ইটের শহরে বর্ষার কাব্য

শহরে বৃষ্টির আভাস পেলেই ভিজতে বেরিয়ে পড়েন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রাজিয়া কান্দাহারী। ছবিটি রাজধানীর ধানমন্ডি লেকে তোলা
ঢাকার চিরচেনা ব্যস্ততার ঘূর্ণিপাকে আচমকাই ছেদ টানে আকাশের ঘনঘটা আর এক পশলা রুপালি বৃষ্টি। ভোগান্তি আর জলাবদ্ধতার চেনা রূপের আড়ালে বর্ষা যেন এই শহরের বুকে নিয়ে আসে এক মায়াবী বিরতি, সতেজ প্রকৃতি আর মন ছুঁয়ে যাওয়া স্নিগ্ধতার কাব্য। ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি সেই নাগরিক হৃদয়ের অদ্ভুত টানাপড়েন আর বৃষ্টির অলস রোমান্টিকতার গল্প লিখেছেন শম্পা বিশ্বাস
যানবাহনের তীব্র হর্ন, পিচঢালা রাস্তার তপ্ত নিঃশ্বাস আর কংক্রিটের দালানের সূর্যকে ঢেকে ফেলার প্রতিযোগিতা— এ নিয়েই রাজধানী ঢাকা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটে চলাই এই নগরের মানুষের নিয়তি। সেই ঘূর্ণিছোটা ব্যস্ততায় একটু ছেদ টানে বর্ষা। কিছুক্ষণের জন্য হলেও মানুষকে একটু থামতে আহ্বান জানায়। আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর সঙ্গে এক পশলা বৃষ্টি— মুহূর্তেই বদলে দেয় চিরচেনা শহরের যান্ত্রিক রূপ। কংক্রিটের জঙ্গলের গা বেয়ে নেমে আসে বারিধারার এক অপার্থিব স্নিগ্ধতা। বর্ষা যেন এই ধাবমান শহরের বুকে এক মায়াবী বিরতি, ব্যস্ত নগরবাসীর মনের কোণে এক চিলতে স্বস্তির ছোঁয়া।
জলাবদ্ধতা, বাড়তি ভাড়া, যানবাহনের সংকট, ভোগান্তি আর জামাকাপড়ের করুণ পরিণতি— ঢাকায় বর্ষা বলতে এই চেনা রূপটাই মনে আসে। কিন্তু এর বাইরে বর্ষার যে আবেদন নগরবাসীর মনে দাগ কাটে, সেটিও এই যান্ত্রিক নগরীর বুকে এক পরম উপশম। আষাঢ়ের আকাশ ভেঙে যখন তপ্ত পিচের ওপর প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে, তখন এক মুহূর্তের জন্য হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ঢাকা। প্রাণহীন এই ব্যস্ত নগরীতে বর্ষা মানেই এক মিশ্র অনুভূতি।
নাগরিক জীবনের সব ক্লান্তি আর রুক্ষতা ধুয়ে-মুছে শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপ দেয় বর্ষা। অফিসগামী ব্যস্ত মানুষটিও তখন বাসের জানালায় মাথা রেখে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শোনে। স্কুলে যেতে না পারা ছোট্ট শিশুটি জানালার কাঁচের ওপাশে জমা হওয়া পানির ফোঁটা গোনে আর মায়ের হাতের খিচুড়ি-ইলিশের সুবাস নেয়। কোনো এক ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিয়ে নিতান্ত বেরসিক প্রেমিকও তখন গুনগুন করে ওঠে আপন মনে। চরম ভোগান্তির পরও এই নগরের বর্ষা বাঙালি হৃদয়কে আজও তোলপাড় করে।
ঢাকার নাগরিক জীবন এক অদ্ভুত টানাপড়েনের মিশেল। জীবিকা বলে ‘তুমি এখানে থাকতে বাধ্য’, কিন্তু হৃদয় তাতে বাদ সাধে। দুইয়ের লড়াইয়ে যে জীবিকারই জয় হয়, সেটি মুখে বলা বাহুল্য। তবে হৃদয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ী জীবিকাও হার মানে এই নগরের প্রকৃতির কাছে। ধুলা, গরম, দূষণ সবকিছুই নাগরিকদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। এমনি করে যখন গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহে মেগাসিটির বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, তখন এক পশলা বৃষ্টি এসে রাজধানীর বাতাসকে করে তোলে বিশুদ্ধ ও শীতল। আশপাশের প্রকৃতির দিকে তাকালে মনে হয় যেন কোনো নিপুণ শিল্পী পুরো শহরকে সবুজ রঙে নতুন করে সাজিয়েছেন। এই সতেজ প্রকৃতিই তখন যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে নগরবাসীকে নতুন উদ্যমে কাজ করার প্রেরণা জোগায়।
