ঢাকার বিশ্বকাপ ঢাকার ফুটবল

ছবি: শামীম-উস-সালেহীন
বিশ্বকাপ এলেই পুরান ঢাকার গলিগুলো পরিণত হয় উৎসবপাড়ায়, ছাদে ছাদে ওড়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। কিন্তু এ উন্মাদনার শিকড় শুধু বিশ্বকাপে নয়, আবাহনী-মোহামেডানের কিংবদন্তি লড়াই আর জাতীয় স্টেডিয়ামের গর্জনে গড়া কয়েক দশকের ফুটবল ঐতিহ্যে। সেই ইতিহাস ও আবেগের গল্প লিখেছেন শিহাব উদ্দিন
চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ, তাতে বাংলাদেশের কী! বাংলাদেশ তো আর টুর্নামেন্টে খেলছে না! বিশ্বকাপের সময় এমন ভাবনা কি দেশের কারও মনে আসে? একদমই না।
এটাই স্বাভাবিক। এত উন্মাদনা-উত্তেজনা, রাত জেগে খেলা দেখা, জার্সি কিনে পকেট ফাঁকা করা কিংবা বাড়ির ছাদে পতাকা টানিয়ে মাসখানেকের জন্য জাতীয়তা বদলে ফেলা— এসব পাগলাটে কাণ্ড যখন বাংলাদেশিরাই করে তখন দল টুর্নামেন্টে খেলুক আর না খেলুক, তাতে কিছু আসে যায় না। বিশ্বকাপ চলছে, এখন এর উন্মাদনায় গা ভাসানোই এ দেশের মানুষের রীতি।
আর সেটাই হচ্ছে। যেমন ধরুন পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার রজনী চৌধুরী রোডে ঢুকলেই মনে হবে, এটি যেন ঢাকার কোনো রাস্তা নয়, বিশ্বকাপের উৎসবপাড়া। ঠিক একই চিত্র টিকাটুলীর কেএম দাস লেনে। সেখানে তো ওই রাস্তার নামই বদলে গেছে। এখন তা ফিফা গলি।
শুধু এ দুটি গলিই নয়; যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার, বংশাল, চকবাজার বা লালবাগ— এই এলাকাগুলোর রাস্তায় হেঁটে আপনি বিশ্বকাপের আমেজ পাবেন শতভাগ। আর পুরান ঢাকার এ ফুটবল উন্মাদনা কিন্তু এই সেদিনের নয়।
এ উন্মাদনা মিশে আছে ঢাকার ফুটবল ইতিহাসে। গুলিস্তানের জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে, মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায়, আবাহনী-মোহামেডানের উত্তপ্ত লড়াই এই অংশ।
পুরান ঢাকাকে ফুটবলের শহর বললেও ভুল হবে না। এর শুরুতে আছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। কীভাবে? ১৯৮৬ বিশ্বকাপ দিয়ে। সেই স্মৃতিচারণ করেছেন পুরান ঢাকাতেই বসবাস করা বাংলাদেশের খেলার পরিচিত মুখ সাংবাদিক আরিফুর রহমান বাবু, ‘বাংলাদেশে বিশ্বকাপ প্রথম দেখেছিলাম ১৯৭৪-এ তখন রেকর্ডেড খেলা দেখতাম। ৭৮, ৮২-তেও একইরকম ছিল। কিন্তু ১৯৮৬ থেকে লাইভ টেলিকাস্ট বিশ্বকাপ দেখে বাংলাদেশ। সেই থেকে ঢাকায় ফুটবলের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, ওই একই সময় ঢাকার ক্লাব ফুটবলের আকর্ষণও উঠে যায় তুঙ্গে, “পুরান ঢাকায় সবসময়ই বিশ্বকাপের আমেজ থাকত। বিশ্বকাপ উপলক্ষে টুর্নামেন্ট হতো। তরুণরা জিকোর মতো চুল রাখে, ম্যারাডোনা হতে চায়। ১০ নম্বর জার্সি জিনিসটা কী, সেটা ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনাকে দেখেই বুঝতে পারে সবাই। ম্যারাডোনার ছবি দিয়ে টি-শার্ট, ভিউ কার্ড হয়। ম্যারাডোনার ছবি দিয়ে কার্ডে বাংলা ক্যাপশন হতো— ওরা আমাকে এত মারে কেন? ওই জিনিসটা এখন ফেসবুকে চলে এসেছে। কিন্তু তখনকারটা ছিল ‘জেনুইন’, ফেসবুক আমার কাছে ‘মেকি’। