ড্রাই কিলার

আঁকা : অনন্যা প্রমা
দারুণ জমে উঠেছে খেলাটা।
একদিকে বিজ্ঞানী নাবিল আহমেদ স্যার, অন্যদিকে আমি আর পরি। পরি হলো স্যারের ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট। পিচ্চি হলেও ‘কাজের রোবট’।
দাবা খেলা আর চমৎকার হ্যাজেলনাট কফি। সব মিলিয়ে দারুণ একটা সন্ধ্যা কাটাচ্ছি স্যারের বাসায়।
— স্যার, আপনি কিন্তু হেরে যাবেন। আমি আর পরি মিলে আপনাকে ঠিকই হারিয়ে দেব। বললাম।
— চেক। তোমরা হেরে গেলে তৌফিক। হাসতে হাসতে চূড়ান্ত চাল দিলেন নাবিল স্যার।
হতভম্ব হয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাব, তার আগেই পরি যান্ত্রিক গলায় বলল— স্যার, মিরপুর সেকশনের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার মির্জা কাশেম আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
পুলিশ! চমকে গেলাম।
উঠে গিয়ে তাকে ভেতরে নিয়ে এলাম।
— কেমন আছো কাশেম? কেমন চলছে তোমার পুলিশগিরি? জানতে চাইলেন বিজ্ঞানী।
— স্যার, আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
মাথা ঝাঁকালেন নাবিল স্যার।
— চলে যাচ্ছে মোটামুটি। পরিচয় করিয়ে দিই, এ হচ্ছে তৌফিক। আমার অ্যাসিস্ট্যান্টও বলতে পারো। পরি, পিচ্চিকে দিয়ে মেহমানের জন্য নাশতা আর কফি পাঠাও।
— কফি লাগবে না, স্যার। আমি আপনার কাছে একটা সমস্যা নিয়ে এসেছি। ব্যাপারটা জরুরি।
— জরুরি? এনিথিং রং?
— স্যার, বিখ্যাত বিজ্ঞানী সাব্বির হাসান মারা গেছেন।
— কী! প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন নাবিল স্যার।
— জি স্যার।
— ওর বয়স কত যেন হয়েছিল? কীভাবে মারা গেছে সাব্বির?
— স্যার, সাব্বির স্যারের বয়স হয়েছিল ছাপ্পান্ন। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ ছিল না। নিজের ল্যাবে উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন। ডাক্তার বলেছেন, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বিজ্ঞানী।
নাবিল স্যার উঠে পায়চারি করতে শুরু করলেন।
তারপর হঠাৎ থেমে জানতে চাইলেন, আমার কাছে কেন এসেছ মির্জা? কে তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে?
ইতস্তত করলেন পুলিশ কমিশনার।
— স্যার, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে মৃত্যুটা স্বাভাবিক না। কিন্তু আমি বা আমরা ব্যাপারটা ধরতে পারছি না।
— আমাকে কী করতে বলো?
— স্যার, আমার সঙ্গে যদি ডেথস্পটে যেতেন, খুব ভালো হতো। আমি জানি, আপনার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা গোয়েন্দাদের চেয়ে কম নয়।
— সাব্বির আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। বেশ কয়েকবার আমাদের মধ্যে দেখা হয়েছে। অনেক মেধাবী আর অনন্য চিন্তা-চেতনার অধিকারী সাব্বির।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বিজ্ঞানী নাবিল আহমেদ।
— চলো, যাওয়া যাক।
দুই.
— ঘটনা সম্পর্কে আমাকে একটু খুলে বলো। নাবিল স্যার বললেন।
গাড়ি ছুটে চলেছে ঘটনাস্থলের দিকে।
— স্যার, আপনি জানেন, সাব্বির হাসান একজন রসায়নবিদ। মিরপুর-১০-এ তার নিজস্ব বাসা রয়েছে। সেখানে স্ত্রী সোহেলী রহমান আর মেয়ে নম্রতাকে নিয়ে থাকেন। বাসার দ্বিতীয় আর তৃতীয় তলা মিলে তারা বসবাস করেন। চারতলায় নিজস্ব ল্যাবরেটরি রয়েছে তার। দিন-রাত বলতে গেলে সেখানে পড়ে থাকেন। ল্যাবে সহযোগিতা করার জন্য রেজাউল নামের একজন সহকারী আছে। সে প্রতিদিন সকালে আসে, বিকালে চলে যায়। গতকাল বিকালে বিজ্ঞানী সাব্বির আর রেজাউল একসঙ্গে নিচে নেমে আসে। রেজাউল নিজের বাসায় চলে যায় আর সাব্বির স্যার পরিবারের সঙ্গে বসে নাশতা খান। এরপর আবার ল্যাবে চলে যান। মিসেস সাব্বির আর নম্রতা এরপর বসুন্ধরা শপিংমলে মুভি দেখতে চলে যান। তারা ফিরে আসেন রাত ১০টার পর। বাসার সামনে থাকা গেটম্যান তাদের আসা-যাওয়ার সময় কনফার্ম করেছে।
— বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা নেই?
