পূজায় এবার নতুন কী

মডেল: অনন্যা সাহা সাজ: রাখী চাম্বুগং পোশাক: অঞ্জন’স গয়না: সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরি কৃতজ্ঞতা: বিহাইভ স্টুডিও ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
উৎসব মানেই পুরনো রেওয়াজের সঙ্গে নতুন ফ্যাশনের মেলবন্ধন। শারদীয় দুর্গাপূজায় তা যেন পায় বাড়তি মাত্রা। সাজপোশাক ও রূপচর্চায় এবারের নতুনত্বের সন্ধান দিচ্ছেন সায়মন
দুর্গাপূজা ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডিতে আটকে থাকে না; বাঙালির সংস্কৃতি, আনন্দ, মিলন আর সাজসজ্জার এক বিশাল ক্যানভাস হিসেবে এর আবেদন চিরন্তন। প্রতি বছরই পূজার ফ্যাশনে আসে নতুন মাত্রা, বদলায় ট্রেন্ড। তবে এবার ফ্যাশন হাউজগুলোর সংগ্রহে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার ফিউশন বা মেলবন্ধন দেখা যাচ্ছে। জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদের পাশাপাশি স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম এবং নিজস্বতাকে দেওয়া হচ্ছে গুরুত্ব।
দুর্গাপূজার আনন্দে পারিপাট্যের ভূমিকা অনেক। ষষ্ঠীর সকাল থেকে দশমীর সিঁদুর খেলা— প্রতিদিনের প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্যই থাকে আলাদা পরিকল্পনা। কেউ বেছে নেন সাবেকি শাড়ি, কেউ স্বচ্ছন্দ কুর্তি কিংবা ফিউশন কস্টিউম। পোশাকের কাট, কাপড়, রঙ ও অনুষঙ্গে বদল আসে সময়ের সঙ্গে। এবারও ঐতিহ্যের পাশাপাশি নতুন নকশা, রঙের বৈচিত্র্য আর নিজের মতো করে সাজতে পারার আনন্দ উপভোগের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
শাড়িতে নতুন রূপ
পূজার সাজপোশাকে শাড়ির আবেদন চিরকালীন। তবে শাড়ি পরার ধরন, ব্লাউজের নকশা আর গয়নার সমন্বয়ে বদলে যেতে পারে পরিচিত অবয়ব। জামদানি, তাঁত, সিল্ক, মসলিন কিংবা হালকা সুতিসহ নানা ধরনের শাড়ি রাখতে পারেন পছন্দের তালিকায়। দিনের বেলায় আরামদায়ক কাপড়, হালকা রঙ ও সূক্ষ্ম নকশা ভালো মানাবে। সন্ধ্যার আয়োজনে বেছে নিতে পারেন উজ্জ্বল রঙ, জমকালো বুনন কিংবা সুতার কাজ করা শাড়ি। এর সঙ্গে ব্লাউজেও আনা সম্ভব নতুনত্ব। সাধারণ গোল গলা কিংবা হাতাকাটার বদলে সঙ্গী হতে পারে কেপ হাতা, চওড়া গলার নকশা কিংবা কোমর পর্যন্ত লম্বা ব্লাউজ। শাড়ির সঙ্গে ব্যাকলেস, কর্সেট ধাঁচের ব্লাউজ কিংবা ওভারসাইজড শার্টও এনে দেবে আধুনিক আবহ। কেউ চাইলে একরঙা শাড়ির সঙ্গে প্রিন্টের ব্লাউজ কিংবা শাড়ির ওপর হালকা জ্যাকেট পরতে পারেন। তবে শাড়ির রঙ, নকশা ও কাপড়ের সঙ্গে ব্লাউজের সামঞ্জস্য রাখলে বেশভূষা হয়ে উঠবে ছিমছাম পরিপাটি।
সুতি শাড়ি, লিনেনের কুর্তি কিংবা হালকা রঙের কো-অর্ড সেট বেছে নিতে পারেন। সঙ্গে ছোট দুল, হালকা মেকআপ ও আরামদায়ক জুতা
কো-অর্ড সেটে আধুনিকতা
