শেখার আগ্রহ পেশাগত উন্নতিতে সহায়তা করে
- ক্যারিয়ার, দক্ষতা উন্নয়ন, নেতৃত্ব, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভবিষ্যতের চাকরির বাজার এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের
- অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাপ করেছেন ইডটকো বাংলাদেশের হিউম্যান রিসোর্সেস ডিরেক্টর রিজওয়ান হামিদ কুরাইশি।

রিজওয়ান হামিদ কুরাইশ। ছবি: সামিয়া পারভীন
আপনার
কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা কেমন?
আমার
কাজের অভিজ্ঞতা প্রায় ৩২ বছরের। ক্যারিয়ারের
একটি দীর্ঘ সময় টেলিকম খাতে
কাজ করেছি এবং এর বেশিরভাগ
সময়ই রবিতে ছিলাম। এর আগে ব্যাংক
খাতেও কাজ করেছি। ফলে
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বিভিন্ন
ধরনের ব্যবসায়িক পরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে
কাজের সুযোগ হয়েছে। দেশের বাইরে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাতেও কাজ
করেছি।
দীর্ঘ
এই ক্যারিয়ারে আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
শিক্ষা কী?
দিনের
শেষে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো
মানুষ। সাফল্য বা ব্যর্থতা— দুই
ক্ষেত্রেই মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক মানুষ আলাদা, তাই সবাইকে একইভাবে
দেখা যায় না। একজন
কর্মীকে শুধু কর্মী হিসেবে
নয়, বরং মানুষ হিসেবেও
বুঝতে হবে। অন্যদিকে, কোনো
একটি
,
প্রতিষ্ঠানের
সফল
পদ্ধতি
অন্য
প্রতিষ্ঠানে
হুবহু
প্রয়োগ
করলে
একই
ফল
পাওয়া
যায়
না।
প্রতিটি
প্রতিষ্ঠানের
নিজস্ব
সংস্কৃতি
মানুষ
ও
বাস্তবতা
রয়েছে।
তাই
স্বাতন্ত্র্য
তৈরি
করা
দরকার।
ক্যারিয়ারে
টিকে থাকার জন্য কী কী
গুরুত্বপূর্ণ?
জীবনের
বিভিন্ন পর্যায়ে একজন মানুষের দায়িত্ব
ও অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়। কর্মজীবনেও একই
বিষয় প্রযোজ্য। করপোরেট জীবনে ভালো সময় যেমন
থাকবে, তেমনি চ্যালেঞ্জিং সময়ও আসবে। প্রতিষ্ঠান
পরিবর্তিত হবে, ব্যবসার পরিবেশ
বদলাবে, প্রযুক্তিতে আসবে পরিবর্তন। তাই
পরিবর্তন বুঝে তার সঙ্গে
মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।
এর পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে শেখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি মনে
করেন, তিনি যা শিখেছেন
সেটিই যথেষ্ট, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকা মুশকিল।
নতুন নতুন প্রযুক্তি, কাজের
পদ্ধতি ও নতুন দক্ষতা
সম্পর্কে সবসময় শেখার আগ্রহ রাখা জরুরি। আমি
কিছুদিন আগে শেখার আগ্রহ
থেকে আমার এক জুনিয়রকে
বলেছিলাম, ‘আপনি আমাকে এআই
শেখান, আমি আপনাকে ট্রিট
দেব!’
চাকরিপ্রার্থীর
সিভিতে নিয়োগদাতা কী খোঁজেন?
শুধু
অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা নয়; প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়
জীবনে কী করেছেন, ইন্টার্নশিপ,
প্রকল্প, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ বা নেতৃত্বের
অভিজ্ঞতা তার আছে কি
না— এসবও গুরুত্বপূর্ণ। এসব
অভিজ্ঞতা থেকে দায়িত্ববোধ, দলগতভাবে
কাজ করার সক্ষমতা ও
শেখার আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হলো আন্তরিকতা। সিভি যতই আকর্ষণীয়
হোক, সেখানে থাকা তথ্যের সঙ্গে
প্রার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতার মিল থাকতে হবে।
পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি। এর পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে শেখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
ইন্টারভিউর
আগে কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
প্রথমেই
নিজের সিভি ভালোভাবে পড়তে
হবে। সিভিতে কী, কেন লিখেছেন,
সেই কাজ করতে গিয়ে
কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং কী ধরনের
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন— এসব বিষয়ে পরিষ্কার
ধারণা থাকতে হবে। অভিজ্ঞতা থেকে
নিজের কাজ ও শেখার
বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি।
চাকরি
পাওয়ার ক্ষেত্রে তরুণদের সাধারণ ভুল কী কী?