— ছিল। বেশ কিছুদিন থেকে নষ্ট হয়ে আছে। রাতে ফিরে মিসেস সাব্বির দেখলেন, বিজ্ঞানী তখনো নিচে আসেনি। তাদের কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক। অনেক সময়ই তিনি বেশি রাতে নিচে খেতে নামেন। নিজেরা খেয়ে সাব্বির স্যারের জন্য খাবার ঢেকে রেখে ঘুমাতে চলে যান।
সকালে ডাইনিং টেবিলে ঢেকে রাখা খাবার সেভাবেই আছে দেখে ওপরে ল্যাবে স্বামীর খোঁজ নিতে যান সোহেলী। গিয়ে দেখেন, ল্যাবের মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন সাব্বির হাসান।
কথা শেষ হতে না হতে আমরা পৌঁছে গেলাম নম্রতা মঞ্জিলে। মেয়ের নামেই বাসার নাম। বসার ঘরে আমরা সবাইকে পেয়ে গেলাম। মিসেস সোহেলী, নম্রতা, রেজাউল, গেটম্যানসহ অনেক আত্মীয়স্বজন এসে হাজির হয়েছে।
— লাশ কোথায়? জানতে চাইলেন নাবিল স্যার।
— মর্গে রাখা আছে। সাব্বির হাসানের এক ভাই কানাডায়, আরেক ভাই লন্ডনে থাকে। ওরা আসার পর দাফন হবে।
ডিসি মির্জা বললেন।
চারতলায় উঠে এলাম আমরা। ডিজিটাল লক। মিসেস সাব্বিরের কাছ থেকে আনা কার্ড দিয়ে দরজা খুললেন ডিসি।
ভেতরটা বেশ ঠান্ডা।
— এত ঠান্ডা কেন? জানতে চাইলেন নাবিল স্যার।
— এসি চালু ছিল সারা রাত। ঘরের জানালা সব লক করা। এখানেই উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন বিজ্ঞানী সাব্বির হাসান।
তার পড়ে থাকার জায়গাটি চক দিয়ে দাগ দেওয়া।
পকেট থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করলেন নাবিল স্যার। ঘরে অনেক কাচের আলমিরা। সেগুলোতে কেমিক্যাল রাখা।
নাবিল স্যার অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। একটা আলমিরাতে জমে থাকা কুয়াশা হাতে নিয়ে ঘষলেন।
কিছুদূর যেতেই হঠাৎ নিচু হলেন নাবিল স্যার। কিছু একটা কুড়ালেন।
আমরা দেখলাম, তার হাতে বড় একটা ফ্লাক্স।
নাকের কাছে ধরলেন তিনি। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ভালো করে দেখলেন।
ঘরের এক কোনায় ছোট একটা ঘরে রয়েছে বসার ব্যবস্থা। সেখানে আছে একটা ডেস্ক আর চেয়ার। ওপরে বেশ কিছু কাগজপত্র রয়েছে। বোঝা গেল, বিজ্ঞানী সাব্বির হাসান এখানে বসে লেখালেখির কাজ করেন।
নাবিল স্যার কাগজগুলোর ওপর ঝুঁকে পড়লেন।
— তৌফিক, ড্রয়ারগুলো খুলে দেখ।
তার কথামতো ড্রয়ার খুলতেই কয়েকটা ফাইল পেলাম।
বিজ্ঞানী নাবিল স্যার অনেকক্ষণ সময় নিয়ে ফাইলগুলো দেখলেন।
— চলো মির্জা, সাব্বিরের আশপাশে যারা ছিল, তাদের সঙ্গে কথা বলি।
নিচে নামতে শুরু করলাম আমরা।
— মির্জা, ভাগ্যিস আমাকে এনেছিলে।
— বুঝলাম না, স্যার।
— বুঝিয়ে দিচ্ছি। আগে মিসেস সাব্বিরকে ডাকো।
আরেকটা ঘরে বসলাম আমরা।
একটু পরেই সোহেলী এলেন। চোখ-মুখ ফোলা। বোঝা যাচ্ছে, অনেক কান্নাকাটি করেছেন।
— মিসেস সাব্বির, আমি শুধু জানতে চাইব, সাব্বিরের যখন চা বা কফি খাওয়ার ইচ্ছা করত, তখন কি তিনি নিচে নেমে আসতেন? নাকি ফ্লাক্সে করে চা-কফি ওপরে নিয়ে যেতেন?
