ঢাকার বুনো বাসিন্দারা

পূর্বাচলে মাছের অপেক্ষায় মেছো বিড়াল (ওপরে)। ছবি: আলমাস জামান। মোহাম্মদপুরের বসিলার কাছে রাজকীয় ভঙ্গিমায় বনবিড়াল (নিচে বাঁয়ে) এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনে গোল্ডেন জ্যাকেল বা পাতি শিয়াল। ছবি: মাশুক আহমেদ
এখনো এই ঢাকা শহরের বুকে বিচরণ করে মেছো বিড়াল, বনবিড়াল, শিয়াল, বাঘডাশা, শজারুর মতো বন্যপ্রাণী। কিন্তু আর কতদিন তারা এ নগরায়ণের চাপ সামলে টিকে থাকতে পারবে? লিখেছেন ইশতিয়াক হাসান
কিছুদিন আগে পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় রাতে শজারু ঘুরে বেড়ানোর কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোড়ন তোলে। আরও আগে পূর্বাচলে মেছো বিড়ালের বাচ্চা ঘিরে রীতিমতো ‘বাঘ আতঙ্ক’ তৈরি হয়। মানুষের অত্যাচারে বন্যপ্রাণীদের এমন কোণঠাসা পরিস্থিতিতেও ঢাকা শহরের মিরপুর, ঢাকা সেনানিবাস, পুরাতন বিমানবন্দর, উত্তরা, পূর্বাচল কিংবা আফতাবনগরের মতো জায়গায় এখনো বেশ কিছু প্রজাতির বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে। ঢাকা শহর ছাড়িয়ে আশপাশের সাভার, কেরানীগঞ্জের মতো জায়গায় গাছপালা, ঝোপঝাড়ময় এলাকার সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখানকার বন্যপ্রাণীর অবস্থা তুলনামূলক ভালো।
শুরু করছি ঢাকা সেনানিবাস দিয়েই। সাধারণের প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় ঢাকা শহরের অন্তপুরে হয়েও এখানকার বন্যপ্রাণীর অবস্থা বেশ ভালো। এই এলাকায় যে মেছো বিড়াল আছে সেটা প্রথম জানতে পারি বন্যপ্রাণীপ্রেমী ও আলোকচিত্রী আলমাস জামানের কাছ থেকে। এই এলাকার একটি পুকুরের কাছের আস্তানা থেকে ওটাকে রাজকীয় চালে বেরিয়ে আসতে দেখে তিনি নিজেও কম অবাক হননি। পুকুরটার ধারে শজারুদেরও আস্তানা আছে। সন্ধ্যায় কিংবা রাতে পরিত্যক্ত রেললাইনটা ধরে কাঁটার ঝুমঝুম শব্দ তুলে তাদের হেঁটে বেড়াতে দেখা যায় কখনো কখনো। তেমনি পুরনো বিমানবন্দর এলাকাটিও বেশ সংরক্ষিত এবং গাছপালা থাকায় সেখানেও শজারু, শিয়ালের মতো প্রাণীদের আবাসের কথা জানা যায়।
বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ মিরপুরের কিছু এলাকায় গোল্ডেন জ্যাকেল বা পাতি শিয়ালের কয়েকটি দল এখনো ঘুরে বেড়ায়। তেমনি পাম সিভেটরাও অল্প সংখ্যায় হলেও আছে। অল্পবিস্তর বনবিড়ালও টিকে আছে এই এলাকায়। মিরপুর ছাড়িয়ে যদি উত্তরার দিকে যান তবে সেখানেও শিয়ালরা মোটামুটি ভালো সংখ্যায় আছে এখনো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা অরিত্র সাত্তারের কাছ থেকে জেনেছি এই এলাকায় বনবিড়ালও আছে। অরিত্রর সূত্রেই জানলাম ঢাকার কয়েকটি এলাকাতেই সংখ্যায় কম হলেও লার্জ ইন্ডিয়ান সিভেট বা বাঘডাশা আছে এখনো।
বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ মিরপুরের কিছু এলাকায় গোল্ডেন জ্যাকেল বা পাতি শিয়ালের কয়েকটি দল এখনো ঘুরে বেড়ায়
পূর্বাচল-তিনশ ফুট এলাকার অবস্থাও বন্যপ্রাণীর দিক থেকে এখনো মোটামুটি ভালো। আলমাস জামান সেখানে মেছো বিড়ালের সুন্দর ছবি তুলেছেন। সেখানকার এক জলাশয়ের ধারে ওটার বাড়ি! এই এলাকা বনবিড়াল, বানর ও শিয়ালদেরও ঘাঁটি। মাঝখানে নীলা মার্কেটের কাছে এক রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম এর স্বত্বাধিকারী আমার পূর্ব পরিচিত। তিনি জানালেন, রাতে একপাশ থেকে শুরু হয় কুকুরের ডাক, অন্যপাশ থেকে শিয়ালের। এ দুই প্রাণী নাকি মোটামুটি মিলেমিশে থাকার তরিকা শিখে গিয়েছে।
