কবিদের চোখে ঢাকা

অঙ্কন: অরবিন্দ হালদার
ঢাকা নিয়ে বিভিন্ন যুগের কবিদের কলমে উঠে এসেছে নস্টালজিয়া, নাগরিকতা, রাজনৈতিক ভাবনা আর প্রেম। শহীদ কাদরী থেকে শামসুর রাহমান, আবিদ আজাদ থেকে আল মাহমুদ— বিভিন্ন কবির চোখে ঢাকার নানা রূপ। কবিদের চোখে উঠে আসা ঢাকার নন্দিত-নিন্দিত রূপ নিয়ে লিখেছেন অঞ্জন আচার্য
আজ থেকে ১০২ বছর আগের কথা। ১৯২৪ সালে ৭০ পঙ্ক্তির এক দীর্ঘ কবিতা লেখা হয় ঢাকা নিয়ে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের বাসিন্দা কবি মাহমুদুর রব খালেদের (১৮৯১-১৯৪৪) সেই কবিতাটিই ঢাকা নিয়ে প্রথম উল্লেখযোগ্য কবিতা হিসেবে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। তবে কবিতাটি বাংলায় নয়, লেখা হয়েছিল উর্দুতে। লক্ষ্ণৌ ও আগ্রাকেন্দ্রিক উর্দু সাহিত্যের মজলিসে সুপরিচিত এ কবি লিখতেন ‘খালেদ বাঙালি’ নামে। দীর্ঘ সেই কবিতার শুরুর কয়েকটি পঙ্ক্তি বাঙালায়ন করলে দাঁড়ায়—
পূর্বজদের আলোয় তোমার ললাট শোভিত, ঢাকা
ধন্য নগরী! মানুষ তোমাতে তারা হয়ে জ্বলে, ঢাকা
অপরূপ রূপে প্রতিটি পলকে মুগ্ধ-মোহিত চোখ,
আহা! অপূর্ব হৃদয় জুড়ানো আবহ তোমার, ঢাকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবস্যা চলে গেল। পূর্ববঙ্গ থেকে পূর্ব পাকিস্তান, অতঃপর বাংলাদেশ। পাকিস্তান পর্ব খানিকটা উন্মোচিত হয় ঢাকা। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে এর রূপ বদল হয় নানা সংগতি বা অসংগতিতে। শুরুতেই উল্লেখ করা যায় কবি শহীদ কাদরীর কথা। বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ নতুন এক নাগরিক আধুনিকতা ও নগর-বোধের জন্ম দিয়েছেন তিনি। পঞ্চাশের দশকের অন্য অনেক কবির কবিতায় যখন গ্রামীণ নস্টালজিয়া বা প্রকৃতির রূপ প্রাধান্য পাচ্ছিল, শহীদ কাদরী তখন ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য নাগরিক প্রতিবেশ। তার কবিতায় ঢাকা শহর শুধু একটি পটভূমি নয়, বরং মানুষের নিঃসঙ্গতা, উল্লাস, আতঙ্ক আর আধুনিকতার এক জীবন্ত রূপক।
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তরাধিকার’ (১৯৬৭)-এ ঢাকার পুরনো অলিগলি, রিকশার ঘণ্টা আর উৎসবের দিনগুলো উঠে এসেছে গভীর এক নস্টালজিয়ায়। ‘স্মৃতি: কৈশোরিক’ কবিতায় তিনি ঢাকার গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর আর রঙিন শৈশবকে ধারণ করেছেন এভাবে— “সোনার ঘণ্টার ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত শহরের!/আমি ফিরলাম ঝরনার মতো সেই গ্রীষ্ম দিনগুলোর ভেতর... দীর্ঘ দুপুর ভরে/অপেক্ষমাণ ঘোড়ার ভৌতিক পিঠের মতো রাস্তাগুলো,/গলা পিচে তরল বুদ্বুদে ছলছল নক্ষত্ররাজি...”
