অ্যাকটিভওয়্যার ব্যায়ামেও আরামেও

মডেল: জয়নব আলম জুঁই, সাজ: শামীম, কৃতজ্ঞতা: কমব্যাট জিম, ছবি: আশরাফুল আলম
ব্যায়াম হোক কিংবা ব্যস্ত শহুরে জীবন, সঠিক অ্যাকটিভওয়্যার শরীরে দেয় আরাম আর মনে স্বস্তিকর অনুভূতি। জিমের চার দেয়াল পেরিয়ে তাই এ পোশাক দৈনন্দিন জীবনের অংশ। লিখেছেন রেজাউল আহমেদ
একসময় ব্যায়ামের পোশাকের চিত্র ছিল একটি পুরনো টি-শার্ট আর ট্র্যাকপ্যান্ট। সেই ধারণা বদলে গেছে অনেকটাই। বিশ্ব জুড়ে শরীরচর্চা সংস্কৃতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিয়েছে অ্যাকটিভওয়্যার। এই পোশাক শুধু ব্যায়ামের জন্য নয়; এর সঙ্গে অন্য পোশাক জুড়ে নিলে চলাফেরা, ভ্রমণ, বাজার করা, কফিশপে আড্ডা কিংবা বাসা থেকে কাজ করার সময়ও দেয় সমান স্বাচ্ছন্দ্য। তাই আজকের ফ্যাশন অভিধানে অ্যাকটিভওয়্যার মানে পোশাক ও জীবনধারা দুটিই।
জিম থেকে জীবনযাপনে
আজ যে অ্যাকটিভওয়্যারকে আমরা ফ্যাশনের অন্যতম জনপ্রিয় ধারা হিসেবে দেখছি, তার শুরু হয়েছিল খেলাধুলার মাঠে। বিশ শতকের আশির দশকে অ্যারোবিকস, জগিং ও ফিটনেস সংস্কৃতি বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয় হতে শুরু করলে আরামদায়ক, প্রসারণযোগ্য এবং ঘাম শোষণকারী পোশাকের চাহিদা বাড়ে। সে সময়ের উজ্জ্বল রঙের লিওটার্ড, ট্র্যাকস্যুট, সাইক্লিং শর্টস ও স্পোর্টস টাইটস ছিল আধুনিক অ্যাকটিভওয়্যারের ভিত্তি। নব্বইয়ের দশকে প্রযুক্তিনির্ভর কাপড়, যেমন পলিয়েস্টার-স্প্যানডেক্সের মিশ্রণ ব্যায়ামের পোশাকে নতুন মাত্রা যোগ করে। তখন থেকেই স্পোর্টসওয়্যার শুধু খেলোয়াড়দের নয়; সাধারণ মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পায়।
২০০০ সালের পর বড় বড় আন্তর্জাতিক স্পোর্টস ব্র্যান্ড ব্যায়ামের পোশাকে ফ্যাশনের ছোঁয়া যোগ করে। আরাম, কার্যকারিতা ও নান্দনিক নকশার সমন্বয়ে জন্ম নেয় ‘অ্যাথলিজার’; অর্থাৎ এমন পোশাক, যা জিমে যেমন মানানসই, তেমন দৈনন্দিন জীবনেও। ফলে ব্যায়ামের পোশাক ধীরে ধীরে খেলাধুলার গণ্ডি পেরিয়ে শহুরে জীবনযাপনের অংশ হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি গতি পায় কভিড-১৯ মহামারীর সময়। দীর্ঘদিন ঘরে থাকা, বাসা থেকে কাজ করা, হাঁটা, যোগব্যায়াম ও ঘরোয়া ফিটনেস চর্চার কারণে মানুষ এমন পোশাক খুঁজতে শুরু করে, যা একই সঙ্গে আরামদায়ক, ব্যবহারিক এবং স্টাইলিশ। সে সময় থেকেই অ্যাকটিভওয়্যার যে শুধু জিমের পোশাক তা নয়; বরং সারা দিন পরার উপযোগী পোশাক হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। আজ বিমানবন্দর, ক্যাফে, বিশ্ববিদ্যালয়, শপিং মল কিংবা ভ্রমণে— সব জায়গাতেই অ্যাকটিভওয়্যার দেখা যায়। ফ্যাশন বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাময়িক কোনো প্রবণতা নয়; বরং আধুনিক জীবনধারার স্থায়ী অংশ হয়ে উঠেছে।
ড্রেস ফর পারফরম্যান্স
ক্রীড়াবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, ভালো পোশাক শুধু শরীর নয়, মনকেও প্রস্তুত করে। একে বলা হয় ড্রেস ফর পারফরম্যান্স। যখন কেউ ব্যায়ামের উপযোগী পোশাক পরেন, তখন মানসিকভাবে নিজেকে অনুশীলনের জন্য প্রস্তুত মনে করেন। এর ফলে অনীহা কমে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং ব্যায়ামের প্রতি ধারাবাহিকতাও তৈরি হয়। তাই অনেকের কাছে অ্যাকটিভওয়্যার নতুন পোশাক নয়, বরং সুস্থ থাকার প্রতিশ্রুতির অংশ।
যদিও সবার অনুভূতি এক নয়, তবু এমন রঙের অ্যাকটিভওয়্যার বেছে নেওয়া ভালো, যা পরলে নিজেকে স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মবিশ্বাসী মনে হয়
আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড ও সুবিধা