অনেকেই
সব চাকরির জন্য একই সিভি
ব্যবহার করেন এবং যে
প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন, সেটি সম্পর্কে যথেষ্ট
ধারণা রাখেন না। প্রতিষ্ঠানটি কোন
কাজ করে, সংশ্লিষ্ট পদের
দায়িত্ব কী এবং নিজের
দক্ষতার সঙ্গে সেই পদের কতটা
মিল রয়েছে— এসব আগে বুঝতে
হবে। ইন্টারভিউ বোর্ড যেন বুঝতে পারে,
প্রার্থী প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন এবং
প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে জানেন।
ক্যারিয়ারে
উন্নতির বাস্তবসম্মত উপায় কী?
প্রথমে
নিজের বিভাগ ও কাজ বুঝতে
হবে। এরপর পুরো দায়িত্ব
এবং অন্যান্য বিভাগ কীভাবে কাজ করে, তা
জানা দরকার। ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলা, প্রশ্ন
করা, নতুন দায়িত্ব নেওয়া
ও ধারাবাহিক শেখা ক্যারিয়ার উন্নতিতে
সহায়তা করে।
চাকরির
প্রথম বছরে ফ্রেশারদের কী
করা উচিত?
প্রথম
বছরকে লার্নিং ইয়ার হিসেবে দেখা
জরুরি। প্রতিষ্ঠান, দায়িত্ব ও সহকর্মীদের বোঝার
পাশাপাশি প্রশ্ন করতে এবং ফিডব্যাক
নিতে হবে। প্রথম এক
থেকে তিন বছর নিজের
পছন্দ ও সক্ষমতা বোঝার
সময়কালও হতে পারে।
টিমে
কাজ করার ক্ষেত্রে কী
গুরুত্বপূর্ণ?
সবার
সঙ্গে একই ধরনের সম্পর্ক
হবে না। তবে পেশাগত
ও সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং
কখন সহযোগিতা নিতে বা দিতে
হবে, তা বুঝতে পারা
দরকার। কোন বিষয় নিজের
নিয়ন্ত্রণে আর কোনটি নয়,
তা বুঝতে হবে। গুজবের পরিবর্তে
তথ্য-প্রমাণের ওপর নির্ভর করা
এবং দীর্ঘ মেয়াদে নিজের কাজ, নীতি ও
এথিকসের ওপর দাঁড়ানোই সবচেয়ে
নিরাপদ পথ।
আপনার
প্রতিষ্ঠানে মাঠ পর্যায়ের আউটসোর্সড
কর্মীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়?
ইডটকো
বাংলাদেশে উঁচু টাওয়ার, বৈদ্যুতিক
যন্ত্রপাতি ও দূরবর্তী এলাকায়
কাজের ঝুঁকি বিবেচনায় ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও নির্ধারিত নিরাপত্তা
পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সরাসরি
কর্মী ও ভেন্ডর— সবার
জন্য একই নিরাপত্তা মানদণ্ড
প্রযোজ্য।
নতুন
কর্মীদের ইন্ডাস্ট্রির উপযোগী করতে কী ধরনের
প্রশিক্ষণ দেয় ইডটকো?
ইডটকোতে
ব্যবসা, সংস্কৃতি, নিরাপত্তা ও বিভিন্ন বিভাগের
কাজ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণার পাশাপাশি কাজের মাধ্যমে শেখা, ব্যক্তিগত উন্নয়ন পরিকল্পনা, জব রোটেশন ও
নতুন দায়িত্বের সুযোগ দেওয়া হয়। আমরা প্রশিক্ষণ
ও কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ
করি। কেউ যদি নিজের
দক্ষতা আরও বাড়াতে চান
কিংবা প্রযুক্তিগতভাবে নিজেকে আপডেট করতে চান, সে
ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা করা
হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ বা শেখার খরচও
কোম্পানি বহন করে। কারণ,
এটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ।
একজন
ভালো লিডারের দায়িত্ব কী?
