স্বপ্ন ধূসর রজিমের পথে পথে বাবার কান্না

ছবি: আগামীর সময়
নূর মোহাম্মদ রজিমকে হাফেজ বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তার মা-বাবা। কিন্তু ১১ বছরের এই শিশু এখন ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত। সন্তানের যন্ত্রণায় দিশাহারা বাবা নেমেছেন রাস্তায়। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা মোহাম্মদ সুমন পরিবার নিয়ে এখন থাকেন রাজধানীর মিরপুরের লালটেকের একটি ঘিঞ্জি ও অতি সাধারণ টিনশেড ঘরে। ঢাকায় থেকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালান তিনি। এই অতি সাধারণ ও কায়ক্লেশের জীবনযাপনের মধ্যেও সুমন ও তার স্ত্রী জান্নাত জাহান রিতুর সংসারে ছিল এক টুকরো রঙিন স্বপ্ন— নিজেদের একমাত্র সন্তান নূর মোহাম্মদ রজিমকে দ্বীনি ও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন। ছেলেকে একদিন কোরআনের হাফেজ হিসেবে গড়ে তুলবেন, এটাই ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশা। কিন্তু সেই সরল ও সুন্দর স্বপ্নে হঠাৎ আঘাত হানে এক হৃদয়বিদারক বিষাদের কালবৈশাখী।
২০২৪ সালের জুন মাসের দিকে ছোট্ট রজিমকে সুন্নতে খাতনা করানোর পর থেকেই প্রথম বিপদের আশঙ্কাজনক আভাস মেলে। খাতনা সম্পন্ন হওয়ার পর ব্যান্ডেজ খুলতেই শরীর থেকে শুরু হয় অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ এবং সে সঙ্গে দেখা দেয় তীব্র ও অনিয়ন্ত্রিত জ্বর। প্রাথমিক চিকিৎসায় কোনো সুফল না মেলায় শুরু হয় বিভিন্ন জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পরীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্ট আসার পর চিকিৎসকরা যখন আশঙ্কাজনক বার্তা দিয়ে জানান যে, ছোট্ট রজিমের কোমল শরীরে বাসা বেঁধেছে ঘাতক রোগ ‘ব্লাড ক্যানসার’, তখন বাবা সুমন ও মা রিতুর পায়ের নিচের মাটি যেন একমুহূর্তে সরে যায়।
সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, পেশায় একজন দিনমজুর রাজমিস্ত্রি সুমনের জন্য এই দুঃসংবাদটি ছিল কল্পনারও অতীত। তবুও সন্তানের অমূল্য মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি এতটুকু হাল ছাড়েননি। সন্তানকে বাঁচাতে লড়াই শুরু করেন তিনি। কষ্টে অর্জিত জমানো তিন লাখ টাকা, স্ত্রীর গায়ের শেষ গয়নাটুকু, এমনকি গ্রামের ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দেন চিকিৎস খরচ জোগাতে। স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে একের পর এক ধারদেনা করে হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন। এভাবে এ পর্যন্ত ছেলের পেছনে প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ করে ফেলেছেন নিঃস্ব এই বাবা।
এক বছরের দীর্ঘ ও টানা চিকিৎসার পর ২০২৫ সালের দিকে রজিম কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসকদের আশ্বাস এবং সন্তানের শারীরিক অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি দেখে মা-বাবার মনে আবারও আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল সুদিন হয়তো ফিরে এলো। কিন্তু চলতি বছরের জুন মাসে মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে হঠাৎ কোমর ও মেরুদণ্ডের তীব্র ব্যথায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে অবোধ শিশু রজিম। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে পুনারায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর সত্যটি জানিয়ে দেন— ক্যানসার আবারও ভয়ংকর রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে ওর ছোট্ট শরীরে।
এবার রজিমের শারীরিক অবস্থার অত্যন্ত দ্রুত অবনতি হতে থাকে। রোগব্যাধির দাপটে সে এখন না পারে নিজে থেকে দুই কদম হাঁটতে, না পারে ঠিকমতো খাবার মুখে তুলতে। মাথায় তীব্র ও অসহ্য যন্ত্রণা, অনবরত বমি আর প্রচণ্ড জ্বরে কাতর হয়ে বিছানায় শুয়ে দিনরাত শুধু ছটফট করে সে। এই অবর্ণনীয় যন্ত্রণার মধ্যেও শিশুটি যখন একটু কষ্ট করে চোখ মেলে তাকায়, তার নিষ্পাপ মুখে ফুটে ওঠে ব্যাকুল আকুতি, ‘আমি আবার সুস্থ হয়ে আগের মতো মাদ্রাসায় ফিরে যেতে চাই। যেকোনো মূল্যে হাফেজ হতে চাই আমি।’
একজন সাধারণ রাজমিস্ত্রির পক্ষে এতদিন নিজের জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও সুমন এখন পুরোপুরি নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত। তার জমানো সঞ্চয় বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। চিকিৎসকরা এবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, রজিমকে বাঁচাতে আর সাধারণ ক্যানসারের চিকিৎসায় কাজ হবে না; যত দ্রুত সম্ভব ওর ‘বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট’ করাতে হবে। আর এই অত্যন্ত জটিল ও আধুনিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
দিন এনে দিন খাওয়া একজন দিনমজুর বাবার পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ টাকা জোগাড় করা এক অলীক কল্পনামাত্র। প্রতিদিন কাজের সন্ধানে বের হওয়া সুমনের হাতে এখন কোনো কাজ নেই; সন্তানের জীবন বাঁচানোর শেষ আকুতি নিয়ে তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। জীবনের সমস্ত আত্মসম্মান, লজ্জা ও সংকোচ বিসর্জন দিয়ে রাজপথে অঝোরে চোখের জল ফেলছেন আর বিত্তবানদের কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াচ্ছেন। কোমলমতি শিশু রজিমের প্রাণ বাঁচাতে যেকোনো হৃদয়বান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসতে পারেন।
সাহায্য পাঠানোর মাধ্যম:
বিকাশ: ০১৭৬৩-০৩৩০৬১



