এই কাজ কইরাই তো নিজেরে চলাই, আমি ডরাই না

রাজধানীর এক মূল সড়কের পাশে ক্রেতার অপেক্ষায় মিষ্টি । আলোকচিত্র থেকে এআই ছবি
এই শহরের রাজপথ, ফুটপাত অথবা মানুষ মিষ্টিকে মনে রাখবে না। মনে রাখার কোনো কারণ নেই। পনেরো অথবা ষোলো বছর বয়সী মিষ্টির জীবন স্ট্রিট লাইট অথবা পাদপ্রদীপ— কোনো আলোতেই উদ্ভাসিত নয়। জীবনে বয়ে যাওয়া অবিরল রঙের ধারার একটি আঁচড়ও তার আয়ত্তে নেই। সফলতা তাকে স্পর্শ করেনি কোনোদিন, স্বস্তি না, জীবনের গভীর কোনো অর্থও না। মিষ্টির জীবনে একমাত্র সফলতা মনে হয় বেঁচে থাকা; মারাত্মকভাবে প্রতিদিন বেঁচে থাকা।
গাঁজা বিক্রি করে মিষ্টি। এখন পুরান ঢাকার হাসনাবাদ এলাকা থেকে উত্তরার দিকে ধাবমান বাসের ডেইলি প্যাসেঞ্জার বনে গেছে তার জীবন। পরনে তার রঙ চটে যাওয়া সালোয়ার-কামিজ, হাতের মুঠোয় ধরা ছোট্ট একটা ব্যাগ। কোমরে গোঁজা গাঁজার পোটলা। ভোরবেলা বাস ধরে উত্তরায় চলে আসে মিষ্টি। তারপর সঙ্গীদের সঙ্গে মিলে শুরু হয় তার গাঁজা বিক্রেতার ভূমিকা। দিন কাটে, রাত বাড়ে; মিষ্টির ব্যস্ততা কমে না। কখনো মোটরবাইকে করে কেউ এসে দাঁড়ায়, বাতাসে ওড়ে ইশারা। ছুটে যায় মিষ্টি, ক্রেতার হাতে গুঁজে দেয় গাঁজার পুরিয়া। আবার কখনো রাজপথে তীব্র গতিতে ধাবমান কোনো আন্তঃজেলা বাস ব্রেক কষে নির্দিষ্ট স্পটে। অন্য যানবাহনের বিপজ্জনক গতিকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে বাসের কাছে পৌঁছে যায় মিষ্টি। চোখের পলকে লেনদেন হয় নেশাদ্রব্য আর টাকা।
‘কত পাও গাঁজা বিক্রি করে?’ প্রশ্ন শুনে উত্তর দেয় না মিষ্টি। পথের দিকে তার সতর্ক দৃষ্টি ক্রেতার খোঁজে। কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই জানায়, ‘এই ধরেন, কোনোদিন দুইশ আবার কোনো দিন চাইরশ।’
‘আর যেদিন বিক্রি কম সেদিন?’
‘সিন্ডিকেট ট্যাকা দেয়।’
‘তোমাদেরও সিন্ডিকেট আছে?’
‘আছে, ওই যে ওসমান, বইসা আছে, অয় চলায় আমাগো।’
ওসমান নামে তরুণটিকে বেশিরভাগ দিন একটা বেসরকারি ব্যাংকের সিঁড়িতে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখা যায়। ওসমান নেশার ঘোরে নিজের শরীর ফালা ফালা করে ব্লেড দিয়ে কাটে। ওসমান ওদের দলনেতা।
‘এই কাজের শুরু কবে থেকে?
‘বেশিদিন না। বছর দুই হইব। বাসের এক হেলপার পরিচয় করাইয়া দিছিল এগো লগে। তারপর থেইকা গাঞ্জা বেচি।’
‘হাসনাবাদে কার সঙ্গে থাক?’