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের জন্যই ঢাকার ফুটবলে মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে ওঠে। মোহামেডান, আবাহনী ও ব্রাদার্স এই তিন দল ছিল আগ্রহের কেন্দ্রে। তিন দলের মধ্যে মোহামেডান-আবাহনীর লড়াই তো কিংবদন্তি।”
আশির দশকে আবাহনী, মোহামেডান ও ব্রাদার্স ম্যাচের দিন মানেই ঢাকার বিশেষ দিন। জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে যেত। সকাল থেকেই পুরান ঢাকার অলিগলিতে ম্যাচ নিয়ে আলোচনা চলত। বিকালে মানুষ ছুটত গুলিস্তানের স্টেডিয়ামের দিকে। খেলা শেষে জয়ী দলের সমর্থকরা মিছিল করত আর পরাজিত দলের সমর্থকরা মুখ লুকিয়ে বাড়ি ফিরত।
লোকমুখে এখনো গল্প চালু আছে— মোহামেডান হারলে নাকি কিছু এলাকায় গোশতের দোকানে ভিড় কমে যেত, কারণ সমর্থকদের মন খারাপ থাকত। আবার দল জিতলে উৎসবের আমেজে বাজারও জমে উঠত। আরিফুর রহমান বাবু অবশ্য এসবকে মিথ বলছেন, ‘এরকম লোকে বলে কিন্তু সত্যি নয়। কারণ, সূত্রাপুর বাজারের এক গোস্তের দোকানের বিক্রেতা ছিলেন পাঁড় আবাহনী সমর্থক। মোহামেডান ম্যাচ হারের পরদিন রোজকারের মতো নিজেই আমাদের গোশত কিনতে ডাকতেন।’
সেই সময় জাতীয় স্টেডিয়াম ছিল ঢাকার ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র। পুরান ঢাকা থেকে স্টেডিয়ামের দূরত্ব ছিল সামান্য। ফলে বংশাল, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, ওয়ারী কিংবা টিকাটুলীর মানুষের কাছে ক্লাব ফুটবল ছিল হাতের নাগালের বিষয়। মাঠের গ্যালারির উত্তেজনা সরাসরি ছড়িয়ে পড়ত মহল্লার আড্ডায়।
আর বিশ্বকাপ এলেই স্থানীয় ফুটবলের সেই আবেগ মিশে যেত বৈশ্বিক ফুটবল উৎসবে। আবাহনী বা মোহামেডানের সমর্থকরা হয়ে যেতেন আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইতালি কিংবা জার্মানির সমর্থক। ক্লাব ফুটবলই তাদের বিশ্বকাপকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল।
বিশ্বকাপ এলেই সেই স্থানীয় ফুটবল সংস্কৃতি মিশে যেত বৈশ্বিক ফুটবল উৎসবের সঙ্গে। যারা সারা বছর আবাহনী বা মোহামেডানের সমর্থক ছিলেন, তারা বিশ্বকাপের সময় হয়ে যেতেন ম্যারাডোনা, রোমারিও, বাতিস্তুতা কিংবা রবার্তো বাজ্জিওর অনুসারী। ক্লাব ফুটবল তাদের ফুটবল-চেতনার ভিত্তি তৈরি করেছিল। ফলে বিশ্বকাপ ছিল না চার বছর পরপর হঠাৎ এসে পড়া কোনো উন্মাদনা; বরং স্থানীয় ফুটবলপ্রেমেরই একটি আন্তর্জাতিক রূপ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রবাহে ভাটা পড়ে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে জাতীয় স্টেডিয়াম ক্রমেই ক্রিকেটকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। ফুটবলের অনেক আয়োজন সরতে থাকে মিরপুরে। পরে ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে যায় মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। যদিও পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্টেডিয়াম আবার ফুটবলের প্রধান ভেন্যু হিসেবে ফিরে আসে, ততদিনে ফুটবল তার পুরনো সামাজিক অবস্থানের অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে।
