গল্পে ধাঁধা
আর্টভিলায় গণ্ডগোল

আঁকা : অনন্যা বিশ্বাস
অফিস বন্ধ করার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবেন, তখনই ঠিক তখুনি নিচে গাড়ির শব্দ শুনতে পেলেন জাভেদ ফয়সাল। ডেস্কের পেছনের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলেন কালো রঙের বড় একটা গাড়ি এসে থামল। দরজায় কলিংবেল বাজল ঠিক তার ত্রিশ সেকেন্ড পর। খুলতেই হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন এক ভদ্রলোক, বললেন, ‘আপনিই গোয়েন্দা জাভেদ?’
হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে চেয়ারটা দেখিয়ে দিলেন জাভেদ। ‘ধন্যবাদ’ বলে ধপ করে বসে পড়লেন ভদ্রলোক, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। প্রথমে তিনিই কথা বললেন, ‘স্যরি এভাবে না বলে চলে এলাম। গুগলে দেখলাম আপনার অফিস বন্ধ করেন ৮টায়। রাস্তায় যে যানজট! কোনোমতে দুই মিনিট আগে এলাম বলে আপনাকে ধরতে পারলাম।’
জাভেদ ভদ্রলোককে চিনেছেন আগেই। শহরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। অনেক অর্থকড়ি জমিয়ে অবসরে গেছেন সমীরণ সরকার। এখন বিভিন্ন শখ আর সমাজসেবা নিয়ে আছেন। তার বড় ছেলে সৌমিক সরকার। আসার পর থেকে সৌমিককে পর্যবেক্ষণ করছেন জাভেদ। পরিপাটি পোশাক, হাতে অনেক মূল্যবান আংটি। জুতো জোড়ার দাম হাজার পঞ্চাশ হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। শুধু এই গরমে ফুলহাতা শার্টটা দামি হলেও একটু বেমানান। জাভেদ ভাবলেন, হবে হয়তো সারা দিন এসির মধ্যে থাকে। বাবার মতো একই পেশায় গেলেও এখনো খুব নাম করতে পারেননি। বেশ কয়েক বছর আগে অবশ্য শহরের সবচেয়ে উঁচু কমার্শিয়াল টাওয়ার বানানোর ঘোষণা দিয়ে পত্রিকায় আসে সৌমিক সরকারের নাম। নির্মাণকাজ থমকে আছে বেশ কিছু মাস ধরে— কেন, তা অবশ্য জানেন না তিনি।
‘কী ব্যাপার বলুন, হঠাৎ এত তাড়াহুড়া? অবশ্য গোয়েন্দার কাছে বিশেষ প্রয়োজন হলেই আসে মানুষ।’
সৌমিক বললেন, ‘বাবা একটা গ্যালারি দিয়েছেন নতুন। বারিধারায় আমাদের বাড়ির খুব কাছেই। নাম আর্টভিলা। এ মাসে বাবা আয়োজন করেন অ্যান্টিকের প্রদর্শনী। বাবারই বেশ কিছু বন্ধু মানে আংকেলদের সংগ্রহে দেশি-বিদেশি অনেক মূল্যবান অ্যান্টিক আছে। প্রদর্শনীর বেশিরভাগ সংগ্রহ ওগুলোই। আজ সন্ধ্যায় সেখান থেকে চুরি গেছে দুটি মহামূল্যবান অ্যান্টিক— একটা বাদশাহ হুমায়ুনের আমলের স্বর্ণমুদ্রা আর অন্যটি হলো লক্ষ্ণৌর রানীর গলার হার। বাবা পুলিশ ডেকেছেন, সঙ্গে বললেন ব্যক্তিগতভাবে একজন গোয়েন্দাকে দিয়ে তদন্ত করাতে চান। গ্যালারির ইন্স্যুরেন্স করানো আছে; তাই ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত ঝামেলা নেই। কিন্তু বাবার আসল চিন্তা বন্ধুদের কাছে মুখ দেখাবেন কেমন করে! আপনি চলুন আমার সঙ্গে। এতক্ষণে পুলিশেরও এসে পড়ার কথা। সেখানে গিয়েই দেখবেন সব। আর পারিশ্রমিক নিয়ে ভাববেন না, কেস সলভ না হলেও আপনার সময় বৃথা যাবে না।’
