নার্স মানে শুধু ডাক্তারের সহকারী না

ছবি : সাজ্জাদ হোসেন
ক্যারিয়ার বলতে আপনার মনে কোন পেশাগুলোর ছবি ভেসে ওঠে? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট কিংবা কোনো বহুজাতিক কোম্পানির বড় কর্তা। কিন্তু এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে নার্সিংও। লিখেছেন স্বর্ণা রায়
একটা সময় ছিল, যখন নার্সিং পেশাকে শুধু ডাক্তারের সহকারীর পদ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সেই ধারণা অতীত। নার্সিং এখন একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত পেশা। বেডসাইড কেয়ার বা রোগীর সেবা এর মূল ভিত্তি হলেও শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে গবেষণা, জনস্বাস্থ্য, অ্যাকাডেমিকস ও ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নার্সদের ভূমিকা অপরিহার্য এবং এই খাতে দক্ষ পেশাজীবীর চাহিদা ক্রমবর্ধমান। তাই এই পেশায় যেমন রয়েছে চাকরির নিরাপত্তা, তেমনি পেশাগত উন্নতির সুযোগ।
পাঠসূচি ও পাঠশালা
দেশে নার্সিং শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল। এখানে বিশ্বমানের নার্স হয়ে ওঠার জন্য রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। মেধাবীদের কাছে সাধারণত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই প্রথম পছন্দ। যেমন— ঢাকা নার্সিং কলেজ, চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজ, রাজশাহী নার্সিং কলেজ, সিলেট নার্সিং কলেজ ও মিটফোর্ড নার্সিং কলেজ। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে এখানে পড়ার সুযোগ মেলে, যা শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই সেরা হতে করে তোলে প্রস্তুত।
পাশাপাশি বেশ কিছু মানসম্মত বেসরকারি নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউট গড়ে উঠেছে। যেমন— ক্রিয়েটিভ নার্সিং কলেজ (চট্টগ্রাম), সিলেট উইমেন্স নার্সিং কলেজ, রংপুর কমিউনিটি নার্সিং কলেজ, এসবিএফ নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রভৃতি। এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠগ্রহণের খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও পড়াশোনার মান ও পরিকাঠামো বেশ উন্নত।
শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুযায়ী দেশে তিন ধরনের কোর্স প্রচলিত। এর মধ্যে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি একটি তিন বছর মেয়াদি কোর্স, যা এই পেশাজগতে প্রবেশের ভিত্তি গড়ে দেয়। ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন নার্সিং (বিএসসি) হলো চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি, যা পেশাগত জ্ঞান আরও গভীর ও বিস্তৃত করে। অপরটি পোস্ট বেসিক বিএসসি ইন নার্সিং; ডিপ্লোমা সম্পন্নকারীদের জন্য দুই বছর মেয়াদি এই কোর্স স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ করে দেয়।
বাংলাদেশি নার্সদের জন্য বিদেশের দরজা সবসময় খোলা। বেতনও বেশ আকর্ষণীয়। এ পেশার রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
সম্ভাবনার সীমানা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে সাধারণ বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা নিত্যসঙ্গী, সেখানে নার্সিং এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। পড়াশোনা শেষ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চাকরির নিশ্চয়তা এই পেশার অন্যতম বড় আকর্ষণ। দেশে নার্সের ঘাটতি পূরণে সরকার বিশেষভাবে মনোযোগী। ফলে সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে চাকরির সুযোগ ব্যাপক। