অপরাধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাইকেল চালিয়ে বন্ধুর বাসার উদ্দেশে চলেছে আদনান রেজা। রাস্তার শেষ মোড়টা ঘুরতেই দেখতে পেল ও মিসেস মিলফোর্ডকে, তছনছ হয়ে যাওয়া গোলাপঝাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন টিস্যু পেপার দিয়ে।
এই ব্লকের শুরুতেই দয়ালু ভদ্রমহিলার বাসা। জীবনে একটা মাছিকেও আঘাত করেছেন কি না সন্দেহ। যখনই আদনান আর ওর বন্ধুরা ভদ্র মহিলার আঙিনার ঘাসগুলো ছেঁটে দিয়েছে, বকশিশ দিতে কার্পণ্য করেননি কখনো।
‘সব ঠিক আছে তো, মিসেস মিলফোর্ড?’ সাইকেল থামিয়ে জানতে চাইল আদনান। সাইডওয়াকে সাইকেল তুলতে তুলতে খেয়াল করল ও, পোর্চের সামনের গোলাপঝোপগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছে একেবারে শিকড়সুদ্ধ। গায়ের জোরে গাছগুলো তোলার কারণে করুণ দশা হয়েছে ফুলের বেডটার, ঝুরঝুরে মাটি ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র।
ফোঁত করে নাক টানলেন ভদ্রমহিলা। কান্নাভেজা হাসি হেসে বললেন,
‘আরে, আদনান যে! কেমন আছো তুমি?’ উপড়ানো ঝোপগুলো দেখিয়ে মাথা নাড়লেন। ‘বুঝতে পারছি
না, কার এত আক্রোশ আমার ওপর? কারও তো সাতে-পাঁচে থাকি না। এ গোলাপগুলোই ছিল আমার গর্ব
আর আনন্দের বস্তু। এত যত্ন, এত পরিশ্রম করে বড় করে তুলেছিলাম গাছগুলো...!’ কথা শেষ
করতে পারলেন না মিসেস মিলফোর্ড। আবার টিস্যু
চাপলেন চোখে।
ডান হাত মুঠো হয়ে গেছে আদনানের। ‘কিচ্ছু ভাববেন না, ম্যাডাম,’ বলল ও দৃঢ়কণ্ঠে। ‘অপরাধীকে পাকড়াও করার চেষ্টা করব আমরা!’
‘তার আর দরকার হবে না মনে হয়,’ জবাব দিলেন মহিলা। বাঙালি ছেলে আদনান আর ওর বন্ধুদের শখের গোয়েন্দাগিরির কথা জানা আছে তার। ‘ওই যে দেখো!’
পরিচিত একটা মুখকে গটগট করে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল বাড়ির কোনা ঘুরে।
‘টোরি পার্কার!’ চেঁচিয়ে উঠল আদনান। ‘তার মানে, তোমারই অপকর্ম এটা!’
একা নয় টোরি। খাটোমতন এক গাঁট্টাগোট্টা ছেলেকে ঘাড় ধরে টেনে আনছে হিড়হিড় করে। হাঁটুজোড়া মাটিমাখা ছেলেটার ময়লা হাত দুটোতে ছোট-বড় আঁচড়ের দাগ। খুব সম্ভব গোলাপকাঁটার কারণে হয়েছে ওগুলো।
ধুমসো টোরির এক হাতে একখানা গুলতি। অস্ত্রটা জিনসের প্যান্টের পেছনের পকেটে গুঁজে সামনের দিকে ঠেলে দিল ও বেঁটেখাটো ছেলেটাকে। হাত দুটো প্যান্টের পকেটে ভরে তৃপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘উহুঁ, বরং উল্টো! পালানোর সময় গুলতি ছুড়ে ধরাশায়ী করেছি এই ছোকরাকে।’
জ্বলন্ত দৃষ্টিতে টোরির দিকে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। ব্যথার কথা খেয়াল হতেই হাত চলে গেল মাথার পেছনে।
‘তোমরা যখন কেসের অভাবে হাপিত্যেশ করে মরছ,’ বলল টোরি উপহাসের স্বরে। ‘আমরা তখন শুরু করে দিয়েছি গোয়েন্দাগিরির ব্যবসা। বিজনেস কার্ড ছাপা আর দরকারি সবকিছুর জোগাড়যন্ত্রও সারা।’
‘গোয়েন্দাগিরি?’ ঠোঁট বাঁকাল আদনান। ‘ইয়ার্কি মারার আর জায়গা
পাও না?’