শহীদ কাদরীর কবিতায় ঢাকা যেভাবে তীব্রভাবে নাগরিক ও যান্ত্রিক হয়ে উঠেছিল, আবিদ আজাদের কবিতায় ঢাকা সেই যান্ত্রিকতার বৃত্ত ভেঙে লাভ করেছে এক পার্থিব, কোমল ও লিরিক্যাল রূপ। সত্তরের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সামরিক স্বৈরাচারের অবরুদ্ধ রূপ আবিদ আজাদের ঢাকাকেন্দ্রিক কবিতায় ফুটে উঠেছে অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে। তার বিখ্যাত কবিতা ‘এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি’তে তিনি ঢাকার রাজপথের সেই থমথমে ও আতঙ্কিত রূপটি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন— “এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি/হঠাৎ তা শান্ত হয়ে যাবে বোমাবাজির পর দুপুরের কোনো ভুতুড়ে গলির মতো/আমাদের প্রিয় রাজধানী এই ঢাকা চারধারে কেবল বাজতে থাকবে বুটের শব্দ—”
কবি শামসুর রাহমানকে বলা হয় ‘ঢাকার কবি’। তিনি এ শহরেরই সন্তান এবং তার গোটা জীবনের সুখ-দুঃখ, বেড়ে ওঠা এবং কাব্যিক সাধনা আবর্তিত হয়েছে ঢাকাকে কেন্দ্র করে। মাহুৎটুলীর পৈতৃক বাড়ি থেকে শুরু করে রূপমহল সিনেমা হল, পুরান ঢাকার গলি আর বুড়িগঙ্গার জল— সবকিছুই মিশে আছে তার কবিতার অস্থিমজ্জায়। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ঢাকার রূপান্তর, এর রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্পন্দন তার কবিতায় পেয়েছে মহাকাব্যিক রূপ।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও নস্টালজিয়া পুরান ঢাকায় বড় হওয়া শামসুর রাহমানের কবিতায় অত্যন্ত মায়াবী ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে ঢাকার আদি রূপটি। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০) থেকে শুরু করে পরবর্তী বহু কবিতায় পুরান ঢাকার ঘোড়ার গাড়ি, সংকীর্ণ গলি, ঘুড়ি ওড়ানো, বাকরখানি, আর রিকশার টুংটাং শব্দ ফিরে এসেছে বারবার। ‘স্মৃতির শহর’ কবিতায় তিনি ঢাকাকে চিত্রিত করেছেন এভাবে— “গলির মোড়ে আড্ডা, রিকশার বেল, চায়ের দোকানের ধোঁয়া/বুড়িগঙ্গার জল ছুঁয়ে আসা এক টুকরো বাতাস/এই তো আমার ঢাকা, আমার আজন্মের চেনা অবয়ব।”
এক বহুমাত্রিক রূপ নিয়ে ঢাকা শহর এসেছে কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতায়। তার কবিতায় ঢাকা একদিকে যেমন রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মহাকাব্যিক মঞ্চ, অন্যদিকে তেমনি এটি যৌবনের প্রেম, ভবঘুরেপনা এবং এক চরম বৈষয়িক উদাসীনতার চারণভূমি।
ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী অনেক কবির লেখায় যান্ত্রিক ও দূষিত হিসেবে এলেও, গুণের চোখে তা ধরা দিয়েছে এক মায়াবী, রোমান্টিক রূপে। তার ‘বুড়িগঙ্গার জল ও কাজল’ কবিতায় ঢাকাকে এক অনন্য রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন— “মেঘে ঢাকা আকাশের তলে/বুড়িগঙ্গা সাজ করিতেছে,/দু’চোখে কাজল মেখে/বঙ্গের নারীরা যেমন সাজে।”
আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় আবহমান গ্রামীণ জনপদ, লোকজ ঐতিহ্য ও মাটির রূপ ফুটিয়ে তোলার জন্য সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত। তার ‘পুরানো ঢাকায়’ কবিতায় সেই অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে এভাবে—
“এই সুখ পেতেই তো ফিরে আসা পুরানো ঢাকায়।/যে শহরে তুমি নেই সে শহর বাসযোগ্য নয়/হোক তা নিউইর্য়ক লন্ডন প্যারিস কলকাতা/...আমি ভাসি মেঘে মেঘে। জেট প্লেন স্পর্শ করে মাটি।/আবার ঢাকায় আসি। ভিড় ঠেলে হাঁটি।”
আশির দশকের অন্যতম প্রধান কবি ইরাজ আহমেদের সাহিত্যিক চেতনার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ঢাকা শহর। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এ ঢাকাতেই এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘ তিন দশক। ফলে এ মেগাসিটির বিবর্তন, মানুষের রূপবদল ও ফেলে আসা সময়ের প্রতি এক তীব্র নস্টালজিয়া তার লেখায় ফিরে আসে বারবার। তিনি লিখেছেন, ৩০-৪০ বছর আগের ঢাকা তার কাছে হাতের রেখার মতো চেনা ছিল, যেখানে খুব সহজেই অলিগলি, বাড়িঘর বা মানুষকে চেনা যেত। তার কবিতায় সেই চেনা শহরের চেনা মানুষদের হারিয়ে যাওয়ার গভীর হাহাকার পাওয়া যায়। ঢাকার ব্যস্ত জীবন, নিয়ন আলো এবং এ গতিময় শহরের ভেতরেও মানুষের মানসিক নিঃসঙ্গতাকে তার কাব্যিক গদ্য ও ছন্দে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। তার প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলো—‘জুয়াড়ি ও জ্বলন্ত রুমাল’, ‘পুড়তে থাকো বিজ্ঞাপনের আগুনে’, ‘দরজা খোল আফিমের দোকান’, ‘লন্ড্রি মালিকের বড় ছেলে’ কাব্যগ্রন্থের কবিতায় দেখা যায় ঢাকার নাগরিক যাপন ও শহুরে মানুষের ভেতরের শূন্যতার চমৎকার মেলবন্ধন।



