মিতা হক স্মরণ
আজ শুধু আঁখিজলে পিছনে চাওয়া

শিল্পী মিতা হক (৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬২—১১ এপ্রিল ২০২১)
মিতার কণ্ঠে শোনা আমার প্রথম গান ছিল,
‘আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না, ভালোবাসায় ভুলাবো
আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো, গান দিয়ে দ্বার খোলাবো।’
গলার স্বরে মাধূরী ঝরে ঝরে পড়ছিল। সঙ্গে শুদ্ধ উচ্চারণে এবং স্পষ্ট বাণীতে গানটি যেন একেবারে মূর্ত হয়ে উঠল মুহূর্তে। মিতার কণ্ঠে ওই গানে এমন কিছু ছিল— যেন ও ওর-ই কথা বলছে! এতটাই বিশ্বাস্য ছিল তার নিবেদন।
এতো তৈরি, সুরেলা গলা! এ ধরনের তীক্ষ্ণ এবং সুরেলা কণ্ঠ হলেই আমরা ধরে নিই; এই গলা নজরুলগীতির জন্য উপযুক্ত বা এই কণ্ঠে নজরুলগীতি ভালো ফুটবে! এই ধারণাকে রীতিমতো চ্যালঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মিতা হক রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে এলো এবং জয় করে নিল আপামর বাঙালির মন। রবীন্দ্রনাথের গান যে স্পষ্ট করে, অর্থ অনুধাবন করে গাইবার বিষয়, এই চর্চা মিতা হক তার পরিবারের কাছ থেকেই পেয়েছিল। ওর মামার বাড়িতেও গানের চর্চা ছিল। তবে সংগীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হকের ভাইয়ের মেয়ে হওয়ার কল্যাণে মিতা হকের রবীন্দ্রসংগীত চর্চার বিষয়টি খুব সহজ হয়ে এসেছিলো ওর জীবনে। প্রথাগতভাবে ছায়ানট বা শান্তিনিকেতনে গান না শিখেও যে মিতা হক রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে নিজেকে উচ্চ আসনে বসাতে পেরেছিলো, তার পেছনে ছিলো সংগীতের প্রতি তার নিষ্ঠা এবং বিরামহীন চর্চা।
মিতা হকের আয়তচক্ষু, নির্মল হাসির মধ্যে একটা লাবণ্যতো ছিলোই, স্বভাবে একটা 'কই যেন ছেলেমানুষি উচ্ছ্বাস'ও ছিলো। ছিলো খোলা একটি মন। ঠি ক এই জায়গাটিতেই ওকে আমার ভালো লেগেছিলো। মন খোলা না হলে এমন গান হয়? মনে পড়ছে বহুদিন আগে কলকাতার 'দেশ' পত্রিকায় কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকারের কথা। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ' ভালো গাইতে হলে ভালো মন লাগে। মন দিয়ে গাইতে হয় তো।' এই যে গানের সঙ্গে মনেরও চর্চা করতে হয়, এ বোধ কজনের থাকে!
তারও আগে, যখন ওর কোনো গান শুনিনি, দেখতাম কোনো অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে বাংলা একাডেমির বইমেলার বিকেলগুলোতে যে অনুষ্ঠানগুলো হতো- সেখানে দেখতাম, প্রায় আমারই বয়সী একটি অস্থির, চঞ্চল মেয়ে চড়ুইপাখির মতো এদিক-ওদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে সংকোচহীন।
এই যে কথাগুলি লিখলাম, মিতা থাকলে সাহস হতো কিনা জানি না। স্পষ্টবাদী মিতা হয়তো ধরে বসতো, হয়তো বলতো, 'এই শীলু, কী সব লেখো!' মিতাকে আমি সমীহ করতাম। সমীহ করতাম এ কারণে নয় যে, মিতা আমার বড় ভাশুর খালেদ খানের স্ত্রী। সমীহ করতাম কারণ যে কাজটি সে করে, করেছে সারাজীবন, সেখানে কোনো ফাঁকি দেয়নি বলে। ধ্যানমগ্ন হয়ে থেকেছে। বিশেষ করে গানে এবং প্রেমে। সে সন্তানের প্রতি হোক, ভাইয়ের প্রতি হোক, জীবনসঙ্গী, কী সংসারের প্রতি।
মানুষকে প্রশংসার ব্যাপারে ছিলো অকৃপণ। এই তো মাত্রই কয়েকদিন আগে, মিতা আমাকে বলেছিল, 'তোমার একটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগে।' আমি হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিলাম , কী বলতো ?
