আমি স্বপ্নের মধ্যেও এ শহরটাকেই দেখি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তার প্রিয় গ্রহ বৃহস্পতি। পৃথিবী থেকে প্রায় ৯৬ কোটি ৮০ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ গ্রহে অসংখ্য ঝড় বয়ে চলেছে বহু বছর ধরে। সে গ্রহটিই মশহুরউল আমিনের প্রিয়। কিন্তু এ নামে তাকে এখন কাছের মানুষরা ছাড়া অন্যরা সহজে চিনতে পারবে না। তিনি পরিচিত মহাকাশ মিলন নামে। মহাকাশ নিয়ে তার ভাবনা আর কৌতূহলের শুরু এখন থেকে ৩৮ বছর আগে। সময়টা ছিল ১৯৮৮ সাল। সেই কৌতূহল আর আগ্রহ থেকেই তিনি সংগঠিত করেছেন অ্যাসট্রোনমিক্যাল সোসাইটি। এখন তার কাজই হচ্ছে আগ্রহী মানুষদের, বিশেষ করে ছোটদের মহাকাশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
একদিন বেলুনে চড়ে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন মিলন। সে স্বপ্ন সফল হয়নি। জ্যাক লন্ডনের সি উলভস উপন্যাস পাঠ করে আকাশে নক্ষত্রদের চেনার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তার মনে। আকাশে বেলুনে চড়ে ওড়ার সে স্বপ্নটাই তাকে মহাকাশবিষয়ক চর্চায় ধরে বেঁধে রেখেছে আজও। এখন টেলিস্কোপ নিয়ে মিলন আর তার সংগঠনের সদস্যরা চলে যান নানা জায়গায়। সেখান থেকে নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ চাঁদ অবলোকনে সহায়তা করেন অন্যদের।
‘মহাকাশ চর্চা ছাড়া আর কী করেন আপনি?’
প্রশ্নটা শুনে সহজ হেসে মিলনের উত্তর, ‘আর কিছুই না। আমার আর কিছু করতে ইচ্ছা হয়নি আকাশে তাকানো ছাড়া।
‘কোনো চাকরি?’
‘একেবারেই না। চাকরিবাকরি করার জন্য আগ্রহবোধ করিনি। আশির দশকে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। লেখক শিবিরের সদস্য ছিলাম। সেখানে দেখেছি বহু শ্রমজীবী মানুষ শুধু অন্য এক স্বপ্নে জড়িয়ে থেকে একটা জীবন পার করে দিচ্ছেন। তারা শুধু রাজনীতিটাই করতে চেয়েছেন। তাদের দেখে আমি নিজেও একটা সময়ে ভাবলাম, এ মহাকাশবিষয়ক চর্চা করেই জীবন কাটাব। মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়াই আমার স্বপ্ন হয়ে উঠল।’
এ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে একদিন তার প্রকৃত নামটাই আড়ালে চলে গেল। তিনি হয়ে উঠলেন মহাকাশ মিলন। ২০০১ সালে তখনকার দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় মহাকাশবিষয়ক লেখালেখি করতেন তিনি। প্রয়াত সাংবাদিক, সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী তার এ ছদ্ম নামটি তৈরি করেছিলেন।
৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা শহরের কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা তিনি। ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন। পড়াশোনা করতে তার একেবারেই ভালো লাগত না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম বিজ্ঞান জাদুঘরে চাঁদের মাটির প্রদর্শনীতে গিয়ে অবাক হয়েছিলেন। হয়তো মহাকাশ নিয়ে আগ্রহের সূত্রপাত সেখান থেকেই। তারপর ১৯৮১ সালে সূর্যগ্রহণ, ১৯৮৬ অথবা ৮৭ সালে বিখ্যাত ‘হ্যালির ধূমকেতু’ দেখে তার মনটাই পাল্টে গিয়েছিল। ঠিক করে ফেলেছিলেন আকাশে চোখ রেখেই কাটিয়ে দেবেন এক জীবন।
তার দীর্ঘ শহরবাসের ইতিকথায় বহু পরিবর্তন দেখেছেন। পাল্টে গেছে শহরটা। বদলেছে মানুষের আচরণ। কেমন লাগল এ যাত্রাপথ প্রশ্ন করতে মিলন বললেন, ‘ভালো লাগেনি। চেনা শহরটা এমনভাবে অচেনা হয়ে যাবে ভাবিনি। আমার একটা প্রিয় শখ হচ্ছে, পায়ে হেঁটে বহুদূর চলে যাওয়া। এখন এ শহরে নিরাপদে আর হাঁটতে পারি না।’
‘তাহলে কি এই ঢাকা শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে?’
‘না। আমি স্বপ্নের মধ্যেও এ শহরটাকেই দেখি। এই ঢাকা ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়ার কথা আমি ভাবি না। এত পরিবর্তন, এত প্রতিকূলতার পরও ঢাকা আমার প্রিয় শহর। কোথাও যাওয়ার কথা ভাবি মাঝে মাঝে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বসবাস করার কথা একদমই ভাবি না।’
‘এই শহরে মহাকাশ মিলনের প্রিয় ঋতু বর্ষা। বৃষ্টিতে ভিজতে আজও ভালো লাগে তার। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পথ হাঁটতে ভীষণ ভালো লাগে তার। তবে আজকাল মনে হয়, শহরটা তার সেই রোমান্টিক জায়গাটা ভিড়, দোকানপাট আর যানজটের মধ্যে হারিয়ে গেছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাস তাকে ছোটবেলায় আলোড়িত করেছিল। জ্যাক লন্ডনের লেখা ‘সি উলভস’ উপন্যাস পড়ে তিনি বিশ্বাস করেন শক্তিশালী মানসিকতা প্রয়োজন জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে। তাই মাথার ভেতরে আজও ৮৮টি স্বপ্ন নিয়ে ঘোরেন মিলন। পৃথিবীতে কত জায়গায় যাওয়ার স্বপ্ন, কত কী করার স্বপ্ন তার!




