ছিল একটি আড্ডাকেন্দ্র। আমরা ছাত্রজীবনে এ রকম আড্ডা দিয়েছি। এখানে আলোচনা সভা হতো, আড্ডা হতো, চা-বিস্কুট-শিঙাড়া-চানাচুর খাওয়া হতো। আমরা নিজেরা করতাম, পরে আমরা অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের টিচারদের ডাকতাম। তারা আসতেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে আনলাম এই আড্ডায়। বুয়েটের টিচার, বিদেশি টিচার, আমেরিকান টিচার, রাশিয়ান টিচার, ইন্ডিয়ান টিচার— তাদের আনলাম। দুই ঘণ্টা-তিন ঘণ্টা আমরা মেঝেতে বসে চা-মুড়ি খেতে খেতে আড্ডা দিতাম।
কী কী বিষয় উঠে আসত সেই আড্ডায়?
অনেক বিষয়! আরবান হিস্ট্রি, আরবান প্ল্যানিং, আরবান প্ল্যান ডেভেলপমেন্ট, আরবান ইকোনমিকস, আরবান জিওগ্রাফি, আরবান সোশিওলজি— যে বিষয়ে যিনি এক্সপার্ট, এমন কাউকে ঘিরে সে বিষয়ে আড্ডা জমত। সেসব আলাপ আমরা লিখে রাখতাম। সেগুলো দিয়ে ‘সাইক্লোস্টাইল’ নামে একটি বুলেটিন বের করতাম। এটি এখনো বের হয়; তবে নগর গবেষণা কেন্দ্র— ‘সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ’-এর অবস্থা এখন মুমূর্ষুপ্রায়। এর সবকিছু চলে আমার টাকায়। এখন আর চলছে না বলা চলে; মানে পয়সা নেই, চালানোর লোক নেই, আমার এনার্জি নেই, ছেলেপেলে ব্যস্ত।
এ অবস্থা থেকে এত পুরনো একটি প্রতিষ্ঠানের উত্তরণের কি পথ নেই?
নগর গবেষণা কেন্দ্রের বয়স ৫০ থেকে ৫২ বছর চলেছে। সামনেও চলবে হয়তো। এখনো বন্ধ করিনি; দেখি কী হয়। এই বছর দেখব, যদি আমার জায়গা কেউ নিয়ে নিতে পারে, তাহলে ভালো। দেখা যাক। চালানো কঠিন। এটি অন্য স্টাইলে চলে; এভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান চলে না। যারা বিজনেস বোঝে, তারা চালাতে পারে; বিজনেস না বুঝলে পারবে না।
আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর। এই দায়িত্বে কী কী কাজ করতে হয়েছে?
ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে আমার মেয়াদ চলতি বছরের ১ মার্চ শেষ হয়ে গেছে। দায়িত্বে থাকাকালে মাঝেমধ্যে ক্লাস নিতাম। লেখালেখি করতাম।
ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?
ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা তো সমন্বয়ের অসুবিধা। ওয়াসা, ডেসা, রাজউক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। নগরায়ণ চিন্তা, ঢাকা নগর চিন্তার জন্য উপযুক্ত হলো সুষ্ঠু নেতৃত্ব। এর পরিচালন ক্ষমতা, মানে সুপরিচালন, সুব্যবস্থাপনা— এগুলো বাস্তবায়ন করার মতো ধারণা, ইচ্ছা, ক্ষমতা, শক্তি থাকতে হবে। ঢাকা যে অনেক বড় হয়ে গেছে, তা তো বুঝতে হবে।
ঢাকার ভবিষ্যৎ কী?
আগের সরকার মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু করল। একের পর এক কাজ করেছে। কিন্তু সব ঢাকাকেন্দ্রিক। বর্তমান সরকার বসে নেই; ইলেকট্রিক ট্রেন করবে। কিন্তু আবার ঢাকা! কোথায় ঢাকাকে ডিসেন্ট্রালাইজ করবে, তা নয়; আরও সেন্ট্রালাইজ করার চিন্তা। আমরা সার্বিকভাবে সবাই বলি— বিকেন্দ্রীকরণ করো। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিকেন্দ্রীকরণ শুরু করেছিলেন উপজেলায়। ঠিকমতো রাখল না তো! ওটাকে যদি ঠিক রাখত, অনেক সুবিধা হতো। প্রতিটি উপজেলায় সবকিছু হলে তার পরে জেলায় জেলায় হতো। ঢাকার জন্য বিকেন্দ্রীকরণই হলো মূল স্লোগান।
(দুপুর ১২টা, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ধানমন্ডি, ঢাকা)