ও কোনো ভণিতা না করে বলেছিল, 'তোমার পড়াশোনা। তুমি বেশ নানাকিছু পড়। খোঁজ-খবর রাখো। আমার কেন যেন পড়াটা হয় না। মন বসাতে পারি না।' আমার সাহিত্যপ্রীতির খোঁজখবর ওর কাছে ছিলো। ও জানতো আমার কণ্ঠে সুর নেই অথচ প্রাণে বিপুল তরঙ্গের মতো ঢেউ খেলে সুর। 'গীতবিতান' তাই আমার কাছে পাঠের, গীত হওয়ার নয়! মিতা শিক্ষা নিয়েছিল জীবন থেকে, মেধাবী সঙ্গ থেকে। ওয়াহিদুল হক, সনজীদা খাতুন , শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মতো সংগীতজ্ঞদের কাছ থেকে, আর আড্ডা থেকে! কত কত বিজ্ঞজনের সঙ্গলাভ করেছে তার নিজেরই গুণে, আর পারিবারিক কারণে, তার ইয়ত্তা নেই।
আমাদের অনেক কমন বন্ধু ছিলো। একে অপরকে তাই বিয়ের আগেই মোটামুটি চিনতাম। কিছুটা জানতাম। আমরা যে খুব পরস্পরকে ভালোবাসায় আকড়ে ছিলাম তা নয়। তবু কখন যে পরস্পরের প্রতি কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিলাম, নিজেরাও জানি না!
তখন নিউ ইয়র্কে থাকি। ১৯৯৭ সাল। আমাদের কন্যা বসুধা এসেছে সদ্য আমাদের জীবনে । মিতা আমেরিকা গিয়েছিল সে সময়টায় গানের নিমন্ত্রণে। বসুধার দাদার বাড়ির মধ্যে প্রথম ও বসুধাকে দেখেছে, ভীষণ উচ্ছাস ছিলো সে দেখায়। বারবার বলেছিলোও সে কথা। ওকে নিয়ে বোনের বাসা রকল্যান্ড কাউন্টিতে গিয়েছিলাম। আড্ডায়, গানে চমৎকার সময় কাটিয়েছিলাম। এসবই সুখস্মৃতি।
মিতা ধীরে ধীরে যেন বুঝতে পেরেছিলো, আমার ওপর আস্থা রাখা যায়। মেয়ে জয়িতার পানচিনির সময় বলেছিলো, বেশি কাউকে বলছি না, তুমি কিন্তু থাকবে। থেকেছিলাম। বিয়ের পরে নতুন জামাইকে নিয়ে জয়িতা ওর দাদার বাড়ি যাবে ( যেখানে কেউ থাকে না। আমাদের শ্বাশুড়ি মাঝে মাঝে যেতেন, যতদিন বেঁচে ছিলেন) তখনও মিতা বলল, 'শোনো, আমার শরীরটা ভালো না, যেতে পারছি না। তুমি যাও প্লিজ, বেয়াইন প্রথম যাচ্ছেন' আমি খুশি মনেই গিয়েছিলাম। মিতাও খুশি হয়েছিলো। মিতা মানুষকে আপ্যায়ন করতে খুব ভালোবাসতো। রান্নার হাত ছিলো দুর্দান্ত । চটপটে, বুদ্ধিমতী, হাস্যমুখ মিতার মানুষের সঙ্গে সহজে মেশার এক আশ্চর্য গুণ ছিলো। ছিলো শব্দটি লিখতে গিয়ে ভীষণ মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আসলে মিতার মতো শিল্পীরা কখনও অতীতকাল হয় না। তাঁদের ঐশ্বর্যভরা জীবন নিয়ে সর্বদা বর্তমান।
লিখতে লিখতে মনে পড়ে গেল ওর প্রথম ক্যাসেটের একটি গান।
'ওদের সাথে মেলাও যারা চরায় তোমার ধেনু,
তোমার নামে বাজায় যারা বেণু।
পাষাণ দিয়ে বাঁধা ঘাটে এই-যে কোলাহলের হাটে
কেন আমি কিসের ডাকে এনু।
কী ডাক ডাকে বনের পাতাগুলি, কার ইশারা-তৃণের অঙ্গুলি!
