টিউশনির টাকায় রক্তকাঞ্চনের ৩ হাজার চারা

চারা গাছের যত্ন নিচ্ছেন মানিক রহমান। ছবি: লেখক
ফুলের নাম ‘রক্তকাঞ্চন’। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ফুলের তিনটি গাছ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মানিক রহমান। শাহ আজিজুর রহমান হলের ৪১০ নম্বর কক্ষের এই আবাসিক ছাত্রের মাথায় এরপর দারুণ ভাবনা খেলা করে। প্রিয় ক্যাম্পাসের ১৭৫ একর জমি ফুল-ফল আর সবুজে ভরে দেবার পরিকল্পনা করেন। চারা সংগ্রহে চষে বেড়িয়েছেন যশোর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের বিভিন্ন নার্সারিতে। চড়া দাম ও বৃক্ষের অপর্যাপ্ততায় হতাশ হয়ে আবার ক্যাম্পাসে ফিরেছেন। কিছুদিন পর ক্যাম্পাসের রক্তকাঞ্চন গাছ থেকে বীজ সংগ্রহের পরামর্শ দিলেন এক সিনিয়র। ফলে নিজেই চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা তৈরি পরিকল্পনা করেন মানিক।
মার্চ মাসের একদিন। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। তারপরও বেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আনাস হলের সামনের একটি রক্তকাঞ্চন গাছ থেকে পরিপক্ব বীজ সংগ্রহ করেন মানিক। বীজ কুড়াতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ঠাট্টার উপাধি পেয়েছেন ‘কর্মচারী’ বা ‘মালী’। কিন্তু এসব পরোয়া করেননি। কখনো সকালে, কখনো বিকালে কাজ করেছেন। সব মিলিয়ে তার সংগ্রহে দাঁড়ায় রক্তকাঞ্চনের চার হাজার বীজ।
এ বছরের এপ্রিলে শাহ আজিজুর রহমান হলের জঙ্গলে ভরা পরিত্যক্ত এক টুকরো জায়গায় বীজতলা তৈরি শুরু করেন মানিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী মেস থেকে কোদাল এনে এবং হল থেকে নিড়ানি নিয়ে প্রথমে সেই জঙ্গল পরিষ্কার করেছেন। তারপর প্রতিদিন ক্লাস ও টিউশনি শেষে রাতে ৯টার দিকে ফ্রি হয়ে মোবাইলের আলো দিয়ে বীজ রোপণ করতেন। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলে দিনের বেলা কাজ সারতেন। ক্যাম্পাস খোলা থাকার দিনগুলোতে ক্লাস না থাকলে জঙ্গল পরিষ্কার করে মাটি কেটে নরম করে বীজতলা তৈরি রাখতেন। রাতে ফ্রি হয়ে মোবাইলের আলো দিয়ে করতেন বীজ রোপণ।
পরিত্যক্ত জমি পরিষ্কার করে পাঁচটি ধাপে বীজতলাটি প্রস্তুত করেছেন মানিক। একা একা দীর্ঘ পাঁচ মাসের নিবিড় পরিচর্যায় সেখানে প্রায় তিন হাজার চারা উৎপাদন করেছেন। এগুলোর মধ্যে এক হাজারের বেশি চারা নিজেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রোপণ করেছেন। বাকি চারা ও বীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সংগঠন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপহার দিয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থী ও সংগঠনগুলোর মাধ্যমে দেশের প্রায় ২০ জেলায় বিনামূল্যে গাছ ও বীজ পাঠিয়েছেন মানিক।
চারা উৎপাদনে ১২০ টাকা, বৃক্ষরোপণের সময় সরঞ্জাম কিনতে ৩০০ টাকা, বাঁশ বাবদ ৪ হাজার ৫০০, রশি বাবদ ৩০০ এবং পরিবহনে ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে মানিকের। আনুষঙ্গিক খরচ পড়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে দুই শিক্ষক ও একজন চিকিৎসক তাকে সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। বাকি খরচ নিজের টিউশনির জমানো টাকা থেকে ব্যয় করেছেন তিনি।
মানিক রহমান বললেন, ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা জঙ্গল কেটে ফেলার অভিযান চালিয়ে রোপণ করা প্রায় ১০০ গাছ কেটে ফেলছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকে পাট-কাঠি শুকানোর নামে লেকের উত্তর-পশ্চিম দিকের গাছগুলোর ওপর পাট ও পাটকাঠি রাখায় অনেক গাছ মরে গেছে। জিয়া মোড় থেকে ছাত্রী হলে যাওয়ার রাস্তার দুপাশের ৪০টির মতো গাছও কেটে ফেলা হয়েছে। আমার পক্ষে একা সব চারা তদারকি করা কঠিন। এ বিষয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।’





