টোটো কোম্পানি
কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে-জঙ্গলে

কর্ণফুলী নদীতে কায়াকিং
কাপ্তাই হচ্ছে এমন এক প্যাকেজ, যেখানে পাহাড়-জঙ্গল, নদী, হ্রদ, পাহাড়ি সংস্কৃতি আর বন্যপ্রাণী সবই মিলবে। একের মধ্যে অনেক কিছুর এই জায়গার গল্প শুনিয়েছেন ইশতিয়াক হাসান
নদীর তীরে বাঁধা ছোট্ট একটা ডিঙি নৌকা। কয়েকজন কিশোর সেটা নিয়ে করছিল দুষ্টুমি। হঠাৎই মাথায় কী ভর করল, জিজ্ঞাসা করে বসলাম, ‘এটা নিয়ে নদী পেরিয়ে কাপ্তাই মুখ খালের জঙ্গলে যাওয়া যাবে?’
বন বিভাগের এক কর্মচারী মাঝিকে ডেকে আনলেন। মাঝি একটু ভেবে বলল, ‘যাওয়া যাবে, কিন্তু সময় লাগবে প্রায় এক ঘণ্টা।’
দুইশ টাকায় রফা হয়ে গেল।
নৌকায় উঠে বসলাম তিনজন। আমি, মিশুক আর মেহেদী। একটু পরেই মাঝির এক ঘণ্টা লাগবে কেন, তার কারণটা অনুমান করতে পারলাম। কর্ণফুলীতে পানি কম। মাঝির একটু ভুল হলেই বালুর চরে আটকে যাবে নৌকা। দুই পাশে পাহাড় আর অরণ্য। কোথাও ঘন সবুজ, কোথাও খাড়া ঢাল। মাঝেমধ্যে বন থেকে উড়ে যাচ্ছে পাখির ঝাঁক।
মাঝির সঙ্গে জমে উঠল গল্প। বলল, একসময় এখানে চিতাবাঘের হাতে গরু মারা পড়া ছিল নিয়মিত ঘটনা। এখন আর চোখে পড়ে না। শকুনও বহু বছর দেখেনি। ঠিক তখনই আকাশের চেহারা বদলে গেল। হালকা মেঘেরা ধীরে ধীরে পুরো আকাশ ফেলল গিলে। তারপর আচমকা শুরু হলো ঝোড়ো হাওয়া। মাঝি প্রাণপণ চেষ্টা করছে নৌকাটা সামাল দিতে। আমাদের মাথায় তখন একটাই চিন্তা। এই বুঝি গেল উল্টে!
বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা এটা। তবে রোমাঞ্চকর সেই বিকালের স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনি। আর সে কারণেই বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রিয় অরণ্যগুলোর তালিকায় কাপ্তাইয়ের জঙ্গল সবসময় ওপরের দিকেই থাকবে। সুযোগ পেলেই চলে যাই কাপ্তাইয়ে।
সীতা পাহাড়ে ওঠার পথ সহজ নয়, বিশেষ করে শর্টকাট পথটা ভয়ংকর খাড়া
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের ভেতরের এ অঞ্চলটার নাম কাপ্তাই মুখ খাল বিট। কর্ণফুলী নদী ধরে এগোতে এগোতে পৌঁছে যাওয়া যায় সেখানে। পাহাড়, নদী আর অরণ্যের বুনো এক মিলনমেলা এটি।
কাপ্তাই মুখ খালের সেগুনবাগান সহজেই নজর কাড়বে। ডুমুর, নিম, হরীতকীসহ হরেকরকম গাছপালা জায়গাটা করেছে বৈচিত্র্যময়। কোথাও ঘন ছায়া, কোথাও ভাঙা আলো এসে পড়ছে বনের মেঝেতে। যদিও বাংলাদেশের বেশিরভাগ অরণ্যের মতো এখানে প্রাকৃতিক বনের দাপট আগের মতো নেই।
কাপ্তাই মুখ খালে আছে শতবর্ষী এক বনবাংলো। পাকিস্তান আমলে বন বিভাগের প্রধান ইউসুফ এস আহমেদের বই উইথ দ্য ওয়াইল্ড অ্যানিমেলস অব বেঙ্গল-এ এই বাংলোর উল্লেখ আছে। সেখানে খেদা পদ্ধতিতে বুনো হাতি ধরার বর্ণনাও পাওয়া যায় কাপ্তাইয়ে।
কাপ্তাইয়ের প্রতিটি এলাকাই পাহাড়-অরণ্যপ্রেমীদের মুগ্ধ করবে। কর্ণফুলী নদীর তীরেই বন বিভাগের রাম পাহাড় বিট অফিস। সামনে দিয়ে দুরন্তগতিতে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী কর্ণফুলী। আর ওপরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ সীতা পাহাড়।