আফতাবনগরে এখন মানুষের বাড়ি বানানোর হার বেড়েছে। তবে এর মধ্যেও মোটামুটি ভালো সংখ্যায় গোল্ডেন জ্যাকেল এখনো টিকে আছে। রাতে একটু ভেতরের দিকে গেলে এদের ডাক শোনা এমনকি দেখাও পেয়ে যাবেন। বছর কয়েক আগে এক ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে আফতাবনগরে এখনো বনবিড়াল আছে শুনে বেশ অবাকই হয়েছি। এ ছাড়া ডেমরার ভেতরের দিকে এবং মোহাম্মদপুরের বসিলায় এখনো শিয়াল বেশ পরিচিত প্রাণী।
তবে ঢাকার বন্যপ্রাণী বললে সাধারণ বাসিন্দদের মাথায় যে নামটি আসবে সেটা নিঃসন্দেহে বানর। পুরান ঢাকায় বানরের সংখ্যা কমেছে। তবে সেখানকার ঘরবাড়ি, দোকানের ছাদে কিংবা পথঘাটে বানরের দল খাবারের খোঁজে টহল দেয় নিয়মিতই। অনেকগুলো আবার নতুন ঢাকায় হাজিরা দেয় খিদের তাড়নায়। তবে আমার বিবেচনায় ঢাকার পরিবেশের সঙ্গে সবচেয়ে খাপ খাইয়ে নিয়েছে যে প্রাণীটি, সেটি ছোট বেজি। আমি ঢাকার ব্যস্ততম এলাকাগুলোর একটি শান্তিনগরে থাকি। এখানেও বেজি খুব সাধারণ প্রাণী। আমাদের গ্যারেজেও মাঝেমধ্যে ঘুরঘুর করতে দেখে গার্ডকে অনুরোধ করেছি না মারতে। মতিঝিল এজিবি কলোনি, নটর ডেম কলেজে বড় বসতি রয়েছে এদের। এ ছাড়া মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি সব এলাকায় এরা এখনো মোটামুটি সংখ্যায় আছে। যদ্দূর বুঝতে পেরেছি, মাংসাশী প্রাণী হলেও ঢাকার বেজিরা মানুষের উচ্ছিষ্ট, ময়লা-আবর্জনাসহ সবকিছুই খায়। তবে কুকুর-বিড়ালের রাজত্বে ওরা যেভাবে চমৎকার মানিয়ে নিয়েছে, সেটা ভেবে বেশ আনন্দই হয়।
ঢাকায় বেশ কিছু প্রজাতির পাখি আর সরীসৃপও এখনো টিকে আছে। তবে অল্প পরিসরের এ লেখায় ওদের টানলাম না। অন্য কখনো তাদের নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই ছোটখাটো বন্যপ্রাণীদের ঢাকায় টিকে থাকার খবরেই আমার মতো বন্যপ্রাণীপ্রেমীরা আহ্লাদিত হলেও একটা সময় আমাদের ঢাকা শহরে অনেক বড় প্রাণীরও বসতি ছিল। এনায়েত মাওলা ‘যখন শিকারি ছিলাম’ বইয়ে ১৯৫০-এর দশকে এখনকার মিরপুর আর বিমানবন্দরের কাছে চিতা বাঘ শিকারের কথা লিখেছেন। এর কাছাকাছি সময় কুর্মিটোলার দিকেও চিতা বাঘের খোঁজ মেলে। আমার এক নানার মুখে শুনেছিলাম, ১৯৬০ সালের দিকে বনানীতে একটি ভবনের কনস্ট্রাকশনের কাজ চলার সময় তিনি একটি গর্ত পেরোতে গিয়ে ভেতরে শুয়ে থাকা একটা চিতা বাঘের ওপর পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন ভয়ে। মিরপুর, কুর্মিটোলা, পল্টন এবং তেজগাঁও এলাকায় একশ বছর কিংবা তার আগে বুনো শূকরের আক্রমণও অস্বাভাবিক ছিল না। এমনকি শ দুয়েক বছর আগে ঢাকায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারও ছিল খুব স্বাভাবিক প্রাণী। বুনো মোষও তখন চষে বেড়াত আমাদের এখনকার ঢাকা শহর এবং তার আশপাশ এলাকায়।
তবে ঢাকার বন্যপ্রাণীর সেসব সোনালি সময় বিদায় নিয়েছে বহু আগে। ঢাকা শহরের যেসব অল্পবিস্তর খালি জায়গা বা গাছপালাময় এলাকা আছে, সেগুলোও নানা অবকাঠামোর চাপে সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মানুষের বন্যপ্রাণীর প্রতি অসহিষ্ণুতা। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকার সীমানায় টিকে থাকা এসব বনবিড়াল, বানর, শিয়াল কিংবা মেছো বিড়ালরাও চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে পুরো মাত্রায়।






