গল্পের ধাঁধা
আনন্দপুর ফুটবল ক্লাব

আনন্দপুর ফুটবল ক্লাব। একে একে সব বাঘা বাঘা ক্লাবকে হারিয়েছে। দেশের গ্রামভিত্তিক ক্লাব ফুটবলে তারা এখন নতুন চ্যাম্পিয়ন। খুশির খবর হলো, এবার তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলবে। ভেন্যু নেপাল। এশিয়ার কয়েকটি দেশের গ্রামভিত্তিক চ্যাম্পিয়ন ক্লাবগুলো সেখানে অংশ নেবে। পুরো আনন্দপুর গ্রাম এই ক্লাবকে নিয়ে গর্বিত; কিন্তু সমস্যায় পড়েছেন ক্লাবের কোচ মমতাজ আলী। ফাবিহা ও রিয়ানার মধ্যে একজনকে দলের সঙ্গে নিতে পারবেন। ওরা দুজনেই ভালো গোলকিপার। ক্লাব প্রতিযোগিতায় দুজনেই ভালো পারফরম্যান্স করেছে; কিন্তু কাকে বাদ দিয়ে কাকে নেবেন এই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না কোচ। মমতাজ আলীর ইচ্ছা ছিল দুজনকেই দলের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া। একজন গোলকিপার থাকলে ঝুঁকি অনেক। তবে খরচ বাঁচাতে ক্রীড়া সংস্থার স্পষ্ট নির্দেশনা, একজন গোলকিপার নিতে হবে। এখন কী করবেন?
কোনো উপায় না দেখে দুজনকে ডাকলেন।
মমতাজ আলী বললেন, ‘দুজনকে নিতে চেয়েছিলাম; কিন্তু ক্রীড়া সংস্থা বলেছে, একজনকে নিতে হবে। এখন আমি পড়ে গেছি মুশকিলে। কাকে নিয়ে যাব সেটাই তো বুঝতেছি না।’
ফাবিহা বলল, ‘দলের জন্য যে ভালো করবে তাকে নিন।’
‘আমাকে নিতে পারেন। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব,’ বলল রিয়ানা।
উত্তরে কোচ বললেন, ‘আমি আরেকবার কথা বলব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। তোমরা দুজনেই প্রস্তুতি নাও। দেখা যাক কী করা যায়।’
এ কথা বলে মমতাজ আলী চলে গেলেন মাঠে। সেখানে সবাই প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। অনেক রোদ আজ। সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাই একদিনের জন্যও প্রাকটিস বন্ধ করা যাবে না। আর এটিই কোচ মমতাজ আলীর নির্দেশ।
একটু পর মমতাজ আলীর ফোনটা বেজে ওঠে। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একজন বললেন, ‘আপনি কি আনন্দপুর ফুটবল ক্লাবের কোচ?’
‘হ্যাঁ’ সংক্ষেপে জবাব দিলেন তিনি।
‘আপনার সঙ্গে ক্রীড়া সংস্থার চেয়ারম্যান লোকমান স্যার কথা বলবেন,’ এই বলে লোকটা আরেকজনকে ধরিয়ে দিলেন।
লোকমান সাহেব বললেন, ‘মমতাজ সাহেব কাল দুপুরের মধ্যে খেলোয়াড়দের নামের তালিকা জমা দিতে হবে। সবার পাসপোর্টসহ অন্যান্য কাগজ যেন রেডি থাকে। সুবিধা হলো নেপালে আগে ভিসা করা লাগে না। ওখানে উড়োজাহাজ ল্যান্ড করার পর অনএরাইভাল ভিসা দিয়ে দেবে। তবে নামের তালিকাটা কালকে অবশ্যই দিতে হবে।’
মমতাজ আলী বললেন, ‘কিন্তু স্যার, আমি একটা সমস্যায় পড়েছি।’
‘কী সমস্যা বলুন প্লিজ, যেকোনো সমস্যায় আমরা হেল্প করব।’
‘আসলে হয়েছে কী, আমার দলে দুজন গোলকিপার; কিন্তু আপনারা বলেছেন একজনকে নিতে হবে। কাকে নেব বুঝতেছি না। ওরা দুজনেই তো ভালো খেলেছে’— বললেন মমতাজ।
পরদিন সকালে মাঠে সবাই হাজির। ফাবিহা ও রিয়ানা সবার আগেই এসেছে। ক্রীড়া সংস্থা থেকে দুজন এসেছেন। সবার সামনে তাদের স্কিল পরীক্ষা নেবেন। একটু পর একের পর এক চ্যালেঞ্জ শুরু
