প্রেম, ক্ষমতা আর ট্র্যাজেডির বাকরখানি

পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের একটি কারখানায় তৈরি হচ্ছে বাকরখানি। ছবি: মহুবার রহমান
বাকরখানি শুধু একটি খাবার নয়— এটি পুরান ঢাকার স্মৃতির স্বাদ, জীবিকার গল্প আর প্রজন্ম পেরিয়ে আসা এক নীরব ঐতিহ্য। আবার এর শিকড় ছড়িয়ে আছে মুঘল আমলের ইতিহাসে; পুরনো এক প্রেম, ক্ষমতা আর ট্র্যাজেডিতে। কয়েক প্রজন্মের শিকড়, নস্টালজিয়া আর সোনালি অতীতে মিশে থাকা বাকরখানির গল্প লিখেছেন শম্পা বিশ্বাস
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠেনি শহর। রাতের শেষ অন্ধকারটুকু পুরান ঢাকার সরু গলির দেয়ালে লেগে আছে। কিন্তু কোথাও দোকানের শাটার উঠেছে, ধোঁয়া উঠছে গরম চুল্লি থেকে। ব্রাহ্মমুহূর্তের নরম আলো আর হিমেল হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে ময়দা, ঘি আর পোড়া কাঠের গন্ধ। সেই গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে শত শত বছরের পুরনো এক স্বাদ— বাকরখানি।
পুরান ঢাকার ছোট্ট দোকানগুলোর চুল্লির ভেতর একের পর এক ফুলে ফুলে ওঠে বাকরখানি। আগুনের আঁচে যার গায়ে লাগে সোনালি রঙ। চুল্লির লেলিহান শিখা ছুঁয়ে যায় পাশে বসে থাকা কারিগরের ঘর্মাক্ত মুখও। একসময় কারিগরের অপেক্ষা শেষ হয়। তপ্ত চুল্লির ভেতর থেকে বের করা হয় বাকরখানি। কামড় দিতেই মচমচ করে ভেঙে যায়; ভেতরে থাকে হালকা ঝরঝরে নরমভাব সঙ্গে ঘি আর ময়দার এক আলাদা ঘ্রাণ। গলি পেরিয়ে সেই ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে, যা পুরান ঢাকার মানুষকে টেনে আনে বহু দূর থেকেও। তাই সকালে গরম চায়ে হালকা ডুবানো বাকরখানি মুখে পুরা, পুরান ঢাকার বহু মানুষের কাছে শুধু নাশতা নয়, বরং শতাব্দীর স্বাদ।
পুরান ঢাকার ইতিহাস শুধু ইট-পাথরের পুরনো বাড়িতেই ছড়িয়ে নেই। বরং এই ইতিহাসে মিশে আছে ঢাকার নানা খাদ্যসংস্কৃতিও। আর সেই তালিকায় বাকরখানির অবস্থান আলাদা। কারণ কিছু স্বাদ শুধু পেট ভরায় না— মন ভরায়। বাকরখানিও তেমন। এর স্বাদ নিয়ে নানা মত থাকলেও, সব বিতর্ক হার মানে ‘পুরান ঢাকার’ বাকরখানির কাছে। দয়াগঞ্জ মোড়ের এক বাকরখানি কারিগর জানিয়েছেন, কোনো কোনো বাসিন্দা এখনো দূর থেকেও এখানে বাকরখানি কিনতে আসেন। কেউ পরিবারের জন্য কয়েক কেজি নিয়ে যান। ক্রেতাদের অনেকেই বলেন, বাকরখানি অন্য এলাকায় পাওয়া গেলেও পুরান ঢাকার মতো স্বাদ লাগে না। রামপুরার ওয়াপদা রোডের মুখের এক বাকরখানি বিক্রেতা বললেন, এখন বাকরখানির নানা ধরন বেরিয়েছে। কোনোটা মিষ্টি, কোনোটা নারকেলি স্বাদের। তবে সব স্বাদের মূলে আসলে পুরান ঢাকা। আর এসব কারণেই হয়তো বাকরখানি শুধু খাদ্য নয়, একটি এলাকার স্মৃতির বাহক।
তবে বাকরখানির গল্প শুধু পুরান ঢাকার গলি থেকে শুরু হয়নি। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে মুঘল আমলের ইতিহাসে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, বাকরখানি নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আগা বাকর খান ও খন্দকার খান নামে দুই ঐতিহাসিক চরিত্রের কাহিনি। তবে বাকরখানির উৎপত্তি নিয়ে স্থানীয় ইতিহাস ও লোককথায় রয়েছে নানা মত। কেউ বলেছেন, এর সূত্র মধ্য এশিয়া ও পারস্য অঞ্চল; কেউ মনে করেছেন, মুঘল আমলের বণিক ও অভিজাতদের হাত ধরে বাকরখানির স্বাদ ঢাকায় এসেছে। পরে সেই খাবারই পুরান ঢাকার নিজস্ব রন্ধন ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। এদিকে, বাকরখানি নামটির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার পুরনো এক প্রেম, ক্ষমতা আর ট্র্যাজেডির গল্প। