নগর চরিত্রের খোজে
কেমনে কমু কেমন আছি?

কাজের ফাঁকে লেখকের ক্যামেরাবন্দি চানু মিয়া
কবে এসেছিল তারা এই শহরে? ঢাকা শহরের গোড়াপত্তনের সময়ে নাকি তারও আগে? কোথায় কোন পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে হাঁক দিয়েছিল— এই, দা-ছুরি ধার করাইবেন? তখনো কি তাদের কাঁধে থাকত অনেকটা সাইকেলের মতো দেখতে প্যাডেলযুক্ত একট যন্ত্র? যন্ত্রের মাথায় বসানো ধার দেওয়ার পাথর?
হয়তো না। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে কাজ করার প্রক্রিয়া। কিন্তু এ ভ্রাম্যমাণ পেশাজীবীরা কি ইতিহাসের ধারাবাহিক মানুষ হয়েই থেকে গেছে? চানু মিয়ার জীবনের খোঁজখবর নেওয়ার সময় এ প্রশ্নটাই ঘুরেফিরে চিন্তার ভেতরে একটা প্যাটার্ন তৈরি করে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, অনেক বছর আগে শোনা একটা গল্পই আবার শুনছি।
চানু মিয়া মধ্যবয়সী। কত হবে তার বয়স? তিরিশের ঘরের সঙ্গে সময় হয়তো যোগ করেছে আরও দু-এক বছর। সে নিজেই ঠিক করে বলতে পারল না জন্মের সন-তারিখ। বলতে পারার কথাও নয়। চানু মিয়া আমার কাছে তখন এক ধারাবাহিক মানুষ। বারো বছর বয়সে চাচার কাছ থেকে দা-ছুরি ধার দেওয়ার কাজটা শিখেছিল। হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং গ্রামের বাসিন্দা চানু তখনো চাষাবাদের কাজে সহযোগী কর্মী। তারপর একদিন গ্রাম থেকে এ শহরে। ছুরি ধার দেওয়ার শেখা বিদ্যা কাজে লাগিয়ে ভাত-কাপড় জোগাড়ের চেষ্টা।
টঙ্গী শহরে ছোট একটা ঘরে থাকে চানু মিয়া। সেই ঘরে আরও কয়েকজনের বসবাস। তারাও একই পেশার মানুষ। একটা অন্ধকার ঘর, সেখানে একটা চৌকি ফেললেই পুরো ঘর ভরাট হয়ে যায়। কয়েকজন মানুষ গাদাগাদি করে রাতে ঘুমায়। ভোরে যন্ত্র ঘাড়ে করে বের হয়ে পড়ে; শহরের নানা গলির মাথায় দাঁড়িয়ে হাঁক দেয়— দা-ছুরি ধার করাইবেন?
জানতে চাইলাম কী খেয়ে জীবন বাঁচে চানু মিয়ার, তার কামাই-রোজগার কেমন? প্রথমে উত্তর আসে হাসি দিয়ে। তারপর বলছিল, ‘এই কুনুদিন একশ-দুইশ আবার কুনুদিন এক টাকাও না। মাইনষে তো সবসময় ধার দেওনের কাজ করায় না।’
ধার দেওয়ার যন্ত্রটা তৈরি করাতে পাঁচ হাজার টাকা লাগে। মাঝেমধ্যে মেরামতে যায় পাঁচশ। তারপর গ্রামে টাকা পাঠাতে হয়। হাতে কিছুই থাকে না।
‘গ্রামে কে থাকে আপনার?’
‘বাপ-মা, বউ আর তিন সন্তান।’
‘গ্রামে যান?’
‘যাই ধানের টাইমে কাজ করতে। এইবার পানিতে সব ধান ডুইবা গেছে। কাজ নাই তাই চইলা আসছি।’
‘এখানে কাজের শেষে কী করেন?’
‘ঘুমাই। সারা দিন পথে পথে ঘুরলে শরীলে জ্বর আইসা পড়ে। বাড়ি গিয়া ভাত রাইন্ধা খাই; তারপর ঘুমাইয়া থাকি।’
জানতে ইচ্ছা করল চানু মিয়া কী খায়? তার খাবারে দৈনিক ক্যালরির পরিমাণ কত?
‘শুধু ভাত খান, আর কিছু খান না?’
‘খাইতো, কুনুক দিন আলু ভর্তা নাইলে পেঁপে ভর্তা। আর সবজির অনেক দাম; কিনতে পারি না।’
‘কবে শেষ মাংস খেয়েছেন?’
গত কোরবানির ঈদে। একজন দিছিল, বাড়িতে নিয়া গেছি। পোলাপান মাংস খাইতে পায় না অনেক দিন...।’
জীবনের বারো বছর সময় এ শহরেই কেটে গেছে চানু মিয়ার যন্ত্র কাঁধে হাঁটতে হাঁটতে। তার কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই এখানে। একা একা এরকম আরও অনেক চানু মিয়ার বেঁচে থাকার সঙ্গে তার বেঁচে থাকার প্রক্রিয়ারও কোনো পার্থক্য নেই। এই আলোহীন, কীর্তিহীন পরাজয়ের মধ্যে তাদের বেঁচে থাকা নিজের মতো করে। কোনো একদিন একটু কাজ পেলেই খুশি সে। জীবনকে সুস্বাদু মনে হয়। ভালো করে কানে শুনতে পায় না চানু মিয়া। যন্ত্রের একটানা ঘড়ঘড় শব্দে একটা সময়ে তার শ্রবণযন্ত্র বিকল হয়ে গেছে। চিৎকার করে হাঁক দিতে দিতে গলায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। খেতে গেলে কষ্ট হয়। তবুও বেঁচে আছে সে দা-ছুরি ধার দিয়ে।
‘লেখাপড়া তো জানি না। জানলে, অন্য কিছু কইরা চাইট্টা ভাত খাইতে পারতাম।’
কাজ করতে করতে খেদোক্তির মতোই কথাটা বলে চানু মিয়া। এ জীবনের কাছে তার আর কোনো চাওয়া নেই। আছে শুধু মাথা গুঁজে কাজ করে যাওয়া।
‘সব মিলিয়ে কেমন আছেন এই শহরে?’
আবারও হাসে চানু মিয়া।
‘কেমনে কমু কেমন আছি? বাঁইচা আছি।’




