স্বস্তির ছন্দে স্ট্রিট স্টাইল

মডেল: নিলিমা হাসান মোহনা; পোশাক: অঞ্জন’স; সাজ: রেড বাই আফরোজা পারভীন; ছবি: আশরাফুল আলম
চলতি পথের ফ্যাশন কি কোনো নির্দিষ্ট পোশাকে বন্দি? না, তা নয়। এটি শহুরে জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার একটি ভঙ্গি। লিখেছেন প্রিয়াঞ্জলি রুহি
চলার পথের পোশাকের বড় ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হলো স্বস্তি। কারণ যে পোশাকে নিশ্চিন্তে হাঁটা বা ছুটে চলা যায়, গরমে অস্বস্তি হয় না, হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে গেলেও খুব বেশি ঝামেলা নেই— সেই পোশাকই সবচেয়ে আপন মনে হয়। ফ্যাশনের ভাষায় এ স্বাচ্ছন্দ্যই স্ট্রিট স্টাইলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে স্ট্রিট স্টাইল মানেই শুধু টি-শার্ট, জিন্স আর স্নিকার্সের সমন্বয় নয়। নিজের ব্যক্তিত্ব, জীবনযাপন আর স্বাচ্ছন্দ্যকে একসঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই এর আসল সৌন্দর্য।
চলতি হাওয়া
রাস্তায় পরে বের হওয়ার পোশাক শুধু সুন্দর হলেই চলে না, স্বস্তিও দিতে হয়। যানজট, গরম, হাঁটাহাঁটি কিংবা হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যে পরিধেয় যেন হয়ে না ওঠে বাড়তি ঝামেলা। তাই এখন স্ট্রিট স্টাইলে গুরুত্ব পাচ্ছে এমন পোশাক, যা আরামদায়ক, ব্যবহারিক এবং একই সঙ্গে স্টাইলিশ। স্ট্রিট স্টাইলের জন্য আলাদা কোনো পোশাক সংযোজনের প্রয়োজন নেই। ব্লেজার, লং স্কার্ট, টপ কিংবা সালোয়ার-কামিজের মতো প্রতিদিনের পরিচিত পোশাককেও একটু ভিন্নভাবে স্টাইল করে নেওয়া যায়। পোশাকের ধরনের পাশাপাশি তার সঙ্গে কীভাবে অনুষঙ্গ যোগ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের ব্যক্তিত্ব, শহুরের জীবনযাপন আর সাবলীলতাকে একসঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই এর আসল জাদু।
আরাম আগে, স্টাইলও সঙ্গে
চলতি পথের পোশাক বাছাইয়ের প্রথম শর্ত হলো কাপড়। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় কটন, লিনেন, খাদি কিংবা বাতাস চলাচল করতে পারে এমন হালকা কাপড় বেশ আরামদায়ক। খুব আঁটসাঁট পোশাকের বদলে বেছে নেওয়া যায় একটু ঢিলেঢালা কাট। এতে চলাফেরা সহজ হয়, শরীরও থাকে স্বস্তিতে।
স্ট্রিট স্টাইল মানেই শুধু টি-শার্ট, জিন্স আর স্নিকার্সের সমন্বয় নয়। নিজের ব্যক্তিত্ব, জীবনযাপন আর স্বাচ্ছন্দ্যকে একসঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই এর আসল সৌন্দর্য