শাড়ি সামলানোর ঝক্কি এড়াতে চাইলে কো-অর্ড সেট হতে পারে ভালো বিকল্প। একই কাপড়ের টপ ও প্যান্ট কিংবা টপ ও স্কার্টের সমন্বয়ে সাজপোশাক দেখতে যেমন পরিপাটি, তেমনি পরতেও স্বচ্ছন্দ। সুতার কাজ করা, আজরাক, কলামকারি, ফুলেল নকশা কিংবা জ্যামিতিক ছাপের পোশাকে পাওয়া যায় ভিন্নতা। সন্ধ্যার ঘোরাঘুরিতে বেছে নিতে পারেন গাঢ় রঙের কো-অর্ড সেট। দিনের বেলায় হালকা রঙ ও সুতির কাপড় বেশি আরামদায়ক। সঙ্গে ছোট কানের দুল, স্লিং ব্যাগ ও আরামদায়ক জুতা রাখলেই সাজ পাবে পূর্ণতা। পোশাকে ভারী নকশা থাকলে গয়না কম পরা ভালো। আর পোশাক একরঙা হলে কানের দুল কিংবা গলায় আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ যোগ করতে পারেন।গাউনে আনন্দ
উৎসবের সন্ধ্যায় লম্বা গাউন কিংবা ঘেরওয়ালা পোশাকেও তৈরি করা যায় আকর্ষণীয় লুক। কোমরে মানানসই কাট, লম্বা ঘের, কটির সঙ্গে সূক্ষ্ম কারুকাজ কিংবা ফুলেল নকশার গাউন দেখতে সুন্দর লাগে। ভারী কাজের পোশাকের পাশাপাশি হালকা কাপড়ের গাউনও বেছে নিতে পারেন, বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার পরিকল্পনা থাকলে। গাউনের সঙ্গে কানের বড় দুল কিংবা ছোট চোকার বেশ মানাবে। চুল খোলা রাখলে সাজে আসবে মিষ্টি আভা। আবার নিচু করে বাঁধা খোঁপায় গুঁজে নিতে পারেন ফুল। পোশাকের রঙ ও নকশা বেশি নজরকাড়া হলে মেকআপে রাখুন সংযম। এতে মায়া কাড়বে মুখ।সময় বুঝে
পূজার প্রতিটি দিন জমকালো পোশাকে কাটাতে হবে, এমন নয়। সালোয়ার-কামিজ, লম্বা কুর্তি কিংবা পালাজ্জোও হতে পারে উৎসবের উপযোগী পোশাক। ফ্লোর লেন্থ আনারকলি, এ-লাইন কুর্তি, ঘেরওয়ালা পালাজ্জো কিংবা সোজা কাটের কামিজ— যেকোনোটা বেছে নিতে পারেন পছন্দমতো। লিনেন, খাদি ও সুতি কাপড়ে কাঁথা ফোঁড়, সুতার কাজ কিংবা ছাপা নকশার পোশাক উৎসবের সাজে দেশীয় আবহ আনে। একরঙা কুর্তির সঙ্গে নকশা করা ওড়না কিংবা প্রিন্টের পালাজ্জো পরলে সাজপোশাকে আসে বৈচিত্র্য। গয়নায় থাকতে পারে অক্সিডাইজড কানের দুল, কাঠের চুড়ি কিংবা রঙিন পুঁতির মালা। দিনের বেলায় হালকা সাজ আর সন্ধ্যায় একটু গাঢ় লিপস্টিক ও বড় কানের দুল যোগ করলেই একই পোশাক ছড়াবে ভিন্ন আমেজ।গয়নায় উৎসব
উৎসবের বেশভূষায় পোশাকের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে গয়না। তবে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভারী অলংকার পরার প্রয়োজন নেই; বরং একটি আকর্ষণীয় অনুষঙ্গই হয়ে উঠতে পারে মূল আকর্ষণ। অক্সিডাইজড রুপালি, ডোকরা, রঙিন পুঁতি, কুন্দন কিংবা সুতার কাজ করা গয়না বেছে নিতে পারেন পোশাকের ধরন অনুযায়ী। জামদানি বা তাঁতের সঙ্গে বড় ঝুমকা, কুর্তির সঙ্গে লম্বা মালা আর গাউনের সঙ্গে চোকার কিংবা ঝলমলে কানের দুল দারুণ মানাবে। গলায় ভারী হার পরলে কানে রাখুন ছোট দুল। কানের দুল বড় হলে গলায় হার না পরলেও চলে। চাইলে গয়নায় রঙের সমন্বয়ও পরীক্ষা করা সম্ভব। পোশাকের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে পরার বদলে বিপরীত রঙের অনুষঙ্গ বেছে নিলে সাজসজ্জায় আসে নতুনত্ব। তবে পোশাকের নকশা, গয়নার আকার ও নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
জুতায় আরাম, সাজে স্বস্তি
