মাটির গয়নায় মায়াবতী

উপকরণে পরিবেশবান্ধব, নকশায় শিল্পসম্ভার— মাটির গয়নার আবেদন কখনোই ফুরোয় না। লিখেছেন অলকানন্দা রায়
রাজধানীর দোয়েল চত্বরে সেদিন বিকালের আলো ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছিল। সারি সারি দোকানের ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটি দোকানে সাজানো মাটির গয়নায় চোখ আটকে গেল। একজোড়া পোড়ামাটির দুল হাতে তুলতেই মনে পড়ল কাজী নজরুল ইসলামের গান— ‘কানের দুলে প্রাণ রাখিলে বিধিয়া...’।
সত্যিই কি প্রাণ বেঁধে রাখার ক্ষমতা আছে কোনো দুলের? হয়তো নেই! সৌন্দর্য তো নানা রূপেই ধরা দেয়। তবু পোড়ামাটির ছোট্ট একটি অলংকারের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এর ভেতরে যেন অন্যরকম এক টান লুকিয়ে আছে। এমন মায়া, যা চোখে নয়, মনে গেঁথে যায়। যে মায়ায় অলংকারের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে অনুভূতি।
উৎসে মাটি
বৃষ্টির পর ভেজা উঠোনে দাঁড়ালে অনেকেরই মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ঘ্রাণের উৎস মাটি। সেই গন্ধে থাকে শৈশব, আকাশ জুড়ে ঘুড়ি ওড়ানোর দুপুর, নদীর পাড়ে কাদামাটিতে মাখামাখি, মায়ের আঁচল, গ্রামের আলপথ, উৎসবের সকাল। আবার থাকে অদ্ভুত এক বিষণ্নতাও। মানুষ বড় হয়ে যায়, শহর বদলায়; পোশাক ও সাজের ভাষায় আসে পরিবর্তন। শুধু বদলায় না মাটির গন্ধ। হয়তো সে কারণেই টেরাকোটার গয়না পরলে একজন নারীকে মনে হয় যেন তিনি নিজের শিকড়কে করেছেন নিত্যসঙ্গী।
সোনা ঝলমল করে, রুপা দীপ্তি ছড়ায়, হীরা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। পোড়ামাটি তেমন কিছুই করে না। সে নীরবে নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখে নদীর পাড়, কুমারের চাকা, আগুনের উনুন আর এক শিল্পীর আঙুলের স্পর্শ। তাই টেরাকোটার একটি ছোট্ট দুলও কখনো কখনো শত ভরির হারকে হার মানায়। কারণ তার মূল্য ওজনে নয়, ঐতিহ্যে আর পরিধানকারীর অনুভূতিতে।
ঐতিহ্য থেকে সমকালে
হাজার বছর আগে বাংলার মানুষ পোড়ামাটির ফলকে দেবদেবী, লতাপাতা, পাখি আর জীবনের গল্প এঁকে রেখেছিলেন। পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় কিংবা প্রাচীন মন্দিরের গায়ে সেই টেরাকোটার শিল্প আজও সময়ের সাক্ষী। সেই ঐতিহ্যই নতুন রূপে এসে বসেছে নারীর কানে, গলায়, হাতে। ইতিহাস তাই শুধু জাদুঘরে থাকে না; কখনো কখনো খোঁপার পাশে গোঁজা একটি মাটির ফুল হয়েও ফুটে ওঠে।
‘প্রযুক্তি আর কৃত্রিমতার ভিড়ে মানুষ আবার ফিরে যেতে চাইছে স্পর্শের, হাতে তৈরি জিনিসের কাছে। সেই কারণেই টেরাকোটার গয়নাও ফিরে এসেছে নতুনরূপে’— বলছিলেন মৃৎশিল্পী এবং অনলাইন শপ আদিমের স্বত্বাধিকারী চন্দ্র মানিক। তার মতে, আজকের টেরাকোটার গয়না আর শুধু মাটির স্বাভাবিক রঙে আটকে নেই। পোড়ামাটির কালো, ইট লাল, খয়েরি, সরিষা, জলপাই, গাঢ় নীল, সাদা কিংবা সোনালি রঙের সূক্ষ্ম ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন নকশা। কোথাও পদ্ম, শাপলা, মাছ, পাখি, পেঁচা কিংবা আলপনার ছাপ; কোথাও আবার জ্যামিতিক রেখা, সূর্যমুখী, বিমূর্ত শিল্প বা একেবারে মিনিমাল নকশা। যেন ঐতিহ্য আর আধুনিকতা পাশাপাশি বসে গল্প করছে।
গণ্ডি পেরিয়ে