তবে ঢিলেঢালা মানেই অগোছালো নয়। বরং সঠিক অনুপাতের দিকে একটু নজর রাখলেই আরামদায়ক পোশাকও হয়ে ওঠে বেশ স্টাইলিশ। একটি ওভারসাইজড শার্টের সঙ্গে স্ট্রেট কাটের প্যান্ট, লুজ ট্রাউজারের সঙ্গে ফিটেড টপ কিংবা কুর্তার সঙ্গে ওয়াইড-লেগ প্যান্ট— এমন সমন্বয়েই তৈরি হতে পারে ভারসাম্যপূর্ণ স্ট্রিট লুক। এমন কাটের পোশাক বেছে নেওয়া ভালো, যা শরীরের সঙ্গে লেগে থাকে না এবং হাঁটা, ওঠানামা কিংবা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে না। কারণ স্ট্রিট স্টাইলের সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন পোশাকটি পরে মনে হয় এটি শুধু পরার জন্য নয়, বরং চলার উপযোগী করেই তৈরি।
জিন্সের বাইরেও শহুরে ফ্যাশন
স্ট্রিট স্টাইল মানেই ডেনিমের আধিপত্য— এ ধারণা এখন অনেকটাই অতীত। জিন্স প্যান্ট অবশ্যই ফ্যাশনের অন্যতম পরিচিত পোশাক, তবে এর বাইরেও রয়েছে অনেক বিকল্প। ওয়াইড-লেগ ট্রাউজার, কার্গো প্যান্ট, প্যারাশুট প্যান্ট, জগার কিংবা ঢিলেঢালা কটন প্যান্টও এখন প্রতিদিনের চলতি পথের সঙ্গী। জিন্স পরতে চাইলে স্ট্রেট বা রিল্যাক্সড ফিট বেছে নেওয়া যেতে পারে। সঙ্গে সাধারণ টি-শার্ট, ক্রপড শার্ট কিংবা হালকা ওভারশার্ট। এমন পোশাকের সঙ্গে খুব বেশি সাজগোজের প্রয়োজন নেই; বরং কয়েকটি সহজ উপাদানের সমন্বয়েই তৈরি করে নিতে পারেন আধুনিক স্ট্রিট লুক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও নানা ধরনের পোশাক। যেমন লং স্কার্ট। গোড়ালি ছেঁায়া স্কার্টকে শুধু পার্টি বা সাজগোজের পোশাক না বানিয়ে একটি বেসিক টপ, ওভারসাইজড শার্ট কিংবা হালকা জ্যাকেটের সঙ্গে পরা যায়। পায়ে স্নিকার্স বা ফ্ল্যাট জুতা আর সঙ্গে ক্রসবডি ব্যাগ, ব্যস! তৈরি হয়ে গেল স্বচ্ছন্দ লুক। লং স্কার্টের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি একই সঙ্গে আরামদায়ক ও স্টাইলিশ হতে পারে। দিনের বেলায় সাধারণ হিল ও ফ্ল্যাট জুতার সঙ্গে যেমন পরা যায়, তেমনি একটু গাঢ় রঙের টপ, জ্যাকেট কিংবা স্টেটমেন্ট ব্যাগ যোগ করে বদলে দেওয়া সম্ভব পুরো লুকের মেজাজ।
ব্লেজারে ফরমাল ভাব মানা
ব্লেজারকে শুধু অফিস বা আনুষ্ঠানিক পোশাক ভাবার দিনও শেষ। স্ট্রিট স্টাইলিংয়ে একে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ ও ক্যাজুয়াল করে নেওয়া যায়। ফরমাল শার্টের বদলে সাধারণ টপ বা টি-শার্ট, সঙ্গে রিল্যাক্সড ফিটের বা ডেনিম প্যান্ট এবং পায়ে স্নিকার্স কিংবা হিল— এভাবেই ব্লেজার পেয়ে যেতে পারে নতুন মেজাজ। ব্লেজারের বোতাম খোলা রেখে পরা, হাতা সামান্য গুটিয়ে নেওয়া কিংবা সঙ্গে ছোট ক্রসবডি ব্যাগ যোগ করা যেতে পারে। এতে পোশাকটি অফিস বা ফরমালের সীমা ছাড়িয়ে হয়ে উঠবে এফোর্টলেস স্ট্রিট লুকের অংশ। ব্লেজারে মিলতে পারে আত্মবিশ্বাস, লং স্কার্টে স্বাচ্ছন্দ্য, টপে সহজতা কিংবা সালোয়ার-কামিজে দেশি মেজাজ। একই ব্লেজারকে কখনো ফরমাল, আবার কখনো ক্যাজুয়াল করে তোলার এ ক্ষমতাই স্ট্রিট স্টাইলিংকে আকর্ষণীয় করে। পোশাকের ধরন না বদলে শুধু তার সঙ্গে থাকা উপাদানগুলো বদলালেই পাল্টে যেতে পারে পুরো চেহারা।