মধুর হাসল টোরি। ওয়ালেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিল ও আদনানকে।
ওতে লেখা:
পার্কার ডিটেকটিভ এজেন্সি
টোরি পার্কার, প্রেসিডেন্ট
ডেভিড রাপাপোর্ট, সহকারী
হেইফার গুন, সহকারী
‘গোলাপগুলোর অবস্থা দেখে সাহায্যের প্রস্তাব দেয় ও,’ বললেন মহিলা। ‘বিশ ডলার ফির বিনিময়ে কালপ্রিটকে ধরে দেবে বলে আশ্বাস দেয়।’ বখাটে ছেলেটার দিকে তাকালেন তিনি ভ্রু কুঁচকে। ‘লজ্জা হওয়া উচিত তোমার! অন্যের সম্পত্তি নষ্ট করলে এভাবে! দাঁড়াও না, বিচার দিচ্ছি তোমার বাপ-মার কাছে!’ অ্যাপ্রনের পকেট থেকে বিশ ডলারের একটা নোট বের করলেন মিসেস মিলফোর্ড।
চট করে টাকাটা নিয়েই মানিব্যাগে ভরে ফেলল টোরি।
‘আপনার আর কষ্ট করতে হবে না, ম্যাডাম,’ বলল সে বিনয়ে গদগদ কণ্ঠে। ‘এরই মধ্যে ফোন করে দিয়েছি ওর বাড়িতে। গাছগুলো ও আবার লাগিয়ে দেওয়ার পর নিজেই বাসায় দিয়ে আসব ওকে। আমিও হাত লাগাতাম, কিন্তু গোলাপে আসলে অ্যালার্জি আছে আমার।’ আদনানের দিকে তাকিয়ে পিত্তি জ্বালানো হাসি হাসল টোরি। ‘দেখলে তো? তোমরাই এ শহরের সেরা গোয়েন্দা নও। ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছ এতদিন। তবে এখন থেকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে আমাদের মধ্যে।’
মাথা ঝাঁকাল আদনান। ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, তা-ই সই।’
বন্ধুত্বপূর্ণ আহ্বানটা উপেক্ষা করল টোরি। ভদ্রমহিলার দিকে চেয়ে গলা খাঁকরে বলল, ‘কিছু মনে না করলে আপনার রেস্টরুমটা ব্যবহার করতে পারি, ম্যাডাম?’
উজ্জ্বল হাসলেন মিসেস মিলফোর্ড। ‘নিশ্চয়ই। এসো, দেখিয়ে দিচ্ছি।’ তাকালেন তিনি আদনানের দিকে। ‘আদনান, পাজিটার ওপর চোখ রাখবে তুমি?’ পা বাড়াতে গেলেন মহিলা পোর্চের সিঁড়ির দিকে।
‘দাঁড়ান, ম্যাডাম!’ বলে থামাল তাকে আদনান। ‘শয়তানটাকে বাড়িতে ঢোকানোর আগে জেনে রাখা উচিত আপনার, ও-ই হচ্ছে নাটের গুরু।’
‘মানে? কী বলছ এসব?’ আকাশ থেকে পড়লেন যেন মিসেস মিলফোর্ড।
‘জি, ম্যাম, সত্যি।’ হাসছে আদনান।
আদনান কীভাবে বুঝল, টোরি পার্কারই আসল কালপ্রিট?