পূজায় এক প্যান্ডেল থেকে অন্য প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা পরিবারের সঙ্গে ঠাকুর দেখা— সব মিলিয়ে হাঁটাহাঁটি কম হয় না। তাই জুতা বাছাইয়ে স্টাইলের পাশাপাশি আরামকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শাড়ি কিংবা গাউনের সঙ্গে স্নিকার্স পরলে বেশভূষায় আধুনিক মাত্রা যোগ হয়। সূক্ষ্ম নকশার স্নিকার্স, এমব্রয়ডারি করা নাগরা, কোলাপুরি চটি কিংবা নিচু হিলের জুতাও বেছে নিতে পারেন। তবে নতুন জুতা উৎসবের দিন প্রথমবার পরা একটু ঝুঁকিপূর্ণ! আগে থেকে কিছুক্ষণ পরে হাঁটলে বোঝা যাবে, জুতাটি মানাচ্ছে কি না। পোশাকের রঙের সঙ্গে জুতা মিলিয়ে পরা যায়, আবার নিরপেক্ষ রঙের জুতাও একাধিক পোশাকের সঙ্গে মানানসই। দীর্ঘ সময় বাইরে কাটানোর পরিকল্পনা থাকলে পায়ের আঙুলে চাপ পড়ে কিংবা গোড়ালিতে ঘষা লাগে, এমন জুতা এড়িয়ে চলুন। নইলে ঘোরাঘুরি আর উৎসবটাই মাটি হতে পারে!মেকআপে স্বাভাবিক আভা
উৎসবের সাজে দিনের বেলায় হালকা বেস, ব্লাশ, কাজল ও লিপস্টিকেই মুখ সুন্দর দেখাবে। সন্ধ্যায় চোখের মেকআপ কিংবা ঠোঁটের রঙ একটু গাঢ় করা যায়। স্বাভাবিক আভা বজায় রাখতে ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা প্রয়োজন। বাইরে বের হওয়ার আগে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। মেকআপ করার আগে ত্বক পরিষ্কার ও আর্দ্র রাখা ভালো। বাইরে থেকে ফিরে উপযুক্ত ক্লিনজার দিয়ে মেকআপ তুলে ফেলুন। ত্বকে জ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি করে, এমন প্রসাধনী ব্যবহার এড়িয়ে চলা জরুরি। অন্যদিকে, উৎসবের দিন নতুন কোনো প্রসাধনী নিয়ে নিরীক্ষা না করাই মঙ্গল!
কোন দিন কেমন স্টাইল
ষষ্ঠী ও সপ্তমী: পূজার শুরুর দিনগুলোতে সাজসজ্জা থাকুক হালকা ও স্নিগ্ধ। সুতি শাড়ি, লিনেনের কুর্তি কিংবা হালকা রঙের কো-অর্ড সেট বেছে নিতে পারেন। সঙ্গে ছোট দুল, হালকা মেকআপ ও আরামদায়ক জুতা। সন্ধ্যায় পোশাকের রঙ কিংবা গয়নায় একটু উজ্জ্বলতা যোগ করা যেতে পারে।
অষ্টমী: অষ্টমীর অঞ্জলিতে লাল-সাদা শাড়ি, জামদানি কিংবা তাঁতের সাবেকি সাজপোশাকের আবেদন আলাদা। সঙ্গে লাল টিপ, চুড়ি ও মানানসই কানের দুল। সন্ধ্যার আয়োজনে সিল্কের শাড়ি, জমকালো গাউন কিংবা ভারী কাজের পোশাক বেছে নিতে পারেন। চোখের সাজে সামান্য গাঢ় রঙ কিংবা ঠোঁটে উজ্জ্বল লিপস্টিক উৎসবের আবহ বাড়াবে।
নবমী: নবমীর সন্ধ্যায় স্টাইলে থাকতে পারে একটু বেশি আভিজাত্য। মেরুন, গাঢ় নীল, বটল সবুজ কিংবা বেগুনি রঙের পোশাক নজর কাড়তে সক্ষম। সিল্কের শাড়ি, ঘেরওয়ালা গাউন কিংবা শারারা স্যুটের সঙ্গে মানানসই গয়না বেছে নিতে পারেন। পোশাক জমকালো হলে মেকআপ ও গয়নার মধ্যে যেকোনো একটিকে প্রাধান্য দেওয়া ভালো।
দশমী: লাল পাড় সাদা শাড়ি, লাল টিপ, চুড়ি ও আলতায় দশমীর সাজসজ্জায় ধরা দেয় চিরায়ত বাঙালিয়ানা। শাড়ি আটপৌরে শৈলীতে পরতে পারেন। সঙ্গে সোনালি কিংবা অক্সিডাইজড গয়না মানাবে। সিঁদুর খেলার সময় চোখ ও ত্বকের সুরক্ষার বিষয়টিও মাথায় রাখা দরকার। মেকআপ এমন রাখুন, যা সহজে পরিষ্কার করা সম্ভব।