‘কোনো সলভ করা ছাড়া আমি টাকা নিই না।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর জাভেদের।
নয়টা নাগাদ সৌমিকের গাড়িতেই আর্টভিলা পৌঁছাল তারা। ভেতরে ঢুকতেই এগিয়ে এলেন সম্ভ্রান্ত এক ভদ্রলোক— সমীরণ সরকার। স্বাভাবিকভাবেই একটু বিমর্ষ দেখাচ্ছে। হাত মেলানোর পর বললেন, ‘আসুন আপনারই অপেক্ষায় ছিলাম। পুলিশ এসে একটা রিপোর্ট লিখে নিয়ে গেছে। বলেছে আবারও কাল আসবে। আমি আমার স্টাফদের এখনো যেতে দিইনি। আপনার মতো প্রশ্ন করতে পারেন।’
পুলিশের রিপোর্ট পড়ে জানা গেল ঘটনা ঘটেছে পাঁচটা থেকে সাড়ে ছয়টার মধ্যে। গ্যালারি বন্ধ হয়ে যায় ৫টায়। দুই শিফটে পালা করে পাহারা দিচ্ছে দুজন দারোয়ান। বিকাল ৪টার দিকে প্রহরী বদল হয়, অর্থাৎ সকালের দারোয়ান শিফট শেষ করে বাসায় যায় আর সে জায়গায় আজ এসেছিল সুজন মিয়া। লম্বা-চওড়া, বয়স চল্লিশের মতো। তাকে পাওয়া গেছে দরজার পাশে ওর চেয়ারের ওপর হাত-পা বাঁধা আর মুখে শক্ত টেপ দেওয়া অবস্থায়। মুখমণ্ডল ঢাকা ছিল একটা কালো কাপড়ের ব্যাগ দিয়ে। অ্যান্টিক দুটিই ছিল প্রায় চার ফুট উঁচু কাঠের পাটাতনে গ্লাস দিয়ে ঢাকা অবস্থায়। গ্লাস ভেঙে চুরমার করা হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য টুকরো। পুলিশ টেপ দিয়ে ক্রাইম সিন চিহ্নিত করে গেছে। গ্লাসের একটা ভাঙা টুকরা সুজন মিয়ার শার্টের কলারেও পাওয়া গেছে। তার পকেটে খুচরা পয়সা ছাড়া তেমন কিছু অবশ্য পাওয়া যায়নি।
ওই সময় আরও ছিল কেয়ারটেকার রানা। বাগানের ছোট ঘরে তাকে পাওয়া গেছে অচেতন অবস্থায়। মাথার পেছনে আঘাত করা হয়েছিল তাকে। ওর পকেটে মিলেছে একটা রেঞ্চ আর কয়েকটা নাটবোল্ট, যেগুলো পুলিশ আলামত হিসেবে জব্দ করেছে। অবশ্য রানা বলছে, বাথরুমের কল থেকে টিপটিপ পানি পড়ছিল, সেটাই নাকি সারানোর কথা ছিল আজকে।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার, সিসি ক্যামেরাটা নষ্ট ছিল। সেটা সারানোর জন্য এসেছিল টেকনিশিয়ান কমল। তার ভাষ্যমতে, পৌনে ৬টায় সে এখানে এসে পৌঁছায়। বাইরের গেটে আসার পর কেয়ারটেকার রানাকে ফোন করেছে অনেকবার। তারপর নাম ধরে ডাকাডাকি করেও না পেয়ে শেষমেশ ফোন করেছে সমীরণ সরকারকে। তিনি এসে আবিষ্কার করলেন গ্যালারির এই হাল।
আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করে পুলিশ শুধু রানারটা পেয়েছে ওই পাটাতনে। এদিকে আরও একটা জানালাও ভাঙা পাওয়া গেছে। পুলিশ বাইরে তল্লাশি চালাতে গিয়ে আবিষ্কার করে পেছনের স্টোররুমের কাচের জানালাটা ভাঙা। কাচ ছড়িয়ে আছে ঘাসের ওপর।
‘কাউকে সন্দেহ হয়?’ প্রথমে জিজ্ঞাসা করলেন সমীরণ সরকারকে। তিনি বললেন, ‘প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আমি কাউকে দোষী মনে করি না। আমার কর্মচারীদের এমনকি টেকনিশিয়ান কমলকেও অনেক দিন হলো চিনি। এটা বাইরের কারও কাজ হবে, যে কারণে জানালার কাচ ভাঙা পাওয়া গেছে।’