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে দক্ষ নার্সদের চাহিদা সবসময় তুঙ্গে। পেশা হিসেবে নার্সিং এখন শুধু হাসপাতালে সীমাবদ্ধ নয়; নার্সিং কলেজগুলোতে শিক্ষকতা, স্বাস্থ্য গবেষণায় অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক এনজিও এবং বিশেষায়িত ক্ষেত্র, যেমন— আইসিইউ, কার্ডিয়াক কেয়ার, সাইকিয়াট্রিক নার্সিং, পেডিয়াট্রিক (শিশু স্বাস্থ্য) ও অনকোলজি (ক্যানসার) নার্সিংয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশি নার্সদের জন্য বিদেশের দরজা সবসময় খোলা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাদের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা ও সম্মান। বিদেশে বেতনও বেশ আকর্ষণীয়। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবে একজন বাংলাদেশি নার্স মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন, যা পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে আরও বেশি। এ পেশার রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। নির্দিষ্ট দেশের লাইসেন্সিং পরীক্ষায় পাস করতে পারলেই খুলে যায় বিশ্বমানের ক্যারিয়ারের দরজা। যেমন— যুক্তরাষ্ট্রের এনসিএলইএক্স-আরএন (ন্যাশনাল কাউন্সিল লাইসেন্সার এক্সামিনেশন-রেজিস্টার্ড নার্স) হিসেবে কাজ করার সুযোগ মেলে।
উৎসাহের উদাহরণ
নার্সিং পেশার দারুণ সম্ভাবনার উদাহরণ সাবরিনা মমতা। হলি ক্রস কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ নিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি স্রোতে গা না ভাসিয়ে এমন একটি পথ বেছে নেন, যা ছিল তার বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির পরিচায়ক। চাকরির বাজারের বাস্তবতা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে শুরুতেই বুঝেছিলেন, নার্সিং শুধু সেবামূলক পেশা নয়; বরং একটি নিশ্চিত ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। তার এই সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক ছিল, সেই প্রমাণ মেলে সাফল্যের প্রতিটি ধাপে। ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক লাভ— সবই তার অধ্যবসায় ও মেধার ফসল। পড়াশোনা শেষে তাকে একমুহূর্তও অপেক্ষা করতে হয়নি; ইন্টার্নশিপ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে গেছেন সরকারি চাকরি।
সাবরিনা বলেন, ‘সাধারণ বিষয়ে পড়াশোনা করলে অনেক সময় চাকরির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, যা তরুণদের হতাশ করে। কিন্তু নার্সিংয়ে সেই অনিশ্চয়তা নেই।’ এই পেশা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোও ভেঙে দেন তিনি, ‘অনেকেই মনে করেন, নার্সরা কেবল ডাক্তারদের সহকারী; অথচ বাস্তবে এটি একটি স্বতন্ত্র ও পেশাদার জগৎ। নার্সিং মানে শুধু হাসপাতালে ডিউটি করা নয়; গবেষণা, শিক্ষকতা, এমনকি উদ্যোক্তা হওয়ার মতো বিশাল সুযোগও এখানে রয়েছে।’
অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশে নার্সের ঘাটতি প্রকট। যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী একজন নার্সের তিনজন রোগীর দায়িত্ব নেওয়ার কথা, সেখানে এ দেশে অনেক সময় ১২-১৩ জন রোগীকেও সামলাতে হয়। এই ঘাটতি পূরণে সরকার দক্ষ নার্স নিয়োগে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। আনন্দের বিষয় হলো, এখন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েও নার্সিংকে বেছে নিচ্ছেন; কারণ তারা এই পেশার চাকরির নিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন।
সাবরিনার পথচলা আমাদের দেখিয়ে দেয়, নার্সিং মানে শুধু ইনজেকশন পুশ করা বা রোগীর যত্ন নেওয়া নয়। এটি গবেষণা, নেতৃত্ব, শিক্ষকতা আর বিশেষায়িত জ্ঞানার্জনের এক বিস্তৃত জগৎ। এ এমন এক পেশা, যেখানে মেধা, সহানুভূতি ও বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে একজন মানুষ হয়ে ওঠে প্রকৃত হিলার বা আরোগ্যকারী। তাই যারা শুধু একটি চাকরি নয়; বরং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে সার্থক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়তে চায়, তাদের জন্য নার্সিং এক আদর্শ পথ।




