২৪ ঘণ্টায় অপতথ্যের কেন্দ্রে বিএনপি

ছবি: আগামীর সময়
২৪ ঘণ্টায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যের বড় অংশই ছিল বিএনপিকে ঘিরে। দলটির নেতাদের বক্তব্য, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও পুরোনো ঘটনার ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে একাধিক বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি বিমানবন্দর, আওয়ামী লীগ, এনসিপি, আন্তর্জাতিক ঘটনা এবং নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশাকে নিয়েও ছড়ানো হয় বিভিন্ন অপতথ্য। এসব দাবির সত্যতা যাচাই করে দেশের পাঁচটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান মোট ১৪টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আজকের এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশের পাঁচটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান মোট ১৪টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭টি রিউমর স্ক্যানার, ৪টি ফ্যাক্টওয়াচ, ২টি ডিসমিসল্যাব এবং ১টি দ্য ডিসেন্ট প্রকাশ করেছে। বাংলা ফ্যাক্ট অবশ্য কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
প্রকাশিত ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে ৪টি ছিল বিএনপি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে। এ ছাড়া বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ৩টি, আওয়ামী লীগ নিয়ে ২টি এবং এনসিপি-সম্পর্কিত ১টি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বা বিদেশ-সম্পর্কিত বিষয় নিয়েও প্রকাশিত হয়েছে ২টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন।
বিএনপি, বিমানবন্দর ও আওয়ামী লীগ—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মোট ৯টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যা মোট প্রতিবেদনের ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ দিনের প্রকাশিত ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিল এই তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
পাশাপাশি নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য নিয়েও দুটি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রিউমর স্ক্যানার একটি এবং দ্য ডিসেন্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে একই বিষয় নিয়ে।
বিএনপি
বিএনপিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যের মধ্যে অন্যতম ছিল আরটিভির লোগোসংবলিত একটি ভুয়া ফটোকার্ড। এতে দাবি করা হয়, বিএনপি নেতা তারেক রহমান বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার যে উন্নয়ন সেটা আমরা কেউই অস্বীকার করতে পারবো না।’
তবে ফ্যাক্ট চেকে দেখা যায়, আরটিভি এমন কোনো সংবাদ বা ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। তারেক রহমানও এমন কোনো মন্তব্য করেননি। প্রকৃতপক্ষে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় আরটিভির ভিন্ন একটি মূল ফটোকার্ড সম্পাদনা করে এই বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পুরোনো ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, ‘অটো রিকশা বন্ধ করে রিকশা চালকের পেটে লাথি দিচ্ছে এই অবৈধ সরকার। এই জুলুম নির্যাতন ও অত্যাচার দেশের মানুষ মেনে নিবে না।’
তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি বর্তমান সময়ের কিংবা বিএনপি সরকারের আমলের নয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বগুড়ায় ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানের দৃশ্য।
একইভাবে ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছে। ভিডিওটিতে শিক্ষার্থীদের পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যেতে দেখা যায়।
কিন্তু ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, এটি সাম্প্রতিক কোনো সচিবালয় ঘেরাওয়ের ঘটনা নয়; বরং ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরের একটি পুরোনো ভিডিও। ওই দিন শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কার্যালয় ঘেরাও করেছিলেন।
বিমানবন্দর
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ খানকে বিমানবন্দর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন একটি দাবি হঠাৎ ফেসবুকে ভাইরাল হয়।
রিউমর স্ক্যানার ও ফ্যাক্টওয়াচ এ বিষয়ে প্রতিবেদনে যাচাইয়ে দাবিটি ভুল বলে প্রমাণ পায়। ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ খান এখনো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই কর্মরত আছেন।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার খবর প্রকাশ করতে গিয়ে দৈনিক ইনকিলাব ও আজকের দৈনিক একটি ভুল ছবি ব্যবহার করে।
ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্ট চেকে দেখা গেছে, গণমাধ্যম দুটিতে ব্যবহৃত সংবাদচিত্রটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি একটি কাল্পনিক দৃশ্য।
আওয়ামী লীগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিশাল জনসমাগমের ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়, এটি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের বাবার জানাজার দৃশ্য।
তবে রিউমর স্ক্যানার ও ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে নিশ্চিত করেছে যে, ভিডিওটি বাংলাদেশের কোনো জানাজার নয়। বরং এটি গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতের ভূপালে অনুষ্ঠিত আসাদউদ্দিন ওয়াইসির একটি রাজনৈতিক জনসভার দৃশ্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবেই পুরোনো ঘটনা, ভিন্ন দেশের দৃশ্য, সম্পাদিত ছবি কিংবা এআই-তৈরি কাল্পনিক দৃশ্যকে নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এসব দাবির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ফ্যাক্টচেকারদের অনুসন্ধানে একের পর এক উঠে আসছে অপতথ্যের ভিন্ন উৎস ও প্রকৃত ঘটনা।






