‘ঢাকা, সত্যি বলছি তোকে মিস করি ভীষণ’

কোনো কোনো দিন ঘরে ফেরার পথে— আকাশ ভেঙে বড় বড় ফোঁটায় ঝুম বৃষ্টি; সেই সঙ্গে মুহুর্মুহু বজ্রনাদ— এমন ঘনঘটায় ভিজে জবুথবু হতে হতে কারওয়ান বাজারের অফিসপাড়া থেকে হাঁটতে শুরু করতাম। ফেলে আসা জীবনের নানা মুহূর্ত ভাবতে ভাবতে কখনো গলা ছেড়ে গান গাইতাম, কখনো নিজের সঙ্গেই কথা বলতে বলতে পরীবাগ-মিন্টো রোড-রমনা পার্কের পাশের ফুটপাত ধরে বড় বড় গাছ পেরিয়ে পৌঁছে যেতাম প্রেস ক্লাব কিংবা হাইকোর্ট এলাকায়। কখনো আবার শাহবাগ হয়ে টিএসসি-দোয়েল চত্বর-কার্জন হল পেরিয়ে গুলিস্তান মাজার।
সংবাদকর্মী বলে হয়তো ঢাকার গভীরতা আরেকটু বেশি হয়ে ধরা দিয়েছিল। দিন আর রাতের ঢাকার কতই না ফারাক! দিনের আলোয় যে শহরকে আমরা দেখি ব্যস্ততা, হর্ন কিংবা ব্রেকিং নিউজের শহর হিসেবে; রাত নামলে সে শহরই হঠাৎ যেন অন্যরকম হয়ে যেত।
অফিস শেষে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো, শহরটারও বুঝি নিজস্ব কিছু গল্প আছে, কিছু না বলা গল্প আছে।
সেই সঙ্গে ভেজা শহরের গন্ধ, নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের গন্ধ, ফুটপাতের চায়ের ধোঁয়া, বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার পাতা— সব মিলিয়ে অদ্ভুত মায়াবী এক চরিত্র ঢাকা
সাহিত্যের ছাত্র বলে হয়তো শহরটাকে কখনো কেবলই ইট-কাঠ-সিমেন্টের নগর বলে মনে হয়নি। রমনার সবুজ, শাহবাগের বাতাস, টিএসসির চায়ের দোকান, কার্জন হলের পুরনো দেয়াল কিংবা হাইকোর্টের আশপাশের সন্ধ্যা— সবকিছুর মধ্যে কেমন যেন কবিতা খুঁজে পেতাম। এই শহরে কখনো জীবনানন্দের নিঃসঙ্গতা এসে ভর করত, কখনোবা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ভবঘুরে বিষণ্নতা কিংবা কখনো সুনীলের শহুরে প্রেম। ঢাকা যেন নিছক কোনো নগরী নয়; বরং যেন এক জ্যান্ত চরিত্র, যে নীরবে বা সরবে আমার পাশে পাশেই হেঁটেছে।
বিশেষ করে রাতের ঢাকার যেন একটা আলাদা গন্ধ ছিল। সেই সঙ্গে ভেজা শহরের গন্ধ, নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের গন্ধ, ফুটপাতের চায়ের ধোঁয়া, বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার পাতা— সব মিলিয়ে অদ্ভুত মায়াবী এক চরিত্র ঢাকা। এ শহরের জীবনে আবশ্যিকভাবেই জুড়ে যেত রাস্তার পাশের কোনো চায়ের দোকানের এক কাপ কড়া চা আর সিগারেট। সেই ধোঁয়ার ভেতর কত জল্পনা-কল্পনা, কত হতাশা, কত স্বপ্ন আর না বলা কষ্ট মিলিয়ে যেত!
শহরের পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো, পুরো শহরটাই যেন আমার একান্ত কোনো ডায়েরি।
বিদেশের কালো ধোঁয়াহীন, ঝকঝকে, পরিপাটি শহরে হেঁটে যেতে যেতে প্রায়ই মনে হয়— ঢাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নিজের সময়গুলোকে মিস করি সবচেয়ে বেশি। এখানে সবকিছু নিয়মমাফিক; কিন্তু সেই বিশৃঙ্খল, ক্লান্ত, বৃষ্টিভেজা ঢাকার মতো হৃৎস্পন্দন যেন নেই। এখানে রাত নামে নিয়মিত, সদরঘাটের মতো জেগে থাকে না। এখানে বৃষ্টি নামে, কিন্তু রমনার গাছগুলোর মতো কোনো স্মৃতি দুলে ওঠে না।
ঢাকার জ্যাম মিস করি, ভাঙাচোরা ফুটপাতও। মিস করি বৃষ্টিভেজা সেই দীর্ঘ হাঁটাপথ; ফাঁকা রাস্তায় নিজের সঙ্গে কথা বলার মুহূর্তগুলো আর মিস করি সেই আমাকে, যে বহুদিন শহরের ভাঁজে ভাঁজে নিজের জীবন, স্বপ্ন আর বাস্তবতার অর্থ খুঁজে ফিরত।
ঢাকা, সত্যি বলছি তোকে মিস করি ভীষণ।
(লেখক: বর্তমানে নর্দার্ন আইল্যান্ডে বসবাসরত)