এখনকার অ্যাকটিভওয়্যারগুলো সাধারণ কাপড়ের মতো নয়। এতে যুক্ত হয়েছে নানা প্রযুক্তি। যেমন: ময়েশ্চার-উইকিং প্রযুক্তি ঘাম দ্রুত শরীর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফোর-ওয়ে স্ট্রেচ কাপড় চারদিকে সমানভাবে প্রসারিত হয়। ফলে যেকোনো ভঙ্গিতে শরীর স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করতে পারে। সিমলেস প্রযুক্তি ত্বকে ঘর্ষণ কমায়, আর অ্যান্টি-ওডর ফিনিশের কারণে এ ধরনের পোশাক দীর্ঘ সময় ব্যবহারের পরও দুর্গন্ধ কমাতে সাহায্য করে। উন্নতমানের অ্যাকটিভওয়্যারে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকে।
রঙের প্রভাব ব্যায়ামে
অ্যাকটিভওয়্যারের রঙ শুধু ফ্যাশনের বিষয় নয়, এটি মানসিক প্রস্তুতিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, উজ্জ্বল লাল ও কমলা রঙ শক্তি, উদ্যম ও গতি বাড়ানোর অনুভূতি জাগাতে সক্ষম। নীল ও সবুজ রঙ মনকে শান্ত রাখে; তাই যোগব্যায়াম, পিলাটিস বা স্ট্রেচিংয়ের মতো অনুশীলনে অনেকের মনে এগুলো আরামদায়ক অনুভূতি দেয়। কালো রঙ আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয়, আবার সাদা বা হালকা রঙ সতেজতার বার্তা বহন করে। যদিও সবার অনুভূতি এক নয়, তবু এমন রঙের অ্যাকটিভওয়্যার বেছে নেওয়া ভালো, যা পরলে নিজেকে স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মবিশ্বাসী মনে হয়।
কারা পরছেন
সকালে হাঁটতে বের হওয়া প্রবীণ, যোগব্যায়াম করা গৃহিণী, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণী, অফিস শেষে ফিটনেস সেন্টারে যাওয়া কর্মজীবী, এমনকি শিশুদের খেলাধুলার জন্যও আলাদা অ্যাকটিভওয়্যার তৈরি হচ্ছে। যাদের জীবন একটু বেশি চলাফেরানির্ভর, তাদের পোশাকের আলমারিতে এখন এ ধরনের পোশাকের উপস্থিতি স্বাভাবিক।
কেন পরছেন
ব্যায়ামের সময় শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে, ঘাম হয়, হাত-পা বারবার ছড়ানোর দরকার পড়ে। সাধারণ সুতির পোশাক ঘাম ধরে রাখে, ভারী হয়ে যায় এবং অনেক সময় অস্বস্তি তৈরি করে। অন্যদিকে ভালো অ্যাকটিভওয়্যার শরীর থেকে ঘাম দ্রুত দূরে সরিয়ে দেয়, বাতাস চলাচল সহজ করে এবং শরীরকে দীর্ঘ সময় শুষ্ক রাখে। ফলে ব্যায়ামে মনোযোগ বাড়ে; ক্লান্তিও তুলনামূলক কম অনুভূত হয়।
কোন কাপড় ভালো
অ্যাকটিভওয়্যারে এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে পলিয়েস্টার, নাইলন, স্প্যানডেক্স, এলাস্টেন ও লাইক্রা ফেব্রিকের মিশ্রণ। অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতল থেকে তৈরি রিসাইকেলড পলিয়েস্টারও ব্যবহার করছে। এতে পরিবেশের ক্ষতি কিছুটা কমে, আবার কাপড়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
ব্যায়ামভেদে ভিন্ন পোশাক
সব ধরনের ব্যায়ামের জন্য একই পোশাক আদর্শ নয়। দৌড়ানোর জন্য প্রয়োজন হালকা, ঘাম শোষণকারী টি-শার্ট ও শর্টস বা রানিং টাইটস। যোগব্যায়ামের জন্য দরকার চারদিকে প্রসারণযোগ্য কোমল কাপড়, যাতে শরীরচর্চার প্রতিটি ভঙ্গি সহজে করা যায়। ওয়েট ট্রেনিংয়ে পোশাক এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে যন্ত্রপাতিতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে। সাইক্লিং বা আউটডোর ট্রেনিংয়ে অনেকেই কমপ্রেশন পোশাক ব্যবহার করেন, যা পেশিকে বাড়তি সমর্থন জোগায়।
নারীদের জন্য বাড়তি গুরুত্ব
নারীদের ক্ষেত্রে স্পোর্টস ব্রা শুধু আরামের জন্য নয়, শরীরকে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেওয়ার জন্যও জরুরি। একইভাবে হাই-ওয়েস্ট লেগিংস বা সাপোর্টিভ টপ অনেকের জন্য ব্যায়ামকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলে। অ্যাকটিভওয়্যার আসলে এমন হওয়া দরকার, যাতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যেকোনো ব্যায়াম করা যায়।
