নেপালে যখন স্বজনের খোঁজে হাহাকার, তখন মিথ্যা তথ্যে সয়লাব সামাজিক মাধ্যম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে একের পর এক ভুয়া ও পুরনো ভিডিও, সম্পাদিত ছবি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কনটেন্ট। বাস্তব দুর্যোগের সঙ্গে এসব ভুয়া তথ্য মিশে যাওয়ায় নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে থাকা পরিবার থেকে শুরু করে উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ— সবাই পড়ছেন বিভ্রান্তিতে।
নেপালের রসুবা ও নুয়াকোট জেলায় ভোটেকোশী নদীর আকস্মিক ঢলে বসতি প্লাবিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞের নানা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছু বাস্তব দুর্যোগের হলেও সেগুলো ছিল অন্য দেশ বা আগের কোনো ঘটনার। আবার কিছু ভিডিও ডিজিটালি পরিবর্তিত এবং কয়েকটি সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি বলে তথ্য-যাচাইকারীরা নিশ্চিত করেছেন।
দুর্যোগের সময়ে যখন পরিবারগুলো নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে উদ্বিগ্ন এবং কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণে ব্যস্ত, তখন এসব ভুয়া তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে ভিউ, লাইক ও শেয়ারের পেছনে ছোটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কাছে ভয়াবহ দুর্যোগও পরিণত হয়েছে আকর্ষণীয় কনটেন্টে। দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে আজ সোমবার উঠে এসেছে এমন তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ আগস্ট ‘প্রকাশ কুঁওয়ার’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ভয়াবহ বন্যার একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ৭০ লাখের বেশি ভিউ পাওয়া ভিডিওটি ‘হাইভ মডারেশন’ বিশ্লেষণে ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ সম্ভাবনায় এআই-নির্মিত বলে শনাক্ত হয়। এক্সের কমিউনিটি নোটস ও বিবিসি ভেরিফাইও ভিডিওটিকে ভুয়া বলে নিশ্চিত করে।
এর আগে ‘দুধৌলি এফএম’ নামের একটি ফেসবুক পেজে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুংকে উদ্ধারকাজে সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকার দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। পরে ফ্যাক্ট-চেকাররা জানালেন, সেটি ভারতের উত্তরাখণ্ডের পুরনো উদ্ধার অভিযানের ফুটেজ।
এ ছাড়া নেপালের হিমবাহ ধসে আকস্মিক বন্যার দৃশ্য দাবি করে ছড়ানো একটি ভিডিওর উৎস পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার কলাম্বিয়া হিমবাহ। রসুবার একটি বসতি বন্যায় ধ্বংস হওয়ার দাবিতে ছড়ানো ‘আগের ও পরের’ ছবিও কৃত্রিম বলে শনাক্ত করেছে অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট।
ভুয়া কনটেন্টের পাশাপাশি মৃতদেহ ও ধ্বংসযজ্ঞের বীভৎস ছবিও ছড়িয়ে পড়ছে। নেপাল প্রেস কাউন্সিল জানিয়েছে, গত চার দিনে ৭২ জনকে অনুপযুক্ত কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ বিষয়ে ১০১টি অভিযোগ জমা পড়ে, যার মধ্যে ৬৭টি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে বীভৎস দৃশ্য পোস্টের অভিযোগ।
ফ্যাক্ট-চেকারদের মতে, দুর্যোগের সময় ঘটনাস্থল থেকে যাচাইকৃত তথ্য আসতে দেরি হওয়ায় ‘তথ্যের শূন্যতা’ তৈরি হয়। এই সুযোগে ভিউ ও ভাইরালের আশায় যাচাই ছাড়াই পুরনো, ভুয়া কিংবা এআই কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও একই ধরনের কনটেন্ট বারবার দেখিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এ ধরনের ভুয়া তথ্য শুধু সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তই করে না; উদ্ধার অভিযানেও সমস্যা তৈরি করতে পারে। জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে এখন কয়েক মিনিটেই বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি সম্ভব হওয়ায় দুর্যোগের সময় তথ্য যাচাই আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।