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, মুঘল আমলে ঢাকার নায়েব নাজিম আগা বাকেরের সঙ্গে আরাকানের এক মগ রাজার কন্যা খনি বিবির প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই প্রেমের করুণ পরিণতির সঙ্গে আগা বাকের ও খনি বিবির নামের অংশ থেকেই তৈরি হয়েছে ‘বাকরখানি’ নামটি। বাকের নাম থেকে ‘বাকর’ এবং ‘খনি’ থেকে খানি। দুইয়ে মিলে বাকরখানি। কাহিনিটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে মতভেদ থাকলেও ঢাকার লোকমুখে এটি বাকরখানির নামকরণের সবচেয়ে পরিচিত গল্পগুলোর একটি।
পুরান ঢাকা প্রতিদিনই বদলাচ্ছে। পুরনো বাড়ির জায়গায় উঠছে নতুন ভবন, বদলে যাচ্ছে রাস্তাঘাট-অলিগলি। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভেতরেও কিছু জিনিস থেকে যায়, তেমনই একটি— বাকরখানির স্বাদ। ছোট্ট এ খাবারটি কেন্দ্র করে পুরান ঢাকাসহ সমগ্র রাজধানীতে পরিচালিত হয় একটি বড় অর্থনৈতিক জগৎ। চুল্লির ভেতরে আগুনে তেতে যে বাকরখানি তৈরি হয়, তার সঙ্গে তাই মিশে থাকে বহু কারিগরের শ্রমের ঘাম, সংসারের দায় আর বেঁচে থাকার গল্প। এ মানুষগুলোর কাছে বাকরখানি কোনো জাদুঘরে তুলে রাখার ঐতিহ্য নয় বরং সন্তানের পড়াশোনার খরচ, ঘরের বাজার। তাই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু বাকরখানির গল্প বললেই হবে না; গল্প বলতে হবে সেই মানুষগুলোরও, যারা প্রতিদিন নিজেদের শ্রম দিয়ে এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখছেন।
বাকরখানি শুধু একটি খাবার নয়— এটি পুরান ঢাকার স্মৃতির স্বাদ, জীবিকার গল্প আর প্রজন্ম পেরিয়ে আসা এক নীরব ঐতিহ্য। একসময় শুধু সকালের নাশতায় চায়ের সঙ্গে বাকরখানির প্রচলন থাকলেও কালে কালে এ খাবারটি জায়গা করে নিয়েছে স্কুলপড়ুয়াদের টিফিন বক্সে, বিয়ের অনুষ্ঠান এমনকি ঈদ কিংবা বিশেষ দিনের খাবারের তালিকায়। তবে ইদানীং বাকরখানির সামনে এসেছে এক নতুন বাস্তবতা। আধুনিক বেকারি, ফাস্টফুড, নানা প্যাকেটজাত খাদ্য মানুষের খাবারের তালিকা বদলে দিয়েছে। এসবের চক্করে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন ভুলতে বসেছে বাকরখানির নাম। বাকরখানির টিকে থাকার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে— দক্ষ কারিগর। যে কাজ শিখতে বছরের পর বছর লাগে, সেই কাজের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কম। আবার চুল্লির তাপ, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করা এবং কঠিন শ্রমের কারণেও অনেক তরুণ এ পেশায় আসতে চান না। ফলে বাকরখানির দোকান থাকলেও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরনো কারিগরি জ্ঞানকে টিকিয়ে রাখাই এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহর বদলাবে। মানুষ বদলাবে। খাদ্যতালিকাও বদলাবে। কিন্তু পুরান ঢাকার কোনো এক সরু গলিতে যদি ভোরের আগে চুল্লি জ্বলে ওঠে আর সেই আগুনে যদি তৈরি হয় মুচমুচে বাকরখানি— তাহলে বুঝতে হবে, পুরান ঢাকার একটি সকাল এখনো বেঁচে আছে। যেখানে বাকরখানি শুধু ‘হেরিটেজ ফুড’ নয়, গোটা এটি জীবন।