সীতা পাহাড়ে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। কোথাও শতবর্ষী বৃক্ষ, কোথাও মোটা লতা নেমে এসেছে গাছের বুক চিরে। পুরো পাহাড়টাই যেন আদিম কোনো অরণ্যের শেষ স্মৃতি।
বনকর্মীদের কাছ থেকে শুনেছিলাম, একসময় এই জঙ্গল আরও গভীর ছিল। বিশাল বিশাল প্রাচীন গাছে ঢাকা ছিল পাহাড়।
কর্ণফুলীর এক পাশে সীতা পাহাড়, অন্য পাশে রাম পাহাড়। উচ্চতা ১৭০০-১৮০০ ফুট। তবে সীতা পাহাড় একটু বেশি উঁচু। সীতা পাহাড়ে ওঠার পথ সহজ নয়। বিশেষ করে শর্টকাট পথটা ভয়ংকর খাড়া। কোথাও ভেজা মাটি, কোথাও পাথুরে ঢাল। লাঠি ছাড়া ওঠাই কঠিন। কিন্তু চূড়ায় পৌঁছানোর পর সব কষ্ট মিলিয়ে যায়।
সামনে বিস্তীর্ণ পাহাড় আর কর্ণফুলীর আঁকাবাঁকা পথ। মনে হবে, সবুজের সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। দিনে দেখা যায় রাঙামাটি-চট্টগ্রামের রাস্তা। আর রাতে দূরের শহরের আলো জ্বলতে থাকে নক্ষত্রের মতো। সীতা পাহাড়ের গায়ে কয়েকটি মারমাপাড়া আছে। হয়তো দেখবেন কোনো মারমা নারী মাথায় বিশাল মাটির হাঁড়ি নিয়ে খাড়া পথ বেয়ে ঝরনার দিকে নামছেন। কিছুক্ষণ পর আবার সেই পথ ধরেই উঠে আসছেন, এবার হাঁড়িভর্তি পানি নিয়ে।
এ পাহাড়ে আছে সেরো বা বনছাগল। আছে মায়া হরিণ, বুনো শূকরসহ নানা বন্যপ্রাণী। তবে বিশাল আকারের হরিণ সাম্বারের ডাক এখন আর শুনতে পান না বলে জানান স্থানীয়রা।
রাম পাহাড়ে ওঠার সহজ পথ কঠিন পথ দুটোই পাবেন। এখান থেকেও চারপাশের অরণ্যের দৃশ্য অসাধারণ লাগে। কখনো নামতে নামতে পৌঁছে যেতে পারেন ঘন জঙ্গলের মাঝখানের কোনো ঝিরিতে। রাম পাহাড় নিয়ে স্থানীয়দের মুখে লতা বাঘের গল্প শুনেছিলাম। পরে গবেষকদের ক্যামেরা ট্র্যাপে কাপ্তাইয়ে মেঘলা চিতার ছবি ধরা পড়ে।
কাপ্তাই মানেই হাতির রাজ্য। কাপ্তাই মুখ বিট, কর্ণফুলী বিটসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো সহজে দেখা মেলে বুনো হাতির। আবার কাপ্তাই থেকে রাঙামাটি যাওয়ার পাহাড়ি রাস্তায়ও মাঝেমধ্যে উঠে আসে তারা। কাপ্তাই গেলে রাঙামাটি যাওয়ার অসাধারণ সুন্দর এ শর্টকাটটায় ভ্রমণ মিস করবেন না। এর এক পাশে পাহাড়, আরেক পাশে কাপ্তাই হ্রদ। পথে চমৎকার কয়েকটি রেস্তোরাঁ আছে। রাঙামাটি যাওয়ার সময় অর্ডার দিলে আসার পথে পাহাড়ি মেন্যুতে লাঞ্চও করে নিতে পারেন।
স্থানীয়রা বললেন, গ্রীষ্মে কাঁঠালের গন্ধে কাপ্তাই-রাঙামাটি রাস্তার দুই পাশের বাড়িগুলোতে হানা দেয় হাতির পাল। তবে হাতি দেখতে চাইলে সাবধান। খাবারের সংকটে পাহাড়ি হাতিদের মেজাজ বেশিরভাগ সময়ই খিটখিটে থাকে।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বিভিন্ন কোম্পানির বাস সরাসরি কাপ্তাই যায়। চাইলে রাঙামাটি গিয়ে সেখান থেকে ভেতরের সুন্দর শর্টকাট পথ ধরেও যেতে পারবেন। কাপ্তাইয়ে বেশ কয়েকটি ভালো রিসোর্ট হয়েছে। থাইল্যান্ড ধাঁচের পড হাউজও আছে। ভাড়া তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা।
আরও দেখবেন
জঙ্গল দেখার পাশাপাশি নৌকা ভাড়া নিয়ে বেড়াতে পারেন কাপ্তাই হ্রদে। কর্ণফুলী নদীতে কায়াকিংয়েরও সুযোগ আছে। নদীর অপর তীরে গেলে পাবেন মারমা বসতি চিংম্রং। চমৎকার কয়েকটি বৌদ্ধমন্দির আছে সেখানে।