জবাবে লোকমান সাহেব বললেন, ‘আপনি একদম ভাববেন না। কালই আমাদের লোক যাবে আপনার ওখানে। তারপর দুজনের পরীক্ষা নেবে। সেখানে যে ভালো করবে সেই যাবে দলের সঙ্গে।’
কথা শেষে মমতাজ আলী দৌড়ে ফাবিহা ও রিয়ানার কাছে এলেন। ওদের বললেন, ‘শোনো, কাল ক্রীড়া সংস্থা থেকে লোক আসবে। তোমাদের পরীক্ষা নেবে। সেখানে যে ভালো করতে পারবে সেই দলের সঙ্গে নেপালে যেতে পারবে।’
পরীক্ষার কথায় ফাবিহা বেশ খুশি; কিন্তু রিয়ানা মোটেও খুশি না। কারণ ফাবিহা তার চেয়ে ভালো গোলকিপার। তাই মুখটা গোমড়া করে বাড়িতে গেল।
পরদিন সকালে মাঠে সবাই হাজির। ফাবিহা ও রিয়ানা সবার আগেই এসেছে। ক্রীড়া সংস্থা থেকে দুজন এসেছেন। সবার সামনে তাদের স্কিল পরীক্ষা নেবেন। একটু পর একের পর এক চ্যালেঞ্জ শুরু। সবগুলো চ্যালেঞ্জ বেশ ভালোভাবেই মোকাবিলা করল ফাবিহা। রিয়ানাও খারাপ করল না, তবে ফাবিহার মতো অতটা ভালোও করল না। স্বাভাবিকভাবেই ফাবিহাকে নির্বাচন করা হলো। তারপর খেলোয়াড় তালিকায় ফাবিহার নাম যোগ করে জমা দিলেন কোচ মমতাজ আলী।
কয়েকদিন টানা প্রাকটিস চলল। রিয়ানাকে আর মাঠের আশপাশে দেখা যায়নি। ওর জন্য সাবিহার খারাপ লাগছে। তবে ওর কিছু করার নেই। এখানে যা করার ক্রীড়া সংস্থা করেছে। ওরা সবাই গোল হয়ে বসে আছে। তখন মমতাজ আলী এসে বললেন, সবাই বাসায় গিয়ে ভালোভাবে ব্যাগ গুছিয়ে নেবে। আর অবশ্যই পাসপোর্ট নিতে ভুল করবে না। পরশু আমাদের ফ্লাইট।’
সেদিন বাসায় ফিরেই ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে ফাবিহা। পরশু ফ্লাইট। তারপর সোজা কাঠমান্ডু। ফাবিহার সঙ্গে সাবিহাও যাচ্ছে। তবে সাবিহা যাবে নিজের খরচে। ও মূলত দর্শক। বোনের খেলা দেখাও হলো, আবার নেপালটাও ঘুরে দেখা হলো। দুই বোনের পাসপোর্টসহ যাবতীয় কাগজপত্র ঠিকঠাক ব্যাগে নিয়েছে ফাবিহা।
পরদিন বিকালে দেখা করতে এলো রিয়ানা। ওকে দেখে খুব খুশি ফাবিহা। সাবিহা তখন বাসায় ছিল না।
ফাবিহা বলল, ‘আরে তুই, কয়েকদিন তোর তো দেখাই পাচ্ছি না।’
রিয়ানা বলল, ‘মামার বাড়িতে ঘুরতে গিয়েছিলাম। তাই আর এদিকে আসা হয়নি।’
ফাবিহা বলল, ‘ হঠাৎ এই বিকাল বেলা, কী মনে করে এলি?’
‘নারে তেমন কিছু না। তুই তো কালই চলে যাবি। তাই একটু দেখা করতে এলাম।’
‘এসে ভালোই করেছিস। তোর কথা খুব মনে পড়ছিল। তুই একটু বস, আমি কিছু খাবার আনি, খেয়ে যাবি’ বলে ফাবিহা বাইরে গেল।
এই সুযোগে ফাবিহার ব্যাগটা খুলে ঘাঁটাঘাঁটি করল রিয়ানা। তারপর আবার ঠিকঠাক করে রাখল। ফাবিহা খাবার আনলে খেয়ে চলে গেল রিয়ানা।
বিমানবন্দরে ঢুকে ফাবিহা ও সাবিহা অবাক! সেখানে রিয়ানাও আছে। সে নাকি নিজের খরচে নেপালে ঘুরতে যাচ্ছে। একই উড়োজাহাজে ওর সিট। সাবিহার ব্যাপারটা ভালো লাগল না। ও ভাবল নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো একটা রহস্য আছে।
হলোও তাই। ফাবিহা বিমানবন্দরে ঢুকতে পারলেও সাবিহা পারল না। আর ও ব্যাপারটা বুঝতেও পেরেছে।
তবে সবচেয়ে অবাক হলো, রিয়ানা নিজে। কারণ ও জানত, ফাবিহা নেপাল যেতে পারবে না। সেই সুযোগে ওই খেলবে।
প্রিয় পাঠক, রিয়ানা কীভাবে জানত, ফাবিহা নেপাল যেতে পারবে না? আর কেনই বা সাবিহা যেতে পারল না। রিয়ানা কেন এত অবাক হলো?