দেশি পোশাকেও স্ট্রিট স্টাইল
স্ট্রিট স্টাইল মানেই পাশ্চাত্য পোশাকের ধরন-ধারণ নয়। কটন কুর্তা, ফতুয়া, লম্বা শার্ট, সালোয়ার কিংবা সাদামাটা শাড়িও হতে পারে চলতি পথের ফ্যাশনের অংশ। একটি সাধারণ কুর্তার সঙ্গে ওয়াইড-লেগ প্যান্ট ও স্নিকার্স, কিংবা কটন শাড়ির সঙ্গে ফ্ল্যাট স্যান্ডেল ও ব্যাগ— চিরচেনা এই দেশি পোশাক ও অনুষঙ্গেই পাওয়া যাবে আরাম ও স্টাইল— দুই-ই।
খুব আঁটসাঁট পোশাকের বদলে বেছে নেওয়া যায় একটু ঢিলেঢালা কাট। এতে চলাফেরা সহজ হয়, শরীরও থাকে স্বস্তিতে। তবে ঢিলেঢালা মানেই অগোছালো নয়। বরং সঠিক অনুপাতের দিকে একটু নজর রাখলেই আরামদায়ক পোশাকও হয়ে ওঠে বেশ স্টাইলিশ
শাড়ির আঁচল একটু গুছিয়ে নেওয়া, ভারী গয়নার বদলে ছোট কানের দুল বা ঘড়ি যোগ করা— এসব ছোট পরিবর্তনই লুকটিকে করে তুলতে পারে চলতি পথের উপযোগী। শাড়ির সঙ্গে স্নিকার্স পরেও তৈরি করা যায় আধুনিক স্ট্রিট লুক। আবার খুব সাধারণ একটি কুর্তাকে ওয়াইড-লেগ প্যান্ট, স্লিং ব্যাগ ও সানগ্লাসের সঙ্গে পরলে পুরো অবয়ব পেয়ে যায় ভিন্ন আবহ। অর্থাৎ স্ট্রিট স্টাইলের জন্য নিজের পরিচিত পোশাক থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন নেই। বরং চেনা পোশাককেই নতুনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
জুতায় গুরুত্ব
স্ট্রিট স্টাইলে জুতা শুধু ফ্যাশনের অংশ নয়, স্বস্তিরও বিষয়। দীর্ঘ সময় হাঁটতে হলে নারীরা হাই হিলের বদলে স্নিকার্স, ফ্ল্যাট স্যান্ডেল, লোফার কিংবা আরামদায়ক স্লিপ-অন বেছে নেওয়া ভালো। বিশেষ করে স্নিকার্স শুধু স্পোর্টসওয়্যারের সঙ্গে মানানসই— এমনটা নয়। শাড়ি, কুর্তা, ডেনিম— সবকিছুর সঙ্গেই সঠিক জোড়ায় এটি তৈরি করতে পারে স্মার্ট লুক। তবে শুধু দেখতে সুন্দর হলেই হবে না, জুতাটি কতটা ব্যবহারিক সেটিও ভাবা দরকার। দীর্ঘ সময় হাঁটা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা কিংবা ব্যস্ত রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে পায়ের জন্য স্বস্তিদায়ক জুতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্ট্রিট লুকে জুতার ক্ষেত্রে ফ্যাশনের সঙ্গে আরামের সমন্বয় জরুরি।
ব্যাগে ব্যবহারিক
