আজ আর নেই
ধানমন্ডির জাহাজ বাড়ি

ধানমন্ডি লেকের পাড় ধরে হাঁটলে চোখ আটকে যেত বাড়িটায়। লাল ইটের বিশাল শরীর, আকাশের দিকে উঠে যাওয়া উঁচু চূড়া, চারপাশে ছোট-বড় অনেক শিখর আর নিচে লেকের পানিতে কাঁপতে থাকা তার ছায়া। শহরের ভিড়, হর্ন আর ধুলোর মাঝখানে বাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকত একেবারে অন্য জগতের মতো। যতবার দেখেছি, ততবার মনে হয়েছে, ভেতরে কী আছে? কারা থাকে? আর কেনইবা কেউ এমন অদ্ভুত নকশায় বাড়ি বানায়?
প্রশ্নগুলো শুধু আমার একার ছিল না। কেউ ভাবতেন গির্জা, কেউ ভাবতেন কোনো ধর্মীয় স্থাপনা। মুখে মুখে ঘুরত নানা রহস্যের গল্পও। অথচ এত জল্পনার আড়ালে এটি ছিল আসলে একটি ব্যক্তিগত বাসভবন।
বাড়িটির আসল নাম ‘চিশতিয়া প্যালেস’। ধানমন্ডি ৫/এ’র ৬০ নম্বর বাড়িটি তৈরি হয় ১৯৯৩-৯৪ সালে। মালিক এ কে এম আনোয়ারুল হক চৌধুরী, যাকে সবাই চিনত ‘শেরে খাজা’ নামে।
তাহলে ‘জাহাজ বাড়ি’ নাম এলো কোথা থেকে? লেকের পাশে রাস্তা বানানোর সময় বাড়ির সীমানার একটা অংশ ভাঙা পড়ে। পরে নতুন সীমানাপ্রাচীর গড়া হয় জাহাজের আদলে। ব্যস, লোকের মুখে বাড়িটা হয়ে গেল ‘জাহাজ বাড়ি’। যে নামটা ছিল নিছক ডাকনাম, সেটাই একসময় আসল নামকে ছাপিয়ে গেল।
কিন্তু এ শহর পুরনো কিছুকে বেশি দিন টিকতে দেয় না। ২০১৫-১৬ সালের দিকে বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। যে বাড়ি নিয়ে এত গল্প, এত প্রশ্ন, তার বেশিরভাগেরই উত্তর মেলার আগে বাড়িটাই হারিয়ে গেল। লেকের পাড়ে দাঁড়ালে এখন আর সেই লালচে চূড়া চোখে পড়ে না। অনেকে হয়তো বাড়িটির নাম কখনো জানেননি, কিন্তু একবার দেখলে ভোলেননি।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তোলা এ ছবিটা তাই আমার কাছে শুধু একটা বাড়ির ছবি নয়। এটা ঢাকার এমন এক অধ্যায়, যা আমি নিজের চোখে দেখেছি, যা আর কখনো দেখা যাবে না।



