স্মরণে আলী আকবর রুপু

আলী আকবর রুপু। ছবি: সংগৃহীত
আমার সংগীতাঙ্গনে আগমন ১৯৮৮ সালে। আমার লেখা প্রথম গান গেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। দ্বিতীয় গান নাসিম আলী খান। তার পর থেকে দুই বছর জুতার তলা ক্ষয় করে ফেলেছি স্টুডিও পাড়া, শিল্পী ও সুরকারদের পেছনে ছুটতে ছুটতে। কিন্তু কোনো গান রেকর্ড হওয়া তো দূরের কথা, গান করবেন—এ আশ্বাসও কেউ দেননি।
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্বে মাস্টার্স করছি। প্রতিদিন ক্লাস শেষ করে বন্ধুরা ছুটত টিএসসি অথবা মল চত্বরে আড্ডা দিতে, আর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাস ‘কিঞ্চিৎ’–এ (রেজিস্ট্রার ভবন টু পীরজঙ্গী মাজার) চড়ে মৌচাকে এলে নেমে পড়তাম। সেখান থেকে হেঁটে বিজয়নগরের সারগাম স্টুডিওতে। হাতে গানের ডায়রি। সারগামটাই ছিল তখন অডিও ক্যাসেটের গান রেকর্ডিংয়ের ব্যস্ততম স্টুডিও। প্রতিদিনই ওই সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী, সুরকার ও মিউজিশিয়ানদের আড্ডাস্থল ছিল এই সারগাম। অপেক্ষায় থাকতাম কোনো শিল্পী বা সুরকারের। কাউকে পেলে ডায়রি বাড়িয়ে বলতাম, আমি গান লিখি। আমার লেখা দুটো গান বেরিয়েছে। একটি আইয়ুব বাচ্চু, অন্যটি নাসিম আলী খান গেয়েছেন। তারাও জানতে চাইতেন, কোন গান। বলতাম বাচ্চু ভাইয়ের ‘কাল সারা রাত তোমারই কাঁকন যেন কানে কানে কানে রিনিঝিনি বেজেছে', আর নাসিম ভাইয়ের ‘পথে যেতে যেতে খুঁজেছি তোমায় আমি'। সবাই বলতেন, ও তাই! হ্যাঁ দুটো গানই তো বিখ্যাত। তারপর ডায়রি থেকে বেছে বেছে অনেকেই গান নিয়েছেন। কিন্তু সেই গান আর আলোর মুখ দেখেনি।
এই স্টুডিওতেই যাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, সেই তালিকাটা দীর্ঘ। আইয়ুব বাচ্চু (বাচ্চু ভাই আমার গান গেয়েছিলেন, কিন্তু আমার সঙ্গে তার মুখোমুখি দেখা হয়নি তখনো), খালিদ হাসান মিলু, শেখ ইসতিয়াক, নীলয় দাস, খালিদ (চাইম), নজরুল ইসলাম বাবু, প্রণব ঘোষ, আলী আকবর রুপু, আশিকুজ্জামান টুলু, বিপ্লবসহ আরও অনেকে।
এর মধ্যে একদিন রুপু ভাই তার মালিবাগ সার্কুলার রোডের ডক্টর গলির বাড়িতে যেতে বললেন। এক বিকেলে গেলাম। পরম স্নেহে তিনি আমাকে বাড়ির ভেতর নিয়ে বসালেন। যেন একজন সজ্জন মহানুভব মানুষের সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য আমার হলো। এরপর যে আতিথেয়তা পেলাম, তাতে মনে হলো ভাবি (রুপু ভাইয়ের স্ত্রী নার্গিস আকবর) রুপু ভাইয়ের চেয়ে এক কাঠি ওপরে, এতটাই ভালো মানুষ। সেদিন রূপু ভাইয়ের সঙ্গে বসে প্রথম যে গানটি লিখেছিলাম, সেটি গেয়েছিলেন মুরাদ। গানের কথা ছিল ‘আমার বুকে কান পেতে একদিন একজন শুনেছিল হৃদয়ের স্পন্দন, আজ সে বহুদূরে ভুলেছে আমায় দেখেনি দুচোখের ক্রন্দন’।
সেই শুরু। যখন পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন হাতে গোনা যে কজন আমাকে দাঁড়ানোর অবলম্বন হয়েছিলেন, রুপু ভাই তাদের একজন। মনে পড়ে, একবার আমি ভীষণ বুকের ব্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়লাম। রুপু ভাই খবর পেয়ে ছুটে এলেন। নিজে ড্রাইভ করে আমাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো আপন করে নিয়েছিলেন।
রুপু ভাইয়ের সঙ্গে আমার বেশি কাজ হয়েছে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে। তার সুরে যে গানগুলো শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল, এর মধ্যে অন্যতম শাকিলা শর্মার গাওয়া ‘তোমাকে দেখলেই মৌনতা ভুলে যাই', কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া ‘এক অনিশ্চয়তা তোমাকে পাওয়া না পাওয়ার', মৌটুসির গাওয়া ‘বারেবারে পোড়া বাঁশি'।
ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী প্রথমবারের মতো তার পুরো পরিবার নিয়ে ‘ইত্যাদি'তে একটি গান করেছিলেন, ‘কবিতার মতো মেয়েটি, গল্পের মতো ছেলে, উপন্যাস হবে সহধর্মিনী। ইত্যাদিতেই প্রচারিত হয় রুপু ভাইয়ের সুরে বেবী নাজনীনের গাওয়া ‘দুঃখ পেলে সইতে পারে যে প্রেমে পড়লে কইতে পারে যে', সামিনা চৌধুরীর গাওয়া ‘জানতে চেয়ো না কোন সে বেদনাতে, কিসের টানে এই মন শুধু কাঁদে', ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী, এন্ড্রু কিশোর, কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া ‘মানুষেরই আছে মনুষত্ব, এ কথাটি চীরকাল সত্য'।
এ ছাড়া আরও কয়েকটি গানের কথা মনে পড়ছে, ‘ইত্যাদি’তেই সাবিনা ইয়াসমীন ও মিতালী মুখার্জির গাওয়া ‘প্রতিদিন সুন্দর ছড়িয়ে থাকে’, আজম খানের গাওয়া ‘দূরে বহু দূরে তুমি চলে গেলে আর এলে না’ এগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আজ আমাদের প্রিয় গুণী সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলী আকবর রুপু ভাইয়ের জন্মদিন। কিস্তু তিনি পৃথিবীতে নেই। আমি শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করছি। আর ওপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করছি, রুপু ভাই যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। আপনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।