আবার বর্ষায় যখন কার্জন হলের কোণে কিংবা রমনায় কদম ফুল ফোটে, তখন রিকশার হুড ফেলে সেই রূপ দেখতে বাধ্য হন ব্যস্ত মানুষটিও। কামিনী আর হাসনাহেনার সুবাসে ঢাকা শহরের সন্ধ্যাগুলো তখন অন্যরকম মাদকতায় ভরে ওঠে। বর্ষার অনন্য রূপ উপভোগ করতে কেউ কেউ ছুটে যান দিয়াবাড়ি কিংবা বহুতল ভবনের রুফটপে। ‘প্রতিদিন হাজারো ফাইল আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে তাকিয়ে জীবনটা যখন একঘেয়ে লাগে, তখন জানালার বাইরে মেঘের ডাক বা বৃষ্টির শব্দ শুনলে মনের ভেতরটা অন্যরকম হালকা লাগে। মনে হয় জীবনটা শুধু ছুটে চলার জন্য নয়, বরং কখনো একটু জিরিয়ে নেওয়ারও’, আগামীর সময়কে বলেছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জিনিয়া রহমান জিনি।
বর্ষা ঢাকার নগর সংস্কৃতিতে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতা আর অলসতা এনে দেয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বাঙালির উৎসবপ্রিয় মন বর্ষাকে উদযাপনের অংশ করে নিয়েছে। বর্ষার গানের আসর বা ছায়ানটের আষাঢ়কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আয়োজন ঢাকাকে এক উৎসবের নগরীতে পরিণত করে। চারুকলার বকুলতলায় ‘বর্ষা উৎসব’ ঢাকাকে মনে করিয়ে দেয় তার সাংস্কৃতিক শিকড়ের কথা। বৃষ্টিভেজা দুপুরে কিংবা বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, শিল্পকলা একাডেমি, রবীন্দ্র সরোবর কিংবা বেইলি রোডের আড্ডায় যোগ হয় নতুন মাত্রা। বর্ষা বাঙালি মধ্যবিত্তের মনে এক ধরনের কাব্যিক একাকিত্ব সৃষ্টি করে, যা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় পুরনো কোনো নস্টালজিয়ায়।
বছরের একটা দীর্ঘ সময় ঢাকাবাসীর ফুসফুস ভারী হয়ে থাকে মেগা প্রজেক্টের খোঁড়াখুঁড়ির ধুলা আর যানবাহনের ধোঁয়ায়। শ্বাস নেওয়াই দায়, সেখানে বর্ষা আসে ত্রাতা হয়ে। আবার কৃত্রিমভাবে এই বিশাল শহরের গাছপালায় পানি দেওয়া অসম্ভব। বর্ষার মেঘগুলো যেন চারপাশের এই তৃষ্ণার্ত গাছগুলোর জন্য প্রকৃতির আশীর্বাদ। ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও এই নগরে বর্ষাকালের গুরুত্ব অপরিসীম। শুষ্ক মৌসুমে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকা শহরের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যায়। একটানা বৃষ্টিপাত সেই ঘাটতি পূরণে দারুণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি শহরের খাল, লেক এবং বুড়িগঙ্গা-তুরাগের মতো নদনদীগুলোর বদ্ধ ও দূষিত পানিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যা নদীগুলোর প্রাণপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। আবার তপ্ত এই শহরে অঝোর বারিধারা এক ধাক্কায় তাপমাত্রাকে কমিয়ে দেয় কয়েক ডিগ্রি।
জলাজট বা ট্রাফিক জ্যামের মতো চিরচেনা কিছু ভোগান্তিকে যদি একপাশে সরিয়ে রাখা যায়, তবে বর্ষা ঢাকার জন্য এক পরম উপহার। মেঘের নূপুরধ্বনি আর বৃষ্টির ছোঁয়া এই যান্ত্রিক ঢাকাকে প্রতি বছর নতুন করে প্রাণ দেয়। সেই সঙ্গে ঢাকাবাসীকে মনে করিয়ে দেয় ইট-পাথরের ভেতরেও একটা মন ছুঁয়ে যাওয়া প্রাণস্পন্দন এখনো বেঁচে আছে এই শহরে।





