শৈলানের সকলেই স্বাবলম্বী

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ের শৈলান গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘শৈলান প্রবীণ নিবাস’। সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশে এখানে প্রবীণরা শুধু আশ্রয়ই পান না; পান পরিবারের মতো একটি পরিমণ্ডল। ঘুরে এসে লিখেছেন সৈয়দ ফরহাদ
ঢাকা থেকে ৪৩ কিলোমিটার দূরে ধামরাইয়ের জয়পুরা বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ড থেকে হাতের ডানে আঁকাবাঁকা রাস্তা চলে গেছে গ্রামের ভেতর। অটোরিকশায় ঘড়ি ধরে প্রায় মিনিট বিশেকের রাস্তা। পৌঁছে গেলাম ‘শৈলান’ গ্রামে। গ্রামের নামেই এই বৃদ্ধাশ্রম। দূর থেকে সবুজ গাছপালার ফাঁকে বৃদ্ধাশ্রমের কিছুটা চোখে পড়ছিল। অটো আমাদের মূল ফটকেই নামিয়ে দিল।
ফটকে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘শৈলান প্রবীণ নিবাস’। চারদিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভেতরে ছিমছাম চারতলা আবাসিক ভবন। সবুজ রঙের ফটকে স্টিলের আড়াআড়ি জ্যামিতিক নকশা। নকশার ফাঁকে চোখ রাখতেই ভেতরটা অনেকটা ধরা পড়ে। এ যেন এক সবুজের সমারোহ। পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে ছোট্ট একটি খাল।
রাজধানীর কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে সবুজে ঘেরা এই প্রবীণ নিবাসে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল পরিচ্ছন্ন বাগান। নানা রঙের ফুলগাছের ফাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতি। ভেতরে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) মুহাম্মদ ওয়াহিদুর রহমান। বৃদ্ধাশ্রমের সুপারিন্টেন্ডেন্ট তিনি। তার সঙ্গে আলাপে জানলাম, বাগানের পরিচর্যায় অংশ নেন প্রবীণরাই। মূল ভবনের পেছনেও রয়েছে সবজি বাগান। ঢ্যাঁড়শ, বরবটি, পেঁপে, কলমি, আলুসহ নানা ধরনের সবজি চাষ হয় এখানে। এমনকি ভবনের ছাদেও রয়েছে সবজির আবাদ।
২০২২ সালের ২৬ মার্চ প্রতিষ্ঠিত এই প্রবীণ নিবাসে একসঙ্গে ৮০ জন থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে বাস করছেন ৫৫ জন প্রবীণ; এর মধ্যে ২২ নারী ও ৩৩ জন পুরুষ। তাদের জন্য রয়েছে পৃথক আবাসিক ব্লক। থাকা, খাওয়া, পোশাক— সবই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
প্রবীণদের সুস্থতাকে এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবার জন্য রয়েছেন একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট। রয়েছে নিজস্ব ফার্মেসি, যেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনামূল্যে দেওয়া হয়। প্রতি ১৫ দিন পরপর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসকরা এসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। যারা জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাবেন, তাদের সেবার জন্য মূল ভবনের পাশেই একটি নার্সিং হোমও প্রস্তুত করা হয়েছে। সেটি পুরোপুরি চালু না হলেও আপাতত মূল ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে সেই সেবা দেওয়া হচ্ছে।
দিনগুলো যেন একঘেয়ে হয়ে না ওঠে, সে ব্যবস্থাও রয়েছে। নিচতলার টিভি রুমে একদিকে চলছে বাংলা সিনেমা, অন্যদিকে জমে উঠেছে কার্ড কিংবা ক্যারম খেলা। পাশেই বইয়ের আলমারি। ইচ্ছা হলেই বই হাতে নিয়ে সময় কাটাতে পারেন প্রবীণরা। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে রয়েছে ২৪ ঘণ্টার আইপিএস ও সোলার প্যানেলের ব্যবস্থা।
টিভি রুমে গিয়ে দেখা হলো রেজাউল হক (৬৫), শাহ মতিউর রহমান (৭৩) ও কাজী গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে। কেমন আছেন— জানতে চাইলে হাসিমুখেই জানালেন, তারা ভালো আছেন। সময়ও ভালো কাটছে। ছেলেমেয়েরা মাঝেমধ্যে দেখতে আসেন। এখানকার সেবা, খাবার ও পরিবেশ নিয়ে তারা সন্তুষ্ট।
প্রতিদিন সকাল ৮টায় সব প্রবীণকে নিয়ে একটি নিয়মিত সমাবেশ বা ফল-ইন অনুষ্ঠিত হয়। সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিজেই এই কার্যক্রম পরিচালনা করেন। দিনে পাঁচবার খাবার পরিবেশন করা হয়, যার সবই এখানকার রান্নাঘরে প্রস্তুত হয়। অভ্যর্থনা কক্ষ থেকে রান্নাঘরটা দেখা যায়। কয়েকজন প্রবীণ নারী সেখানে মাছ কাটার কাজে সহায়তা করছিলেন। যেন এটি কেবল একটি আশ্রয় নয়; বরং একটি পরিবারেরই অংশ।