প্রাণেশ আমার লীলাভরে খেলেন প্রাণের খেলাঘরে,
পাখির মুখে এই যে খবর পেনু।'
পূজা পর্যায়ের এই গানটি ওর স্বতস্ফূর্ত উচ্চারণে, অপূর্ব সুরেলা কণ্ঠে শুনে কী অসম্ভব ভালো যে লেগেছিলো, এখনও মনে করতে পারছি।
আমি গানের মানুষ নই। গানের একজন নিবিষ্ট শ্রোতা মাত্র। মিতা হকের গান নিয়ে কথা বলার মতো অনেকেই রয়েছেন। আমি বলছি একান্ত, একজন ঘরের মিতার কথা। তুলে ধরতে চাইছি মিতার বিশ্বাস এবং জীবনাচরণকে। বলতে চাইছি আমার দেখা একজন মানবিক মিতা হকের কথা। একজন মানুষ যখন তার সু-কর্মে অনেক উপরে উঠে যায়, তার পরিপার্শ্বেরও একটি ভূমিকা থাকে । যেমন পেয়েছিল মিতা হকও। বিয়ের আগে যেমন বাবার বাড়ি থেকে, বিয়ের পরে তেমনি শ্বশুরবাড়িতেও পেয়েছে বিপুল এক আনন্দময় এবং সঙ্গীতময় পরিবেশ।
এক যুগ আমেরিকায় কাটিয়ে আমরা দেশে ফিরেছি ২০০৯ সালে। তারপর থেকে আমাদের জীবনটা অনেকটাই মিতাদের বাসাকেন্দ্রিক ছিলো। বছরের বিশেষ কয়টি দিন আমরা ওদের বাসায় যেতামই। বিশেষ করে খালেদ খান, মিতা, জয়িতার জন্মদিন, দুই ইদ এবং পহেলা বৈশাখে। সারাদিন হৈচৈ করে, শুয়ে-বসে গল্প করে, মজার সব খাবার খেয়ে যার যার বাসায় ফিরে যেতাম। জয়িতার বাবা চলে যাওয়ার পরে আস্তে আস্তে সেটা কমে যায়।
এইসব পারিবারিক জীবনের বাইরে আমি ক্রমশ এক অন্য মিতাকেও যেন আবিষ্কার করি। পুরোদমে সংসার করেও সম্পূর্ণ একটি শিল্পীর জীবনযাপন করেছে মিতা হক। আগেই বলেছি এখানে পরিবারের সদস্যদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার কথা।
এক সময় ছায়ানট-এর রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগের প্রধান এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলো মিতা হক। সম্মিলন পরিষদের হয়ে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে।
ওয়াহিদুল হকের যোগ্য শিষ্য মিতা হক গানের ব্যাপারে নিজের কাছে এতটাই দায়বদ্ধ ছিলো যে কোনো বাঁধাতেই পিছু হঠত না। যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ওঁকে প্রতিবাদ করতে দেখা যেত।
ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে গানের আমন্ত্রণে যখন তখন। ধীরে ধীরে সে সব কমে এসেছিলো, তাঁর জীবনসঙ্গী অভিনেতা খালেদ খান অসুস্থ হওয়ার পর থেকে।
মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে মিতা হকের ছিলো স্বচ্ছ অবস্থান। কোনওভাবেই এখানে সমঝোতায় বিশ্বাস করত না। মৌলবাদের বিপক্ষে সর্বদাই ছিলো সোচ্চার। অনেক সাক্ষাৎকারে সে কথা স্পষ্ট বলেছে।
অনুষ্ঠানে গানের বাইরে যদি কোনো বিষয়ে কথা বলার থাকতো, আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনতাম। স্পষ্ট উচ্চারণ, সাবলীল বলার ভঙ্গি, বিষয়ের গভীরতা, বিশ্বাসের গভীরতা- সব মিলিয়ে ওর কথা বলাটা খুব বিশেষ হয়ে উঠতো।