একসময় মাটির গয়নার চাহিদা বা ব্যবহার শুধু বৈশাখ কিংবা বসন্তের সাজেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন ঋতুর গণ্ডি পেরিয়ে এটি হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের অলংকার। সাদা সুতি বা লিনেন, কালো কুর্তা, নীল শাড়ি, অফ হোয়াইট জামদানি, সাধারণ কটন কিংবা পাশ্চাত্য ধাঁচের পোশাক— সবকিছুর সঙ্গেই অনায়াসে মানিয়ে যায় মাটির রঙ। একটি বড় দুল যেমন পুরো সাজের কেন্দ্র হতে পারে, তেমনি ছোট্ট টেরাকোটা পেনডেন্টও সাজকে করে তোলে আভিজাত্যময়।
অনলাইন টেরাকোটা গয়নার ব্র্যান্ড নিখুঁতোলিন্দর স্বত্বাধিকারী জান্নাতুল ফেরদৌসী জান্নাত বললেন, ‘এ ধরনের গয়না শুধু ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গেই মানানসই, এমনটা নয়। এখন এমনভাবে এগুলোর নকশা করা হচ্ছে, যাতে শাড়ির পাশাপাশি কুর্তি, ফতুয়া, লিনেন শার্ট, এমনকি টি-শার্টের সঙ্গেও সহজে পরা যায়।’ তার মতে, টেরাকোটার আসল সৌন্দর্য মাটির স্বাভাবিক রঙ ও পোড়ামাটির কালো আভাতেই সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে।
এমন গয়নার আরেকটি বড় সৌন্দর্য হলো এর অসম্পূর্ণতা। কোথাও হাতের হালকা আঁচড়, কোথাও সামান্য অমসৃণ রেখা, কোথাও রঙের সূক্ষ্ম পার্থক্য। এ বৈশিষ্ট্যই এ ধরনের গয়নাকে করে তোলে আরও আপন। কারণ প্রতিটি গয়নার ভেতর লুকিয়ে থাকে কারিগরের শিল্পীসত্তার পাশাপাশি শ্রম, ধৈর্য আর ভালোবাসার প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড
আন্তর্জাতিক ফ্যাশনেও এখন মাটির কাছাকাছি ফিরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। ফাস্ট ফ্যাশনের বিপরীতে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে হাতে তৈরি, পরিবেশবান্ধব ও শিল্পভিত্তিক অলংকার। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক স্বাধীন জুয়েলারি ব্র্যান্ড পোড়ামাটি, সিরামিক, পুঁতি ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি গয়নাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে। চলতি বছরের জুয়েলারি ট্রেন্ডে আর্দি টোন, টেক্সচার, হ্যান্ডক্রাফটেড ফিনিশ এবং শিল্পীর হাতের ছাপ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। টেরাকোটা, বালি, খয়েরি ও মাটির রঙের মতো প্রাকৃতিক রঙও সমানভাবে জনপ্রিয়।
দেশীয় শৈলী
স্টাইলের দিক থেকেও মাটির গয়না এখন বহুমাত্রিক। লম্বা দুলের সঙ্গে খোঁপায় গাঁদা বা জুঁই ফুল, জলপাই, সরিষা, ইট লাল কিংবা নীলের মতো মাটির কাছাকাছি রঙের পোশাক, হাতে কয়েকটি মাটির চুড়ি— ব্যস! সাজে চলে আসে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য। আবার লিনেন শার্ট বা ম্যাক্সি ড্রেসের সঙ্গে একটি বড় টেরাকোটা নেকপিসও তৈরি করতে পারে শৈল্পিক বোহেমিয়ান লুক। আর সেই মুহূর্তে একজন নারী শুধুই রূপবতী থাকেন না; হয়ে ওঠেন মায়াবতীও।
কোথায় পাওয়া যায়, দরদাম
রাজধানীর দোয়েল চত্বর, আড়ং, খুঁত, দেশীদশ, আইডিয়াল ক্রাফট, দেশীয় হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠান, কারুশিল্প মেলা, চারুকলার উৎসব প্রাঙ্গণ কিংবা অনলাইন উদ্যোক্তাদের কাছেও মিলছে বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ। হাতে তৈরি টেরাকোটার দুল সাধারণত ১৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে, নেকপিস ৫০০ থেকে ১৫০০ এবং কারুকাজসমৃদ্ধ সেট ৩০০০ টাকা বা তারও বেশি দামে পাওয়া যায়।
যত্নআত্তি
এই গয়নার যত্নও নিতে হয় মমতা দিয়ে। পানি থেকে দূরে রাখা, ব্যবহার শেষে শুকনো কাপড়ে মুছে আলাদা বাক্সে সংরক্ষণ করলেই বছরের পর বছর অটুট থাকে এর রঙ ও সৌন্দর্য।