— না। চা-কফি খাওয়ার ইচ্ছা হলে নিজেই নেমে আসতেন। কেমিক্যাল ভরা ল্যাবে কিছু খাওয়ার পক্ষে ছিলেন না উনি। খেতেনও না।
— এই যে গবেষণা করতেন, বিশেষ কোনো সাফল্যের কথা কি আপনাকে সাম্প্রতিককালে বলেছেন?
একটু ভাবলেন সোহেলী।
— হ্যাঁ। বলেছিল, বড় একটা গবেষণার পেটেন্টের জন্য আবেদন করবে শিগগিরই। প্রায় শেষের দিকে ছিল ওর গবেষণা।
— রেজাউল সাহেব কতদিন ধরে আছেন আপনাদের এখানে?
— প্রায় দুবছর হবে।
— কী কী কাজ করেন রেজাউল সাহেব?
— বাসার টুকটাক সব কাজই তিনি করেন। বাজার করা থেকে শুরু করে ল্যাবে সহায়তা করা— সবকিছুই তাকে দিয়ে করানো হয়।
— ঠিক আছে মিসেস সাব্বির। আপনি এবার আসুন।
বিজ্ঞানী সাব্বিরের মেয়ে নম্রতাকে আনা গেল না। বাবা হারানোর শোকে কাতর সে।
একটু পরে রেজাউলের ডাক পড়ল।
— রেজাউল সাহেব, আপনি এ বাড়িতে কতদিন হলো আছেন? আপনার বাসায় কে কে আছে?
— স্যার, আমি এ বাড়িতে আছি প্রায় দুবছর। আমার ফ্যামিলিতে আছে আমার স্ত্রী আর দুই শিশুসন্তান।
— কোথায় থাকেন আপনি?
— মিরপুর ৬-এ।
— বাসার ঠিকানাটা বলবেন?
রেজাউল বললেন। নাবিল স্যার দ্রুত কাগজে কিছু লিখলেন। তারপর কাগজটা বাড়িয়ে দিলেন ডিসি মির্জার দিকে।
মির্জা সাহেব দ্রুত বের হয়ে গেলেন ঘর থেকে।
— রেজাউল সাহেব, আপনি কত টাকা বেতন পান?
— ২০ হাজার স্যার।
— এ টাকায় কি আপনার চলে? বিশেষত ঢাকা শহরে।
শুনে মাথা নিচু করলেন রেজাউল।
— বাসার খরচ থেকেও টুকটাক খরচ আসে।
— তাহলে এ বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা খারাপ হয়ে আছে বেশ কয়েক দিন হলো। সেটি ঠিক করালে বেশ কয়েকটা টাকা আপনার হাতে আসত। অথচ আপনি ক্যামেরা ঠিক করাননি, নাকি ঠিক করাতে চাননি?
চমকে গেলেন রেজাউল। তোতলাতে শুরু করলেন, আ... আমি কে... ন তা করব?
— যেন আপনি সাব্বিরের গবেষণাপত্রটি নিয়ে গেলে কোনো প্রমাণ না থাকে।
চুপ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন রেজাউল। ডিসি মির্জা ঘরে ঢুকলেন, পাওয়া গেছে।
মাথা ঝাঁকালেন নাবিল স্যার।
— শুনতে পেলেন রেজাউল সাহেব। আপনার বাসা থেকে গবেষণাপত্রটি উদ্ধার করা হয়েছে। এখন বলুন, কত টাকার লোভে সাব্বিরকে হত্যা করেছেন? আর কীভাবেই বা হত্যা করেছেন?
পাঠক, বিজ্ঞানী নাবিল আহমেদ কীভাবে বুঝতে পারলেন যে রেজাউলই হত্যাকারী?



