জীবন যাপন
ছুটির দিনেও ক্লান্তি কেন

মডেল: আফসানা আহমাদ, পোশাক ও গয়না: লেবেল ইমাম হাসান, সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ, ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
টানা কর্মদিবসের শেষে ছুটির দিনটা হওয়ার কথা আরাম ও স্বস্তির। অথচ এই দিনে যেন আরও বেশি অবসন্ন লাগে। এর কারণ জানাচ্ছেন সায়মন
কর্মজীবীদের জন্য সাধারণত শুক্র ও শনি— মাত্র দুদিন ছুটি। অনেকের ক্ষেত্রে সে সুযোগও নেই; সপ্তাহে ছুটির দিনের সংখ্যা মাত্র এক। দিনটি শান্তিমতো ঘুমিয়ে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবেন কিংবা আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় কাটাবেন বলে ঠিক করলেন। অথচ সেদিন সকালে যেন বিছানা ছেড়ে ওঠাই দায়! পিঠ, ঘাড়, কোমরের আড়ষ্টতায় উঠে বসতে কষ্ট হয় কিংবা উঠতে পারলেও যেন প্রচণ্ড অবসাদে আর নড়তে ইচ্ছে করে না। যে দিনে সবচেয়ে সতেজ লাগার কথা, সে দিনেই রাজ্যের ক্লান্তি এসে ভর করে।
সারা সপ্তাহ কাজের চাপে আমাদের শরীরে কর্টিসল বা অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন তৈরি হয়। এ হরমোনগুলো শরীরকে একটি উত্তেজনার মধ্যে ডুবিয়ে রাখে। তখন শরীর বুঝতে পারে না, সে কতটা ক্লান্ত। কিন্তু ছুটির দিনের সকালে যখন কাজের সেই প্রবল তাড়া থাকে না, তখন এ হরমোনের মাত্রাও হঠাৎ কমে যায়। মস্তিষ্ক বুঝতে পারে, এখন আর কোনো যুদ্ধ নেই। আর তখনই সারা সপ্তাহের জমানো ক্লান্তি একসঙ্গে শরীরের ওপর আছড়ে পড়ে। শরীর তখন বিশ্রামের দাবিতে একেবারে নেতিয়ে যায়!
এ অদ্ভুত ক্লান্তির কারণ জানালেন ন্যাশনাল হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্কের পুষ্টিবিদ আকলিমা ফারহানা ঝুমি। তিনি বললেন, ‘ইঞ্জিন চলতে যেমন জ্বালানি প্রয়োজন, তেমনি মানুষের শরীর ঠিকঠাক চালানোর জন্য পুষ্টি দরকার। আমরা ভাবি, শুধু ঘুমালেই ক্লান্তি দূর হবে। অথচ পুষ্টির অভাব থাকলে শত বিশ্রামেও শরীর সতেজ হয় না।’
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের সকালটি সুন্দর করতে চাইলে আগের রাতের খাবার হতে হবে একদম হালকা
কর্মদিবসে আমরা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠি এবং নাশতা করি। শরীর সেই নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ছুটির দিনে সেই নিয়মের বালাই থাকে না। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়। সকালের নাশতা খেতে খেতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে যায় কারও কারও। দীর্ঘসময় পেট খালি থাকার কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা মারাত্মকভাবে নেমে যায়। শরীর তার ভেতরের শক্তি হারাতে থাকে। এরপর দুপুরে যখন একবারে অনেক বেশি মুখরোচক খাবার খাওয়া হয়, তখন শর্করা হঠাৎ করে আবার বেড়ে যায়। শর্করার এ আকস্মিক ওঠানামা শরীরকে ভেতর থেকে ভীষণ দুর্বল করে ফেলে।
আমাদের ছুটির দিনের দুপুরের খাবার সাধারণত একটু ভারী হয়। এমন দিনে অনেক বাড়িতে পোলাও, বিরিয়ানি, মাংসের মতো তেল-মসলাযুক্ত খাবার রান্না হয়। এই ভারী খাবার হজম করতে শরীরের প্রচুর শক্তির প্রয়োজন পড়ে। ভারী খাবার খাওয়ার পর শরীরের রক্তপ্রবাহ পাকস্থলীর দিকে বেশি চলে যায়। তখন মস্তিষ্ক আর পেশিতে রক্তপ্রবাহ কমে; চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে বলা হয় ফুড কোমা। ছুটির দিন দুপুরবেলায় পেটপুরে খাওয়ার পর যে শরীর আর নড়তে চায় না, তার আসল কারণ এটাই।
এ পুষ্টিবিদ আরও একটি জরুরি বিষয়ের দিকে নজর দিতে বললেন, সেটি হলো পানিশূন্যতা। অফিসে হয়তো টেবিলের ওপর পানির বোতল থাকে, অভ্যাসবশত নিয়ম করে পানি পান করা হয়। কিন্তু ছুটির দিনে বাড়িতে একটানা কাজের ফাঁকে পানি পানের কথা অনেকেই একেবারে ভুলে যান। শরীরে পানির সামান্য ঘাটতি হলেই কোষে কোষে অক্সিজেন পৌঁছাতে বাধা পায়। তখনই পেশিতে ক্লান্তি আসে এবং নীরব মাথাব্যথা শুরু হয়। আমরা বুঝতেও পারি না, কেন এত খারাপ লাগছে।
আবার এ ক্লান্তি কাটাতে অনেকে ঘন ঘন চা বা কফি পান করেন। অতিরিক্ত ক্যাফেইন সাময়িকভাবে শরীরকে চাঙ্গা করলেও একটু পরে আরও নিস্তেজ করে দেয়। বিশেষত আমাদের দেশের নারীরা আয়রন, ভিটামিন বি১২ এবং ভিটামিন ‘ডি’র অভাবে ভোগেন। সারা সপ্তাহের অযত্নে তৈরি হওয়া এ ঘাটতিগুলো ছুটির দিনে আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তখন সামান্য কাজ করলেই হাঁপিয়ে ওঠার ঘটনা ঘটে।
কর্মদিবসে আবারও সতেজভাবে কাজে ফেরার জন্য ছুটির দিনে খাদ্যাভ্যাসে কিছু ছোট পরিবর্তন আনা খুব জরুরি। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের সকালটি সুন্দর করতে চাইলে আগের রাতের খাবার হতে হবে একদম হালকা। সহজে হজম হয়— এমন খাবার খেয়ে ঘুমাতে গেলে পরদিন সকালে খুব ঝরঝরে অনুভূতি হবে। ছুটির দিনটি শুধু সংসারের জমানো কাজের জন্য নয়; শরীরেরও বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে। সব কাজ একা না করে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে হাসিমুখে ভাগ করে নেওয়া ভালো। সঠিক পুষ্টি এবং নিজের প্রতি একটুখানি মমতা থাকলে এ ক্লান্তি দূর করে প্রাণবন্ত একটি জীবন উপভোগ করা কঠিন কিছু নয়।