এখন একটু বেশিই ব্যক্তিগত একটি ঘটনা শেয়ার করতে ইচ্ছে করছে। আমরা পরস্পরের সাজসজ্জা এবং শাড়ির ভক্ত ছিলাম। কোনো এক উৎসবে আমার খুব পছন্দের একটি তাঁতের শাড়ি উপহার দিই ওঁকে। সেই শাড়ি পরে এক বিশেষ দাওয়াতে গিয়েছিল, এরপর দেখা হলে প্রথমেই সে কথা খুব খুশি মুখে জানিয়েছিল। আমি তো তাজ্জব! বলে কী! এতটা সাধারণ ছিলো ও সাজ-সজ্জা, পরিধানে। তবু যখন বুদ্ধিদীপ্ত সুন্দর চোখ দুটিতে ঘন কাজল আর একটি বড় টি প পরত, মুহূর্তে বিশেষ হয়ে উঠত ওর চেহারা। আমার মনে হয়, মানুষের সাথে সহজ ব্যবহারেই ছিলো ওঁর আসল সৌন্দর্য। সহজ হওয়াই যে সবচেয়ে কঠিন! পরিবারের সব বাচ্চারাও ছিলো ওর খুব প্রিয়। আমাদের কন্যা বসুধাকে খুব আদর করত। ওর কণ্ঠে ইংরেজি গান শুনতে পছন্দ করত। আফসোস হয় মিতার কাছে বসুধার কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখার সুযোগ হয়নি বলে।
বাবা- মায়ের একমাত্র কন্যা হিসেবে খুবই আদরে মানুষ হয়েছে মিতা। ছোটো ভাই রাজনের প্রতি ওর যে ভালোবাসা, স্নেহ, কর্তব্যবোধ দেখেছি তা এক কথায় বিরল। শারীরিক এবং মানসিকভাবে রাজন একজন বিশেষ মানুষ। ভাইকে যে সম্মান এবং আদরের সাথে মিতাকে সার্বক্ষণিকভাবে সঙ্গ দিতে দেখেছি, তা রীতিমতো শিক্ষণীয়। যেখানেই গেছে, চেষ্টা করেছে ভাইকে নিয়ে যেতে। গত কয়েক বছরে একে একে চিরতরে চলে গেছে কাছের মানুষ। বাবা, মা, স্বামী, শ্বাশুড়ি । অসীম ধৈর্য নিয়ে জীবনের সঙ্গে লড়ে গেছে শেষপর্যন্ত । পাশে সাহস হয়ে ছিলো একমাত্র সন্তান জয়িতা। যে নিজেও একজন সঙ্গীতশিল্পী। ছিলো জয়িতার স্বামী মোস্তাফিজ । আরও ছিলো কয়েকজন কাছের আত্মীয়স্বজন।
অনেকদিন ধরেই কিছু শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলো। চিকিৎসা চলছিলো নিয়মিত। তবে ও একটু ভেঙে পড়ছিলো, টের পেতাম। মাসখানেক আগে আমাদের বন্ধু টুটুলসহ আমি আর শাহীন গিয়েছিলাম ওদের কেরাণিগঞ্জের অসাধারণ সুন্দর বাড়িটিতে। গাছপালা ঘেরা, বাড়ির পাশে খাল, ছাদে উঠলে দেখা যায় দিগন্তবিস্তৃত খেত- সব মিলিয়ে অপার্থিব সৌন্দর্য । শহরের গা- ঘেঁষা, অথচ শহর নয়, নেই শহরের ভিড় ভাট্টা, কোলাহল। একটা শান্তির জীবনযাপন। ঐ শান্তির নীড়ে ও মনে হয় শান্তিতেই ছিলো।
শুঁটকি পছন্দ করতো বলে ওর কথা ভেবে একটু যেন বেশিই যত্ন করে রান্না করে নিয়ে গেলাম। লক্ষ্য করলাম, খাওয়ার প্রতি তেমন আর আগ্রহ নেই। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এত বেশি নিষেধের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলো যে কিছুটা ক্লান্তও বোধকরি হয়ে পড়েছিলো। তাই বলে এত তাড়াতাড়ি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যাবে ভাবিনি।
