কৃপাসিন্ধুর বেনায় এখনো বেঁচে আছে কুশান গান

কৃপাসিন্ধু রায় সরকার।
কুশান গান উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্যধারা। বাংলাদেশের কুশান গানের বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম একজন কৃপাসিন্ধু রায় সরকার। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের নিভৃত গ্রাম কামারপাড়ায় তার বাড়ি। গিরিশচন্দ্র রায় ও বিমলাময়ী রানীর ঘরে ৩১ আগস্ট, ১৯৫৫ সালে জন্ম তার।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলায় কুশান গানের প্রচলন দেখা গেলেও বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলা এবং আসাম রাজ্যের গোয়ালপাড়া, কোকরাঝাড় ও ধুবড়ী জেলায় রাজবংশী ভাষাভাষী সম্প্রদায়ের মধ্যে কুশান গানের বিশেষ প্রচলন রয়েছে। এটি শুধু গান নয়, এর সঙ্গে থাকে গান, নৃত্য, কাহিনী বলা, অভিনয়, ছন্দোবদ্ধ সংলাপ, চরিত্র অনুযায়ী পোশাক ও মঞ্চাভিনয়। এজন্য কুশান গানকে অন্যতম জটিল, সমন্বিত ও বহুমাত্রিক লোকনাট্যধারা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কুশান গানে প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বেনার ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর সঙ্গে খোল, করতাল, মন্দিরা ও বাঁশির মতো বাদ্যযন্ত্রও ব্যবহৃত হয়। গান পরিবেশনার সময় শিল্পীরা ধুতি, ছ্যাওটা ধুতি, বেপারি বা কাঙ্গাল শার্ট, গামছা, চাদর, শাড়ি ও ঘুরি চরিত্র অনুযায়ী পোশাক পরিধান করেন। রাম, সীতা, রাবণসহ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে পোশাক ও সাজসজ্জায়ও বৈচিত্র্য দেখা যায়।
কৃপাসিন্ধু রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বাবার গ্রামে যাত্রাগানের একটি দল ছিল। আগের দিনে গ্রামে সচ্ছল ব্যক্তিরা নাম-ডাকের জন্য একটি করে গানের দল করতেন। সন্ধ্যা হলেই বাড়ির আঙিনায় শুরু হতো গানের আসর। তিনি ছোটবেলা থেকেই গান শুনতেন। তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চলে মেলা ও বিভিন্ন উৎসবে কয়েকটি গানের দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো। মেলায় গান শুনতে লোকে লোকারণ্য হতো। এগুলো তিনি দেখতেন এবং তার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে রামায়ণ শুনতেন। এখান থেকেই কুশানের প্রতি তার আকর্ষণ ও ভালোলাগা জন্মাতে থাকে। পরবর্তীতে তিনি তার গুরু মহেন্দ্র গোসাঁইয়ের কাছে গান শিখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তার লেখা পালা নিয়ে চর্চা শুরু করেন।
‘এক বছর শেখার পর আমি লক্ষ্মীপূর্ণিমায় কীর্তন গাইতে আদিতমারীর ভোদাই ইউনিয়নে যাই। এক মাস পর সেখানকার পাশের গ্রামে আমার গুরু গান গাইতে যান। গান শেষে লোকজন উনাকে বললেন, গোসাঁই, আপনার চেয়ে আপনার শিষ্য কৃপাসিন্ধুই ভালো গান গায়! সেই রাতেই তিনি পায়ে হেঁটে সোজা আমার বাড়ি আসলেন। আমাকে বললেন, ওখানে তো তোমার জয়জয়কার। কৃপাসিন্ধু, আমার জীবন সার্থক। বলে, তিনি গায়ের নামাবলি, হাতের চামর আমার হাতে দিয়ে বললেন, এখন থেকে তুমি গাইবে। আমি আর গান গাইব না।’ তার জীবনের স্মরণীয় এই স্মৃতি তিনি বললেন।