চলতি পথে ছোট্ট সুন্দর ব্যাগের পাশাপাশি ভাবতে হবে প্রয়োজনের কথাও। মোবাইল, মানিব্যাগ, চাবি, প্রয়োজনীয় প্রসাধনী বহন করতে হলে ক্রসবডি ব্যাগ, স্লিং ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক কিংবা মাঝারি আকারের টোট সঙ্গে রাখা যেতে পারে। পোশাকের সঙ্গে ব্যাগের রঙ হুবহু মেলানোর প্রয়োজন নেই। বরং নিউট্রাল পোশাকের সঙ্গে একটি কনট্রাস্ট ব্যাগ পুরো লুকে এনে দিতে পারে আলাদা আকর্ষণ। লম্বা স্কার্ট কিংবা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে ছোট সাইড ব্যাগ যেমন ব্যবহারিক, তেমনি স্টাইলিশও।
লেয়ারে লুক বদল
স্ট্রিট স্টাইলের আরেকটি মজার দিক হলো লেয়ারিং। টি-শার্টের ওপর খোলা শার্ট, কুর্তার সঙ্গে হালকা জ্যাকেট কিংবা টপের সঙ্গে ওভারশার্ট— একই পোশাক ভিন্নভাবে পরার সুযোগ তৈরি করে এটি। এতে একই পোশাক বারবার পরলেও একঘেয়ে লাগে না।
টি-শার্টের ওপর খোলা শার্ট, কুর্তার সঙ্গে হালকা জ্যাকেট কিংবা টপের সঙ্গে ওভারশার্ট— একই পোশাক ভিন্নভাবে পরার সুযোগ তৈরি করে এটি
যেমন, একটি সাধারণ টি-শার্ট একদিন শুধু প্যান্টের সঙ্গে পরা যায়, আবার অন্যদিন তার ওপর খোলা শার্ট কিংবা হালকা জ্যাকেট যোগ করলেই বদলে যেতে পারে পুরো লুক। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে ভারী স্তর এড়িয়ে হালকা ও বাতাস চলাচল করতে পারে এমন কাপড় বেছে নেওয়াই ভালো। বিশেষ করে গরমের দিনে লেয়ারিং যেন অস্বস্তির কারণ না হয়। হালকা কটন শার্ট, পাতলা ওভারশার্ট কিংবা সামান্য ওজনের জ্যাকেটই হতে পারে এর জন্য উপযুক্ত।
রোদ-বৃষ্টি সামলে
পথে নামলে আবহাওয়া কখন বদলে যায়, বলা মুশকিল। তাই স্ট্রিট লুকে ব্যবহারিক কিছু অনুষঙ্গও জায়গা করে নিতে পারে। সানগ্লাস, ছাতা, ক্যাপ কিংবা হালকা ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাগ শুধু প্রয়োজন মেটাবে না; লুকেও যোগ করবে আলাদা মাত্রা। রোদে বের হলে সানগ্লাস যেমন চোখে স্বস্তি দেবে, তেমনি সাধারণ পোশাকেও যোগ করবে স্টাইলিশ ভাব। ক্যাপও হতে পারে একই সঙ্গে ব্যবহারিক ও ফ্যাশনেবল অনুষঙ্গ। বৃষ্টির সময়ে এমন জুতা বেছে নেওয়া ভালো, যা ভিজলে সহজে নষ্ট হয় না এবং হাঁটার সময় পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। পোশাকও এমন হওয়া ভালো, যা দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং ভেজা রাস্তায় চলাফেরায় অসুবিধা তৈরি করে না। অর্থাৎ আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও স্ট্রিট স্টাইলের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
রঙে থাকুক শহরের ছোঁয়া
স্ট্রিট স্টাইলে রঙ নিয়ে পরীক্ষার সুযোগ অনেক। বেস কালার হিসেবে সাদা, কালো, ধূসর, বেইজ কিংবা নেভি ব্লু রাখা যায়। তার সঙ্গে যোগ করা যায় লাল, কমলা, সবুজ, নীল বা হলুদের মতো উজ্জ্বল রঙ। যারা সাদামাটা লুক পছন্দ করেন, তারা পুরো পোশাক নিউট্রাল রেখে শুধু জুতা, ব্যাগ বা ক্যাপের মাধ্যমে রঙের ছেঁায়া দিতে পারেন।