করোনা কতজনকে কেড়ে নিলো এখন আর হিসেব রাখতে পারি না। এই লেখা লিখতে লিখতেই শুনলাম প্রিয় কবি, প্রিয় গদ্য লেখক শঙ্ঘ ঘোষ আর নেই! জানতাম করোনায় আক্রান্ত, তবু ভীষণ হাহাকার উঠলো মনে। জানি না কী আছে শেষে।
জয়িতাকে কী বলবো! এই শোকের কোনো স্বান্ত্বনা হয় না। জয়িতার বাবার মৃত্যুর পরে, মা- মেয়ের সংসার চলছিলো সংসারের নিয়মে। হাসি-কান্নায় জড়াজড়ি করে। সে সংসারে আবার নেমে এলো বেদনার মেঘ। আমরা সবাই আদর নিয়ে বসে আছি অসাধারণ মানবিক, মেধাবী প্রিয় জয়িতার জন্য। তবু মায়ের আদরের মতো কিছু কী হয়! আর সে আদর যদি হয় মিতা হকের মতো হৃদয়বান এবং প্রাণবান একজন মানুষের! যে প্রেম শুধু নিতে নয়, দিতেও জানতো অফুরান!
এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মিতা হক বলেছিলো, 'আমি স্বপ্ন দেখি ভালোবাসা-মুখর এক পৃথিবী। যেখানে মানুষ ভীষণভাবে মানুষকে ভালোবাসবে। মানুষের দ্বারা অন্য কোনো মানুষের অনিষ্ঠ হবে না।' বলেছিল, 'একা বেঁচে সুখ নেই। সবাইকে নিয়ে বাঁচতে হয়।'
সারাজীবন সেটারই চর্চা করে গেছে । মিতা হকের গানের প্রতিষ্ঠান 'সুরতীর্থ' ছিলো তাঁর স্বপ্নের তীর্থস্থান। শিক্ষার্থীরা এখানে এসে নিজের ঘরে বসে গান শেখার আরাম পেতো। এতটাই আন্তরিক ছিলো সুরতীর্থ-এর পরিবেশ। সফল সংগঠক মিতা হকের বাঙালি সংস্কৃতি এবং অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য লড়াই ছিলো প্রতিদিনের ।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে পেয়েছে একুশে পদক, শিল্পকলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কার, ঢাকা এবং কলকাতা থেকে বেড়িয়েছে অনেক ক্যাসেট, সিডি, যেখানেই বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা আছে, সেখানে ওর গানও আছে-এসব খবর সবাই হয়তো জানে। যেটা অনেকেই হয়তো জানে না, মিতা হক ছিলো একেবারেই সহজ-সুন্দর অথচ তীক্ষ্ণ মেধার এক উজ্জ্বল নারী। যে আপোষহীন। অদম্য। দেশপ্রেমিক।
মিতা হকের কণ্ঠে গীত স্বদেশ পর্যায়ের গানগুলোতে যেন সেই মিতা হককেই দেখতে পাই।
' আমায় বলো না গাহিতে বলো না'
'আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে'
'আমি ভয় করব না ভয় করব না'
'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি'
মিতা হকের গান গাওয়ার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো একেবারে নিমগ্ন হয়ে, খাতার দিকে না তাকিয়ে গাওয়া। ধ্যানমগ্ন হয়ে গাইলে শ্রোতার চিত্তও ততটাই নিবিষ্ট হয়ে ওঠে, ও জানতো। গান মরমে পৌঁছানোর সকল রকম যাদুবিদ্যা মিতা হকের জানা ছিলো।
ওকে ভোলা কঠিন।