এরপর তিনি আর থামেননি। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের দিল্লিতে সার্ক ফোকলোর ফেস্টিবলে (SAARC-Folklore Festival-2007) তার নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের কুশানগান দল অংশগ্রহণ করেন। পরিবেশনাটি প্রভূত প্রশংসা অর্জন করে এবং বাংলাদেশের পক্ষে সুনাম বয়ে আনে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে দিল্লি ও লাকনাউতে পঞ্চম আন্তর্জাতিক রামায়ণ উৎসবে তিনি তার কুশানগান পরিবেশন করে অনেক সুনাম অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন রংপুর বেতারের পালাকার হিসেবেও কাজ করেছেন। গীদাল কৃপাসিন্ধু রায় ও কুশান গান নিয়ে অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদ আশরাফুল হাবিবের ‘কুশাণ গানের পরিবেশনারীতির বিবর্তনে গায়েন-অভিনেতার ভূমিকা’, সাইমন জাকারিয়ার লেখা ‘বাংলাদেশের লোকনাটক।’
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলা সংগীত ও লোকসংস্কৃতির বহু প্রখ্যাত শিল্পী ও স্রষ্টাকে নিয়ে প্রকাশিত ‘লেখালেখির উঠান’ সংকলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন শাহ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন, হাসন রাজা, বিজয় সরকারসহ আরও অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কৃপাসিন্ধু রায় সরকারের নামও স্থান পেয়েছে। তার জীবন, শিল্পচর্চা ও কুশানগানের ঐতিহ্য নিয়ে এখানে পৃথকভাবে আলাপচারিতা প্রকাশিত হয়েছে। খ্যাতির পরিসর ভিন্ন হলেও একই সংকলনে তাঁর শিল্পীজীবন ও লোকঐতিহ্য নিয়ে লেখা স্থান পেয়েছে।
কৃপাসিন্ধু রায় সরকার তার সৃজনশীলতা ও অসাধারণ পরিবেশন দক্ষতার মাধ্যমে বাল্মীকি ও কৃত্তিবাসী রামায়ণের আখ্যানকে কুশানগানের আসরে উপস্থাপন করেন। তিনি রামায়ণের কাহিনিকে সাধারণত ১৩টি পালায় বিভক্ত করে পরিবেশন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য পালাগুলোর মধ্যে রয়েছে রাম-সীতার জন্ম, রাম-সীতার বিবাহ, রামচন্দ্রের বনবাস, সীতা হরণ, বালি বধ, মহীরাবণ, তরণীসেন বধ, রাবণ বধ, লক্ষ্মণ শক্তিশেল, সীতা উদ্ধার ও অগ্নিপরীক্ষা এবং অশ্বমেধযজ্ঞ। সপ্তকাণ্ড রামায়ণ পরিবেশনে তার জুড়ি মেলা ভার। সংস্কৃত শ্লোক, মধ্যযুগীয় বাংলা, আধুনিক শুদ্ধ বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষার সুন্দর সমন্বয়ে তার পরিবেশনা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত, বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয়।
লোকসংস্কৃতির প্রতি তার দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক এবং কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন।
তবে কালের বিবর্তনে ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী এই কুশান গান। কমে গেছে কুশানের আসর, শিল্পী ও পৃষ্ঠপোষকতা।
একসময় কুড়িগ্রাম অঞ্চলে নারায়ণচন্দ্র দাস, হীরালাল গোঁসাই, মহেন্দ্র গোঁসাই, ভজেন্দ্র গীদাল, শ্যামল কুশানীর ও যজ্ঞেশ্বর গীদালের মতো শিল্পীদের ঐতিহ্য ছিল। এই দীর্ঘ উত্তরাধিকার এখন হারিয়ে যাওয়ার মুখে। তবে কৃপাসিন্ধু রায়ের সান্নিধ্যে তিনি অনেক শিষ্যদের কুশান গান শিখিয়েছেন। কিন্তু তার মতো কেউ তৈরি হতে পারেনি। এজন্য কৃপাসিন্ধু রায় সরকার একাই এখন উত্তরবঙ্গের কুশান গানের ‘সর্বশেষ পালাকার, দলপতি ও সাধক শিল্পী।’
তার ভাষ্য, ‘আমার বয়স হয়েছে। এখন আর আগের মতো দম নেই। কিন্তু তবুও আমি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত এই গান গাইতে চাই। আমি কুশান গানে সর্বস্ব দিয়েছি, এই গান আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। তাই কুশান গান নিয়েই আমি বেঁচে থাকতে চাই।’
রাজারহাট শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক ও লোকসংগীত শিল্পী নাজমুল ইসলাম বলেছেন, ‘কৃপাসিন্ধু রায় সরকার শুধু একজন কুশান গানের সাধক শিল্পী নন—তিনি উত্তরবঙ্গের বিলুপ্তপ্রায় কুশান গানের একজন জীবন্ত ইতিহাস এবং এই ঐতিহ্যের সর্বশেষ প্রহরী।’





