দৃষ্টিহীনের রঙিন ভুবন

মেধার জোরে সুযোগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজির প্রতি আগ্রহে পড়ছেন এখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে
চোখে দেখেন না তারিফ। তারপরও দারুণ মেধাবী ছাত্র। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান করেন। তাকে নিয়ে লিখেছেন প্রজ্ঞা জয়া
নাম তার তারিফ মেহমুদ চৌধুরী। তার জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম চোখের সমস্যাকে ঘিরে। জন্মগতভাবে তার কর্নিয়ায় ‘কেরাটোকর্নাস’ নামে এক জটিল রোগ রয়েছে। ফলে কর্নিয়ার স্বাভাবিক গোলাকার গঠন বিকৃত হয়ে চতুষ্কোণ হয়ে গেছে।
এই রোগের চিকিৎসার জন্য তিনবার ভারতে গিয়েছেন। কিন্তু হায়দরাবাদ আই ইনস্টিটিউট সাফ জানিয়েছে, তারা আর কিছুই করতে পারবে না। এর পর থেকে চোখের সাহায্যে নয়, আত্মশক্তি, শ্রবণশক্তি ও অধ্যবসায়ের ওপর ভর করেই এগিয়ে চলছেন তারিফ।
চোখে প্রায় দেখতে না পারলেও ছোটবেলা থেকে তিনি দারুণ মেধাবী ছাত্র। তারিফের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল হাটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মাধ্যমিক শেষ করেছেন বিলগেটশা আলিমুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। পরে ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হয়েছেন। ঢাকায় এসে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সময় লেগেছে তার প্রায় ছয়-সাত মাস। কিন্তু চোখে তেমন না দেখা এই ছেলেটি বরাবরের মতো মনের জোর ও পরিবারের সহায়তায় জীবনের কঠিন পথগুলো মসৃণ করে তুলেছেন। ধীরে ধীরে এই কলেজেই ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ জন্মেছে। এই বিষয়ে তার আগ্রহ তৈরি করেছেন নটর ডেম কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আতায়ুল রূপক। তার উৎসাহে ইংরেজি উপন্যাস, গল্প ও কবিতার বই পড়তে শুরু করেন তারিফ। তিনি এইচএসসিতে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৯২ নিয়ে পাস করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটে ইংরেজিতে চান্স না পেলেও ‘ঘ’ ইউনিটে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকায় গুচ্ছ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। তিনি ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও হলে ওঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পাশে ছিলেন তার খালু নাসির উদ্দীন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার।
ক্লাসে পড়ার সময় তারিফ সহপাঠীদের সহায়তা নেন। অডিও ক্লাস, রেকর্ডেড লেকচার, ব্রেইল প্রিন্ট অথবা হাতে লেখা নোট— সবই তার শিক্ষার অংশ হয়ে উঠেছে।
শুধু অ্যাকাডেমিক পাঠেই সীমাবদ্ধ নন তিনি। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তারিফ গান গায়। মঞ্চে উঠে যখন তিনি গেয়ে ওঠেন, তখন সুরের মাধুর্যে কেউ ভাবতেও পারে না এই মানুষটির দৃষ্টিশক্তি প্রায় নেই বললেই চলে। গান তার আত্মার মধ্যে মিশে আছে। তারিফকে জীবনের দুঃসহ সময়েও সাহস দিয়ে চলেছে গান। তারিফের মতে, ‘পিছিয়ে পড়লে চলবে না, এগিয়ে যেতে হবে।’
তার বাড়ি রাজবাড়ীর বেলগাছি গ্রামে। তাদের চার সদস্যের পরিবারে বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মা তার ছেলেবেলার স্কুল হাটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ছোট ভাইটি পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। মা, বাবা ও মামা সবসময় পড়াশোনায় পাশে ছিলেন। তার খালা এ্যামিলি খাতুন শৈলকূপা সরকারি ডিগ্রি কলেজের একজন অধ্যাপক। তিনি শুধু একজন আত্মীয় নন; বরং এক অনন্য পৃষ্ঠপোষক, যিনি তারিফকে হাতে-কলমে শেখানো থেকে শুরু করে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের সহায়তায় তারিফ তার জীবনের নানা সমস্যার সমাধান করে সামনে এগিয়ে যেতে পারছেন।
চোখের সীমাবদ্ধতা তারিফের স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; বরং একে পাশ কাটিয়ে তিনি জীবন সাজান নতুনভাবে। তিনি চান বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে সমাজে কাজ করতে; মানুষের পাশে দাঁড়াতে। বলেছেন, ‘সবার কাছে দোয়া চাই, যেন মানুষের মতো মানুষ হতে পারি।’