যে ভুলগুলো করেন অনেকেই
ব্যায়াম শুরু করলেও পোশাকের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ ভুল প্রায়ই দেখা যায়। অনেকেই পুরনো সুতির টি-শার্ট পরে জিমে যান, যা ঘাম ধরে রেখে অস্বস্তি তৈরি করে। কেউ আবার খুব আঁটসাঁট পোশাক পরেন, ফলে রক্ত সঞ্চালন ও নড়াচড়ায় বাধা পেতে পারেন। আবার অতিরিক্ত ঢিলেঢালা পোশাক ব্যায়ামের যন্ত্রে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু পোশাক নয়, ভুল জুতা ব্যবহারও হাঁটু, গোড়ালি ও কোমরে অতিরিক্ত চাপ ফেলতে পারে। এ ছাড়া ভেজা অ্যাকটিভওয়্যার দীর্ঘ সময় পরে থাকলে কিংবা একই পোশাক না ধুয়ে বারবার ব্যবহার করলে দুর্গন্ধ, ত্বকের সংক্রমণ ও ছত্রাকজনিত সমস্যার আশঙ্কা বাড়ে।
কোথায় মিলবে
ড্রাই-ফিট টি-শার্ট, জগার, লেগিংস, ট্রেনিং শর্টস, স্পোর্টস ব্রা, জ্যাকেট থেকে শুরু করে বিশেষায়িত রানিং জুতা— দেশে এখন অ্যাকটিভওয়্যার কেনার বিকল্প আগের তুলনায় অনেক বেশি। তুরাগ, টুয়েলভ, লেডিয়াম, লেভিন, সেইলর, রাইজ প্রভৃতি দেশি ব্র্যান্ডে স্পোর্টস কালেকশন এবং অ্যাকটিভওয়্যার পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মধ্যে পুমা, নাইকির আউটলেটে অ্যাকটিভওয়্যার ও পারফরম্যান্স জুতা মিলবে।
ভালো অ্যাকটিভওয়্যার শরীর থেকে ঘাম দ্রুত দূরে সরিয়ে দেয়, বাতাস চলাচল সহজ করে এবং শরীরকে দীর্ঘ সময় শুষ্ক রাখে
এ ছাড়া স্পোর্টসওয়্যারনির্ভর দোকান, যেমন— বাইস্পোটর্স, স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড, অ্যাথলেটিকা স্পোর্টস ওয়ারহাউজ এবং স্পোর্টস সামগ্রীর জন্য পরিচিত ক্লেটস বিডি থেকেও বিভিন্ন ধরনের জিম পোশাক, রানিং গিয়ার ও আনুষঙ্গিক পণ্য কেনা সম্ভব। পাশাপাশি ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা সিটি, গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেট, নিউ মার্কেট, মৌচাক এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দেশি-বিদেশি নানা ব্র্যান্ডের অ্যাকটিভওয়্যার মিলছে।
কেনার আগে খেয়াল রাখুন
- ব্যায়ামের ধরন অনুযায়ী পোশাক বেছে নিন; কেননা রানিং, যোগব্যায়াম বা ওয়েট ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন এক নয়।
- ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যায় (ড্রাই-ফিট বা ময়েশ্চার-উইকিং) এমন কাপড়কে প্রাধান্য দিন।
- পোশাকে পর্যাপ্ত স্ট্রেচ থাকা দরকার, যাতে সহজে নড়াচড়া করা যায়।
- খুব আঁটসাঁট বা অতিরিক্ত ঢিলেঢালা— দুই ধরনের পোশাকই এড়িয়ে চলুন।
- সেলাই মসৃণ কি না, তা পরখ করার পাশাপাশি ত্বকে ঘর্ষণ তৈরি না হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত হয়ে নিন।
- ট্রায়াল দিয়ে হাত-পা ভাঁজ বা স্কোয়াট করে ফিটিং পরীক্ষা করুন।
- ব্যায়ামের ধরন অনুযায়ী সঠিক জুতা বেছে নিন।
- বারবার ধোয়ার পরও কাপড়ের মান ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় থাকবে কি না, খেয়াল করুন।
- অনলাইন থেকে কিনলে সাইজ চার্ট, রিটার্ন নীতি ও ক্রেতাদের রিভিউ দেখে অর্ডার করুন।
- দামের চেয়ে আরাম, মান ও দীর্ঘস্থায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দিন।
- অনলাইন বা অফলাইনে কেনার সময় কাপড়ের উপাদান, স্ট্রেচ, সেলাই, সাইজ, রিটার্ন সুবিধা ও ব্যবহারকারীর রিভিউ দেখে নিন।
দরদাম
সাধারণ মানের টি-শার্ট বা ট্র্যাকপ্যান্ট প্রায় ৮০০-১,৫০০ টাকা থেকে শুরু হলেও উন্নত মানের লেগিংস, কমপ্রেশন পোশাক বা ব্র্যান্ডেড জুতার দাম কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।