‘আব্বা, আম্মা নাই। ভাই-ভাবির লগে থাকি।’
‘তুমি যে গাঁজা বিক্রি করো তারা জানে?’
‘জানে না। লুকাইয়া চইলা আসি উত্তরায়। এহানে কেউ চিনে না আমারে।’
শহর ঢাকার এই অঞ্চলে কেউ চেনে না মিষ্টিকে। কিন্তু পুলিশ ঠিকই চেনে। নিয়ম করে পুলিশের গাড়িতে চেপে থানা-হাজতে ঢুকতে হয় তাকে। সেখান থেকে জেলেও। কয়েক মাস কয়েদ খেটে আবার বের হয়ে আসে। নির্দিষ্ট উকিল জামিনের ব্যবস্থা করে দেয়। দুই বছরে পাঁচ থেকে ছয়বার জেল ঘোরা হয়ে গেছে তার।
‘লেখাপড়া জানো?’
‘জানি, সিক্স পর্যন্ত পড়ছিলাম। ভাই আর পড়ালেখার ট্যাকা দিতে চায় না।’
‘তুমি গাঁজা খাও?’
‘খাই, খাইলে ক্ষুধা লাগে না।’
‘এই যে গাঞ্জা বিক্রি করো, চারদিকে নানা ধরনের মানুষ আছে, পুলিশ আছে, তোমার ভয় লাগে না?’
প্রশ্ন শুনে তার বেপরোয়া ঠোঁটে হাসি ঝলসে ওঠে।
‘ভয় লাগব ক্যান! আমি ডরাই না। এই কাজ কইরাই তো নিজেরে চালাই। ভাই খালি একবেলা খাওন দেয়; আর কিছু দেয় না।’
এখন মাদকদ্রব্য বিক্রির বিশাল চক্র গড়ে উঠেছে ঢাকার উত্তরা এলাকায়। মিষ্টি জানায়, গাঁজা বিক্রির আট থেকে দশটা স্পট আছে বিভিন্ন সেক্টরে। সস্তা নেশা গাঁজার চাহিদাও বেশি। মিষ্টিও এই চক্রের একটি দলের সদস্য।
‘স্কুলে যে যেতে সেখানে বন্ধু-বান্ধব ছিল না?’
সোজাসাপ্টা উত্তর মিষ্টির, ‘হেই টাইমের কথা আমি ভুইলা গেছি, এগুলা পুরান কথা, ইতিহাস।’
যখন কাজ থাকে না কী করে মিষ্টি? প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই এক কাস্টমারের বাইক এসে দাঁড়ায় ফুটপাত ঘেঁষে। মিষ্টি পাখির মতো ছোঁ মারে তাকে। হাতে গুঁজে দেয় পুরিয়া। ফিরে এসে বলে, ‘কিছুই করি না, বাড়িতে শুইয়া থাকি আর ফোনে গান শুনি, সিনেমার রিল দেখি।’
মিষ্টি ঠিক যে স্পটটায় রোজ দাঁড়ায় তার পাশেই নামি ব্র্যান্ডের একটা কফির দোকান। কখনো কি কফি খেতে ইচ্ছা করে মিষ্টির? কিন্তু এক কাপ কফির যে অনেক দাম।
কফি খাওয়ানোর প্রস্তাব রেখেছিলাম তার কাছে। আবারও হাসি মেশানো উত্তর আসে, ‘আমারে ওই দোকানে ঢুকতেই দিব না।’
কথাটা বলেই ক্রমে ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যার আঁধারের সঙ্গে মিশে দাঁড়ানো আরেক ক্রেতার দিকে ছুটে যায় মিষ্টি। আর ফিরে আসে না; দূর থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানায়।
[আগামীর সময় মাদক বা মাদকজাতীয় পণ্য সেবন, বিপণন ও প্রচারণা সমর্থন করে না। শুধু এই লেখার মূল চরিত্রের জীবন-বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে মাদক প্রসঙ্গ এসেছে— বি.স.]