মোহামেডানের দীর্ঘদিনের সঙ্গী ক্রীড়া সংগঠক তরিকুল ইসলাম টিটু ওই সময়ের স্মৃতি টেনে বলছিলেন, ‘ফুটবলটা মিরপুরে চলে যাওয়ায় মাঠে বসে ক্লাব ফুটবল দেখা অনেক কমে যায়। মিরপুরে তখন রাতের দিকে ছিনতাই হতো। নিরাপত্তার অভাবের ভয়ে অনেকেই পুরান ঢাকা থেকে এতদূর গিয়ে খেলা দেখতে চাইত না। কারণ, তখন যাতায়াতব্যবস্থা এত সহজ ছিল না, মানুষও কম ছিল। মূলত এসব কারণেই মানুষ মাঠের ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’
স্টেডিয়ামের সঙ্গে পুরান ঢাকার যে দৈনন্দিন সম্পর্ক ছিল, সেটি দুর্বল হয়ে পড়ে। মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় খেলা দেখতে যাওয়ার অভ্যাস কমে যায়। নতুন প্রজন্মের বড় অংশ স্থানীয় ক্লাবের চেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা বা লিভারপুলের সঙ্গে। ইউরোপীয় ফুটবল টেলিভিশনের পর্দা দখল করে নেয়।
তারপরও পুরান ঢাকার বিশ্বকাপ অন্যরকম। এখানে এখনো পতাকা বানানো হয় মাসখানেক আগে। এখনো মহল্লাভিত্তিক সমর্থকগোষ্ঠী রাত জেগে খেলা দেখে। এখনো কোনো কোনো ছাদে বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকার নীরব প্রতিযোগিতা চলে। অনেক পরিবারে দাদা নাতিকে বলেন কায়সার হামিদ, আসলাম, চুন্নু কিংবা সালাহউদ্দিনের গল্প; নাতি পাল্টা বলে মেসি, রোনালদো, নেইমার, এমবাপ্পে কিংবা ইয়ামালের কথা।
আসলে পুরান ঢাকার বিশ্বকাপকে বুঝতে হলে শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থনের দিকে তাকালে হবে না, এর পেছনে আছে কয়েক দশকের ফুটবল ঐতিহ্য। আছে আবাহনী-মোহামেডানের উত্তেজনা, জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারির গর্জন, ক্লাবপাড়ার বিকাল আর ফুটবলকে ঘিরে গড়ে ওঠা নগর সংস্কৃতি।
আজ হয়তো আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচে আগের মতো লাখো মানুষের আলোচনা নেই। জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিও আর আশির দশকের মতো উথলে ওঠে না। কিন্তু বিশ্বকাপের রাতে পুরান ঢাকার কোনো ছাদে দাঁড়িয়ে যখন দেখা যায় শত শত পতাকা বাতাসে দুলছে, তখন বোঝা যায়— ফুটবল এখান থেকে হারিয়ে যায়নি।
ঢাকার বিশ্বকাপের গল্প তাই আসলে ঢাকার ফুটবলেরই গল্প। বিশ্বকাপের উন্মাদনার নিচে এখনো লুকিয়ে আছে সেই পুরনো শহরের স্মৃতি, যে শহর একদিন আবাহনী-মোহামেডানের একটি ম্যাচের জন্য নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করত।