মনে
রাখতে হবে, তিনিও একসময়
নতুন ছিলেন। নতুন কর্মীকে কাজের
পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি ও বিভিন্ন বিভাগের
সঙ্গে পরিচিত করা, প্রয়োজনীয় সময়
দেওয়া এবং মানবিকভাবে পাশে
থাকা একজন নেতার দায়িত্ব।
লিডার যখন কর্মীদের বোঝেন,
তাদের পাশে দাঁড়ান এবং
সম্মান করেন, তখন কর্মীরা স্বাভাবিক
দায়িত্বের বাইরেও অবদান রাখতে আগ্রহী হন। এই আস্থা
তৈরির মূল দায়িত্ব লিডারের।
২০২২
সালে আপনি ‘এইচআর প্রফেশনাল অব দ্য ইয়ার’
পেয়েছেন। এই স্বীকৃতিকে কীভাবে
দেখেন?
কভিডের
কঠিন সময়ে কর্মীদের প্রশিক্ষণ,
স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা ও সময়মতো বেতন
নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব
দিয়েছিলাম। এটি সম্ভবত তারই
স্বীকৃতি। মানুষের জন্য কোনো কিছু
করাকে আমি সবসময় বিনিয়োগ
হিসেবেই দেখি।
এইচআর
পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের প্রতি
পরামর্শ কী?
এইচআরে
কাজ করতে হলে প্রথমেই
মানুষকে বুঝতে হবে। এইচআর শুধু
নীতিমালা বা প্রশাসনিক কাজ
নয়; এটি মূলত মানুষকে
নিয়ে কাজ করার জায়গা।
পাশাপাশি ডেটা নিয়ে কাজ
করা, ডিজিটাল টুল ব্যবহার এবং
বৈশ্বিক শ্রমবাজারের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীদের সম্পৃক্ততা, কর্মদক্ষতা ও ধরে রাখার
মতো বিষয়েও ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন।
ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স কতটা
গুরুত্বপূর্ণ?
আমি
একে ওয়ার্ক-লাইফ হারমনি বলতে
পছন্দ করি। জীবনের অগ্রাধিকার
ব্যক্তিভেদে আলাদা। কর্মঘণ্টার হিসেবের চেয়ে কাজের কার্যকারিতা
এবং নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো
সঠিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া বেশি জরুরি।
ক্যারিয়ারে
সফল হতে কি দীর্ঘ
সময় কাজ করতেই হবে?
সবসময়
নয়। স্মার্টভাবে ও পরিকল্পিতভাবে কাজ
করলে কম সময়েও কার্যকর
ফল পাওয়া সম্ভব। তবে ক্যারিয়ারকে কতটা
অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেটি প্রত্যেকের
ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
আগামী
পাঁচ বছরে কোন ধরনের
চাকরির চাহিদা বাড়তে পারে?
প্রম্পট
ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ডেটা অ্যানালিটিকস, সাইবার
সিকিউরিটি, এআই ও ডিজিটাল
টুল ব্যবহারের দক্ষতার চাহিদা বাড়বে। পাশাপাশি যোগাযোগ, দলগত কাজ, নেতৃত্ব,
অভিযোজনক্ষমতা ও নৈতিকতার মতো
মানবিক দক্ষতাও গুরুত্ব পাবে।
ভবিষ্যতে
কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে, তা তরুণরা কীভাবে
বুঝবেন?
এ ক্ষেত্রে চাকরির বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করা সবচেয়ে কার্যকর
উপায়গুলোর একটি। কয়েকশ বিজ্ঞপ্তিতে কোন দক্ষতাগুলো বারবার
চাওয়া হচ্ছে, তা দেখলে ভবিষ্যতের
দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। নিজের ক্যারিয়ার
নিয়েও নিয়মিত গবেষণা করা প্রয়োজন।