কৃষকের পাশে গাকৃবি
- ৭০টির বেশি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ নিয়ে বিশেষ আয়োজন

ছবি: আগামীর সময়
এবারের মেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি)। তাদের নির্বাচিত কয়েকটি উদ্ভাবন নিয়ে লিখেছেন আমিনুল ইসলাম
টপ লেডি
হাইব্রিড পেঁপে ‘টপ লেডি’ উদ্ভাবন করেছেন অধ্যাপক ড. নাসরিন আক্তার। এ জাতের গাছ আকারে ছোট এবং বেশ শক্তপোক্ত হয়। প্রতিটি গাছেই প্রচুর পেঁপে ধরে। পেঁপেগুলোর গড় ওজন এক থেকে দেড় কেজি। আকৃতি লম্বাটে এবং পাকার পর রঙ লালচে-হলুদ হয়।
একর প্রতি ফলন ৩৫ থেকে ৪০ টন। চারা রোপণের তিন থেকে চার মাস পর কাঁচা পেঁপে এবং ছয় মাস পর পাকা পেঁপে সংগ্রহ করা যায়। একেকটি গাছ দীর্ঘ সময় ফলন দিতে সক্ষম। সাধারণত মাঘ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত এর চাষ করা যায়। প্রতি একরে প্রায় ৫০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
মসলিন তুলা
২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ঢাকাইয়া মসলিন তুলা বা ফুটি কার্পাসের নতুন জাত উদ্ভাবন এবং এর জীবন-রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উদ্যোগে গবেষক অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে এই তুলার ওপর উচ্চতর গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে।
হারিয়ে যাওয়া ফুটি কার্পাস তুলার সঙ্গে মসলিনের তুলার মিল রয়েছে। এর জীবন-রহস্য বিশ্লেষণ এবং তুলার বৈশিষ্ট্যের জন্য যে জিনগুলো দায়ী, সেগুলো আবিষ্কার করা হয়েছে। শনাক্ত করা হয়েছে উচ্চমানের ফুটি কার্পাসের তিনটি জাত। ফুটি কার্পাসের তুলা থেকে মসলিন সুতা বানানোর জন্য জাতীয় তাঁত বোর্ডের সঙ্গে মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পে কাজ চলছে। মসলিন কার্পাস গাছে ফুল আসতে এক বছর সময় লাগে। সারা বছর ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম তুলা হয়। পৃথিবীতে যত তুলা আছে, সেগুলোর তুলনায় এটি তিন থেকে চার গুণ মসৃণ ও শক্ত।
আট বছরের গবেষণার ফসল জিএইউ সয়াবিন ৬
উপকূলীয় চরাঞ্চলসহ সারা দেশের জন্য উপযোগী উচ্চ ফলনশীল ও দ্রুত পরিপক্ব হওয়া ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ মান্নানের নেতৃত্বে উদ্ভাবন করা হয়েছে। আট বছরের নিয়ন্ত্রিত ও মাঠ পর্যায়ের গবেষণার ফসল এটি, যা খরা-সহনশীল।
অধ্যাপক ড. এম এ মান্নান বললেন, ‘সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার সহযোগিতায় নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলার উপকূলীয় চরাঞ্চলে টানা পাঁচ বছর মাঠ পর্যায়ের মূল্যায়ন শেষে জাতীয় বীজ বোর্ড ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর জাতটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়। উপকূলীয় চরাঞ্চলের লবণাক্ততা, অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়া মোকাবিলায় এই জাত নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।’
আউশ ধানের নতুন জাত
স্বল্পমেয়াদি, উচ্চ ফলনশীল এবং চিকন আউশ ধানের নতুন জাত ‘জিএইউ ধান-৪’ প্রায় এক দশকের গবেষণা ও পরীক্ষার পর অনুমোদন পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এম ময়নুল হক ও অধ্যাপক মসিউল ইসলামের নেতৃত্বে গবেষকদল এ জাত উদ্ভাবন করে।
দেশে আমন ও বোরো ধানের তুলনায় আউশ ধানের ফলন সাধারণত কম। তবে নতুন এ জাত সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম। জিএইউ ধান-৪ স্বল্পসময়ের মধ্যে পরিপক্ব হয়। জাতটি রোগবালাই প্রতিরোধী এবং সাধারণ জাতের তুলনায় গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। পাশাপাশি কম পানি প্রয়োজন হওয়ায় এটি জলবায়ু সহনশীল এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষযোগ্য।
ব্লাস্ট রোগের জীবাণু শনাক্তের কিট
গমের মারাত্মক ব্লাস্ট রোগ দ্রুত শনাক্তকরণ ও দমনের জন্য এই কিট তৈরি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলাম। ডিএনএ বা স্ট্রিপ পদ্ধতির মাধ্যমে মাত্র ৩০ মিনিটে এই রোগের জীবাণু শনাক্ত করা যায়। ব্লাস্ট রোগ গমের পাতা ও শীষে আক্রমণ করে।
এর ফলে শীষ শুকিয়ে সাদা বা সাদাটে বর্ণ ধারণ করে এবং দানার পুষ্টি ব্যাহত হয়। গবেষণা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম প্রকল্প ও বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) সহায়তায় গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্লাস্ট রোগ নিয়ে বিশেষ প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে।
আর্সেনিক ফিল্টার
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান স্বল্পমূল্যের পানি বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী আর্সেনিকযুক্ত দূষিত পানি পান করছে। তাদের পানীয়জলের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য এই আর্সেনিক ফিল্টার মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয়েছে।
ফিল্টারটিতে বালু, চারকোল বা বায়োচার ও আয়রন চিপস ২:৩:৩ আকারে একটি মাটির কলসিতে ব্যবহার করতে হবে। এই ফিল্টারের মাধ্যমে পানিকে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ আর্সেনিকমুক্ত করা সম্ভব। দিনে যদি ১৫ থেকে ২০ লিটার পানি ফিল্টার করা হয়, তাহলে দুই মাস পর্যন্ত ফিল্টারটি ব্যবহার করা যাবে। এরপর ফিল্টারের বালু, চারকোল বা বায়োচার ও আয়রন চিপস বদলাতে হবে। এটি যে কেউ সহজেই তৈরি করতে পারবেন। খরচ পড়বে প্রায় ৩০০ টাকা।