একই প্রশ্নের জবাবে সৌমিক বললেন, ‘আমার তো মনে হয় এই কমলই আছে এ চুরির পেছনে। সিসিটিভি যে কাজ করছে না, সেটা তার জানা ছিল। তাই সারানোর নাম করে আগেভাগে এসে পেছনের পাঁচিল টপকে নিশ্চয়ই জানালা ভেঙে ঢুকেছে। তারপর দারোয়ান আর কেয়ারটেকারকে কাবু করে অ্যান্টিক দুটি সরিয়ে বাইরে বের হয়ে ফোন করার নাটক সাজায়।’
গ্যালারির কামরাটা খুব সূক্ষ্মভাবে পরখ করতে শুরু করলেন জাভেদ। আশি ফুট বাই চল্লিশ ফুটের বিশাল একটা ঘর। বাদশাহ হুমায়ুনের স্বর্ণমুদ্রা আর লক্ষ্ণৌর রানীর গলার হার দুটি রাখা ছিল পাশাপাশি। এ প্রদর্শনীর সবচেয়ে মূল্যবান দুই আকর্ষণ। সেটা জানা অবশ্য বিশেষ ব্যাপার নয়, কেননা এরই মধ্যে কয়েকজন ভ্লগার সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলাও করে বলেছে এ রত্ন দুটির কাহিনি। কাচের টুকরার মধ্যে সাবধানে পা ফেলে এগোলেন জাভেদ। কাঠের পাটাতনে এই অ্যান্টিক দুটি রাখা ছিল একটা লাল মখমলের কাপড়ের ওপর। সেটা গভীরভাবে পরখ করতে গিয়ে দেখলেন, সেখানে কাপড়টায় ছোট একটা ফুটো হয়ে কয়েকটা সুতো উঠে আছে।
এবার সুজন মিয়া যে চেয়ারে বাঁধা ছিলেন, সেটা খুঁটিয়ে দেখলেন জাভেদ। চেয়ারটা অ্যান্টিক দুটি থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ফুট দূরে দরজার পাশে। কাঠের চেয়ারের পেছন দিকে কালচে লাল একটা দাগ তার নজর এড়াল না। জাভেদের অনুরোধে এবার কেয়ারটেকার রানাকে ডেকে আনা হলো। রানাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি বাগানে কী করছিলে?’ সে বলল, ‘আমি গ্যালারি বন্ধ হওয়ার পর সবকিছু সাফসুতরা করি। বাগানের ঘরে মোছার কাপড়, ঝাড়ু— এসবই আনতে গিয়েছিলাম।’ জাভেদ তার সঙ্গে বাথরুমে গিয়ে দেখলেন যে, কলটা আসলেই নষ্ট। স্টোররুমের জানালাটাও একফাঁকে দেখে এলেন জাভেদ।
ফিরে এসে সৌমিককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সৌমিক সাহেব, নিজে চুরি করে দায়টা মিছেমিছি অন্য কারোর ওপর দিচ্ছেন কেন? বোধহয় আপনার বহুতল ভবন নির্মাণ শেষ করতে অনেক টাকা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তাই না? ফুলশার্ট পরেও কবজির কাছে কাটা দাগটা আমার কাছে লুকোতে পারেননি। কাচ ভাঙতে গিয়ে কেটে ফেলেছিলেন, সেই রক্তের দাগ আবার লেগেছে সুজন মিয়ার চেয়ারে। আপনার আংটির পাথরে একটা সূক্ষ্ম লাল সুতো আটকে আছে হয়তো ওটাও খেয়াল করেননি! সেটা অ্যান্টিক দুটির নিচে রাখা লাল মখমলের কাপড়েরই সুতো।’
জাভেদ আরও বললেন, ‘সমীরণ সাহেব, আপনার কর্মচারীদের এখনই যেতে দেবেন না। কেননা এদের একজন আছে এই চুরির সহযোগী! আমার হয়তো আরও সময় লাগত, ভেবেছিলাম বাইরের কেউ চুরিটা করে থাকবে। কিন্তু স্টোররুমের জানালা ভেঙে সবচেয়ে বড় বোকামিটা করেছেন সৌমিক!’
পাঠক বলুন তো, চুরির সহযোগী কে এবং কেন? আর স্টোররুমের জানালা দেখে কী বুঝলেন গোয়েন্দা জাভেদ?





