খুবজীপুরের ‘প্রবীণ সেবাকেন্দ্র’

সেবাকেন্দ্রে আসা একজন প্রবীণের চেকআপ করছেন চিকিৎসক
নাটোরের গুরুদাসপুরে দরিদ্র প্রবীণদের জন্য গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক সেবাকেন্দ্র। ঘুরে এসে লিখেছেন নাটোর প্রতিনিধি মো. লিটন হোসেন লিমন
নাটোর শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে গুরুদাসপুরের খুবজীপুর গ্রাম। নাটোর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে নয়াবাজার। এরপর অটোরিকশায় চাচকৈড় বাজার, সেখান থেকে আরও ২০ মিনিটের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম খুবজীপুরের প্রবীণ সেবাকেন্দ্রে। ফটক পেরিয়ে সবুজে ঘেরা চত্বরে চোখে পড়ল একতলা একটি দালান। ১১ কক্ষের এই ভবনেই চলছে প্রবীণদের চিকিৎসাসেবা। ভেতরে ঢুকতেই অভ্যর্থনা জানালেন সেবাকেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক আবু সাইদ সরকার। প্রবীণ সেবাকেন্দ্রটি দেখভাল করেন। পেশায় তিনি শিক্ষক।
একটি কক্ষে দেওয়া হচ্ছিল চিকিৎসাসেবা। সেখানে মর্জিনা বেগম (৬০) নামের এক প্রবীণ নারীর সঙ্গে পরিচয় হলো। পায়ের ব্যথা নিয়ে এসেছেন। চিকিৎসকের রুম থেকে বের হতেই জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এখানকার চিকিৎসা কেমন?’ বললেন ‘অনেক ভালো। ডাক্তার সময় নিয়ে দেখলেন।’ পাশের আরেক কক্ষে চলছে থেরাপি চিকিৎসা। জানা গেল, দরিদ্র, অসহায় ও পরিবারের অবহেলার শিকার প্রবীণদের নিবন্ধনের মাধ্যমে আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়। বর্তমানে কেন্দ্রটির নিবন্ধিত প্রবীণ রোগী ১৮০ জন। আশপাশের ৯টি গ্রামকে আটটি ইউনিটে ভাগ করে প্রতিটি ইউনিটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অসহায় প্রবীণদের শনাক্ত করেন। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের সেবার আওতায় আনা হয়। গুরুতর অসুস্থ হলে উন্নত চিকিৎসার খরচও বহন করে কেন্দ্রটি। এটি বৃদ্ধাশ্রম নয়, চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। ডায়াবেটিস, প্রেশার নির্ণয় ও থেরাপি চিকিৎসা দেওয়া হয়। শিগগিরই চালু হবে প্যাথলজি বিভাগ।
২০২০ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রবীণ সেবাকেন্দ্রটি
বয়সের ভারে চলাফেরা করতে পারেন না এবং শয্যাশায়ী এমন বৃদ্ধদের বাড়ি গিয়ে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ সরবরাহ করে এই সেবাকেন্দ্র। প্রতি মাসে তালিকাভুক্ত প্রবীণদের চেকআপ করে প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হয়। অবশ্য ৫০ টাকা ফি দিয়ে সাধারণ রোগীরাও চিকিৎসা নিতে পারেন। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই সেবাকেন্দ্র। শুক্রবার বন্ধ থাকে। কর্মরত চিকিৎসক ও সেবাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন নিবন্ধন করা প্রবীণ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। প্রতি মাসে একবার ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেরও আয়োজন করা হয় সেবাকেন্দ্রে। এতে চিকিৎসা দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। বিনামূল্যে চোখের ছানি অপারেশনের ব্যবস্থাও করা হয় সেবাকেন্দ্রের পক্ষ থেকে।
নিবন্ধিত প্রবীণদের একজন খুবজীপুর গ্রামের শতোর্ধ্ব আয়মালা। থাকেন নাতির সঙ্গে। চলাফেরা করতে পারেন না। দেখা করেছিলাম তার সঙ্গে। কেমন আছেন? বলতেই ইশারায় জানালেন, ভালো নেই তিনি। ঠিকমতো শুনতেও পান না। ‘প্রবীণ সেবাকেন্দ্র’ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আয়মালার দুয়ারে দরকারি ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছে; নিয়মিত খোঁজখবরও রাখছে।
সেবাকেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসেছিলেন ৭৫ বছরের কোবাদ মণ্ডল। স্ত্রী গত হয়েছেন। দুই ছেলের সংসারে বসবাস তার। একসময় দিনমজুরের কাজ করতেন। জানালেন, মাসে অন্তত একবার সেবাকেন্দ্রে এসে চেকআপ করান এবং ওষুধ নেন। জবেদা খাতুনের বয়স আশি ছুঁয়েছে। করিডর ধরে পায়চারি করার সময় পরিচয় হলো তার সঙ্গে। উচ্চ রক্তচাপ আর পেটের ব্যথা নিয়ে ২০২০ সালে প্রথম এখানে এসেছিলেন। সেই থেকে সেবা নিয়ে যাচ্ছেন। বাড়ির পাশের এক নাতি এ হাসপাতালের খোঁজ দিয়েছিল। মুখে স্বস্তির হাসি দিয়ে বললেন, ‘ওষুধের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে খাবার-দাবারও পাঠায় বাড়িতে।’ ৭৫ বছর বয়সী মো. মোজাম্মেল হোসেন ২০২০ সালে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে এ সেবাকেন্দ্রের খোঁজ পান। মোজাম্মেল বলেন, ‘এখানে চিকিৎসার জন্য একটি টাকাও দিতে হয় না। শরীর একটু খারাপ হলেই চলে আসি। নিয়মিত রক্তচাপ মাপাই। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকরা ওষুধ দেন; বাইরে থেকে কিনতেও হয় না।’সেবাকেন্দ্রের ফিজিওথেরাপিস্ট সৌরভ হাসানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সেবাকেন্দ্রে নিউরো ও অর্থোপেডিক রোগীই বেশি আসেন। কোমর, হাঁটু ও পায়ের গোড়ালির ব্যথা নিয়ে আসেন অনেকেই। নিয়মিত থেরাপি নিয়ে অনেকেই নাকি এখন সুস্থ। ২০২০ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রবীণ সেবাকেন্দ্রটি। সেবাকেন্দ্রে একজন কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন ফিজিওথেরাপিস্ট ও একজন অফিস সহকারী আছেন।
মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানালেন, নিজের মায়ের বার্ধক্যের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রবীণদের জন্য কিছু করার চিন্তা আসে তার মধ্যে। শুরুতে চিকিৎসা ক্যাম্পের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হলেও পরে দেখেন, শুধু প্রেসক্রিপশন দিলেই প্রবীণদের চিকিৎসা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন যথাযথ মনিটরিং। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষগুলোর কাছে গুরুদাসপুরের খুবজীপুরের এই ছোট্ট সেবাকেন্দ্রটি খানিক স্বস্তির ঠিকানা। শতোর্ধ্ব আয়মালা, ৭৫ বছরের কোবাদ মণ্ডল কিংবা মোজাম্মেল হোসেন; জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়। অসুস্থ হলে একটু চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ আর বিপদের সময় পাশে থাকার আশ্বাস। খুবজীপুরের ‘প্রবীণ সেবাকেন্দ্র’ সে কাজটিই করে যাচ্ছে।