নারীদের ব্লকে পরিচিত হলাম ৬৩ বছর বয়সী মালিহার (ছদ্মনাম) সঙ্গে। একমাত্র কন্যার সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন মালিহা। শুধু জানতেন ‘শৈলান’ নামে একটি প্রবীণ নিবাস আছে। ব্যস, এটুকুই। শৈলানের খোঁজ পেয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগে। বেশ কদিন ধরেই ইউটিউবে ভারতের বৃদ্ধাশ্রমের ভিডিওগুলো চোখে পড়ছিল। একদিন হঠাৎ সামনে এসে পড়ল ‘শৈলান’। দেখলেন, দিলরুবা কবির-এর একটি বক্তব্য। বাকিটা তার কাছে শুনি—
“দিলরুবা আপার কথাগুলো ভালো লেগে গেল। জাস্ট এইটুকুই। আর কিচ্ছু না। ওই ‘শৈলান’, ওই নামটা আমার মনে ছিল, ব্যস এইটুকুই। আর কিছু আমার মেমোরিতে ছিল না। আমি প্রথম আসলাম ২০২৪-এরই ১৬ আগস্ট। এসে কথা বলে গেলাম। এরপর ২০২৪-এর ১ নভেম্বর থেকে থাকা শুরু করলাম। এখানে একটা কমফোর্ট আছে নিজের মতো।”
পুরুষ ব্লকে পরিচয় হলো মোহাম্মদ শহীদুল (ছদ্মনাম) আলমের সঙ্গে। বহু উত্থান-পতনের জীবন তার। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একটি রাষ্ট্র পরিচালিত ব্যাংকে। পরে ব্যাংকটি বেসরকারীকরণের আওতায় চলে গেলে নতুন কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরিচ্যুত করে। তখন তার বয়স মাত্র ৩৫ বছর। চাকরি হারানোর পর তড়িঘড়ি করে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেন। যেখানে অবসরকালীন কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিল না।
অবসরের পর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। হিসাব করে দেখেন, সংসারে তাকে ছাড়াই তার স্ত্রী ও মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছন্দে চলতে পারবেন। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, পরিবারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজের জন্য এমন একটি জায়গা বেছে নেবেন, যেখানে নিরাপদ পরিবেশে জীবন কাটানো সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই ২০২৩ সালে স্বেচ্ছায় শৈলান প্রবীণ নিবাসে এসে ওঠেন ৭৭ বছর বয়সী এই প্রবীণ। এখানে এসে তিনি শুধু আশ্রয়ই পাননি; পেয়েছেন নিয়মতান্ত্রিক জীবন, সঙ্গী-সাথি এবং মানসিক প্রশান্তির এক নতুন ঠিকানা।
শহীদুল আলমের সঙ্গে কথা বলে আমরা নিচতলায় নেমে এলাম। জোহরের ওয়াক্ত পাড়ি দিচ্ছে। নিচতলার প্রার্থনা কক্ষ থেকে নামাজ শেষে বেরিয়ে আসছেন প্রবীণরা। তাদের গন্তব্য ডাইনিং হল।
সুপারিন্টেন্ডেন্ট সাহেব জানালেন, প্রার্থনা কক্ষে একসঙ্গে প্রায় ৫০ জন নামাজ আদায় করতে পারেন। প্রার্থনা কক্ষের পাশেই আছে ওজুখানা। ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বজ্রনিরোধক, নিরাপত্তা প্রহরীসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও রয়েছে।
মাত্র আটজন কর্মীর আন্তরিক সেবায় পরিচালিত এই প্রবীণ নিবাসের চেয়ারপারসন দিলরুবা কবির। এখানে এসে মনে হয়, বয়স বাড়লেও মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। প্রয়োজন হয় শুধু একটু যত্ন, সম্মান আর আপন করে নেওয়ার। শৈলান প্রবীণ নিবাস সেই মানবিক বার্তাটিই নীরবে বহন করে চলেছে।
সুপারিন্টেন্ডেন্ট মুহাম্মদ ওয়াহিদুর রহমানের তথ্যে জানা গেল, শৈলান প্রবীণ নিবাসে ভর্তির কয়েকটি শর্ত রয়েছে। আবেদনকারীকে এমন শারীরিক অবস্থায় থাকতে হবে, যাতে তিনি নিজের দৈনন্দিন কাজ করতে পারেন। তবে ভর্তি হওয়ার পর কেউ শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে তার সার্বিক সেবার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে। ভর্তির জন্য একজন জিম্মাদার থাকা বাধ্যতামূলক। আবেদনকারী ও জিম্মাদার— উভয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি জমা দিতে হয়। লেখাটি পড়ে আগ্রহী হলে শৈলান প্রবীণ নিবাসের ওয়েবসাইটে থাকা সুপারিন্টেন্ডেন্টের যোগাযোগ নম্বরে কথা বলে ভর্তি-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জেনে নিতে পারেন।









