স্মৃতির অ্যালবামে নব্বইয়ের দশকের বিজ্ঞাপন

কয়েকটি বিজ্ঞাপনের স্থিরচিত্র
টিভিতে অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিজ্ঞাপন বিরতিও উপভোগ করতেন দর্শক। সোনালি সময়ের সেই স্মৃতিভরা বিজ্ঞাপন নিয়ে লিখেছেন পান্থ আফজাল
গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে চলতি শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন মানেই যেন এক জাদু। ‘যেখানে আনন্দ, সেখানে কোকাকোলা’— এই জিঙ্গেল তখনকার প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হতো। সেই টিভি বিজ্ঞাপনে সিনেমার খলনায়ক জাম্বু হয়ে উঠেছিলেন রূপকথার দৈত্য, যিনি গাড়ি চাইতে আসা তরুণকে বলছেন, ‘আগে কোকাকোলা খা!’ আর দেশের মানুষ? তারা যেন সত্যিই তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠেছিল এই কোমল পানীয়র বোতলে থাকা পুরস্কারের আশায়। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কোকাকোলা কিনে ছিপি স্ক্র্যাচ করে দেখার উত্তেজনা আজও অনেকে ভুলতে পারেন না।
আরেক দিকে ছিল পেপসি। সে সময় আইয়ুব বাচ্চু মডেল হয়েছিলেন এই কোমল পানীয়ের। শিক্ষকের কানমলা আর সংলাপ ‘তুমি কোনোদিনও মিউজিশিয়ান হতে পারবে না’ খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। অন্যদিকে জেমসের মডেল হয়ে অভিনীত ‘একটা পেপসি?’ ও ছিল তুমুল জনপ্রিয়। তবে তরুণ-তরুণীর হাসি, তারুণ্যের দুষ্টু আবেদনে ভরপুর গায়ক শুভ্রদেবের মডেল হিসেবে ‘পেপসি আর আছে কি?’— সব মিলিয়ে ছিল নিখাদ মজা। ‘লাইফ ইজ কুল, লাইফ ইজ পেপসি’-এ ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। এই কোমল পানীয়র বিজ্ঞাপনগুলো যেন জীবনের গতি, প্রেম আর উৎসবের প্রতীক ছিল। তবে ‘আর সি কোলা’র নোবেল-রেশমীর ‘তোমার জন্য মরতে পারি ও সুন্দরী’ জিঙ্গেলটিও অনেকের স্মৃতিতে এখনো সতেজ।
বিটিভির পর্দায় তখন সকাল-বিকাল ঝলমল করত রেড কাউ, ডিপ্লোমা, অ্যাংকর মিল্কের বিজ্ঞাপন। ‘যে দেশে গরু খায় বারোমাস সবুজ ঘাস...’ এই বাক্য শুনলেই চোখে ভেসে উঠত নিউজিল্যান্ডের সবুজ প্রান্তর। ছোটবেলার চোখে সেটি ছিল শুধুই দুধ আর গরুর দেশ যেন! আর ‘আম্মু তুমি লক্ষ্মীইইই’— অ্যাংকর মিল্কের সেই মিষ্টি সংলাপ তো আজও বাঙালি মনে শৈশবের স্মৃতিকাতরতায় দোলা দেয়।
চায়ের কথা না বললেই নয়। ‘ফিনলে চা, আসল চা’ আবুল হায়াতের মুখে উচ্চারিত এই সংলাপ বিটিভির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। বিজ্ঞাপনের শেষে তার মেয়ের প্রশ্ন— ‘আসল চা কেন?’ এর উত্তরেই যেন ফুটে উঠেছিল এক নিখাদ নির্মাণশৈলী। আফসানা মিমি যখন একই সংলাপে হাজির হলেন, তখন চায়ের ঘ্রাণ যেন ছড়িয়ে পড়েছিল পর্দা জুড়ে। অন্যদিকে ‘এইচআরসি চা’ বা ‘ডানকান চা’ বিজ্ঞাপনগুলোও ছিল তরুণ প্রজন্মের টি-ব্রেকের সঙ্গী। জিঙ্গেলের শব্দে, চা পাতার রঙে আর হাসিতে মিলেমিশে যেত এক টুকরো বিকাল। খ্যাতিমান গায়ক নচিকেতার কণ্ঠে একটা বিজ্ঞাপন ছিল ইস্পাহানি মির্জাপুর চায়ের। অসাধারণ ছিল সেই বিজ্ঞাপন, মনকাড়া ছিল জিঙ্গেলের কিছু কথা। ‘বৃষ্টিদিন নাও ভাসে...’ বিজ্ঞাপনটি যেন এক গল্প। তাতে যেন ভেসে উঠেছিল বৃষ্টিদিনের কাহিনি— নৌকায় েচপে মাছ ধরা, বর্ষাদিনে বসার ঘরে চায়ের সঙ্গে আড্ডা ইত্যাদি। সেই আবেগঘন জিঙ্গেল আজও অনেকের মনে উঁকি দেয়। মনির খান শিমুল ও রিয়ার অভিনীত ইস্পাহানির বিজ্ঞাপনটিরও সমাদৃত হয়েছিল।
সেই দশকের বিজ্ঞাপনের স্মৃতিচারণা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে, যদি মিতা নূরের সেই ‘আলো আলো বেশি আলো’র অলিম্পিক ব্যাটারির কথা না বলি। আরেকটি ছিল ফিলিপসের বিজ্ঞাপন; সেই যে, ‘ও মানিক কী বাত্তি লাগাইলি?’ ফেরদৌস ওয়াহিদের খুশখুশে কাশি দূরকারী ম্যাটসিলস লজেন্সের টিভি বিজ্ঞাপনটিও পেয়েছিল জনপ্রিয়তা। কসমেটিকসের দুনিয়ায় তখন রাজত্ব করছিল ম্যানোলা। ‘ম্যানোলা মানে টলমল শিশিরের লাবণ্য’— এই সুরেলা বিজ্ঞাপন যেন সকালবেলার শিশিরের মতোই কোমল! পরে এলো কেয়া কসমেটিকস আর নোবেল-মৌ জুটির হাত ধরে ভালোবাসার সংজ্ঞা পেল নতুন রূপ। ‘ভালোবাসা মানে তুমি আর আমি’— এই সংলাপ শুধু বিজ্ঞাপনের নয়; হয়ে উঠেছিল এক প্রজন্মের প্রেমের প্রতীকও। কিউট রোমান্স ট্যালকম পাউডারের সুমনা হকের কণ্ঠে সেই ঐতিহাসিক জিঙ্গেল ‘তুমি ছাড়া আমি যেন আমি নই’ আজও কেউ কেউ আনমনে গুনগুন করেন। মেরিল বেবি পাউডারের ‘সোনা জাদু মলি লে’ কিংবা রিয়ার মডেলিংয়ে ‘মেরিল লিপজেল’-এর বিজ্ঞাপনও আজও অমলিন।
সে সময়ে রোমানা পেইন্টসের বিজ্ঞাপনগুলোও ছিল তুমুল আলোচিত। ‘সময় তো বদলায়, বদলায় মন’— এই জিঙ্গেল শুধু রঙ নয়, সময়ের বদলের এক কাব্যও ছিল। পেইলাক বা অ্যাকুয়া পেইন্টসের বিজ্ঞাপনগুলোয় জীবনযাপনের গল্প শোনানো হতো, যেখানে দেয়াল মানে শুধু দেয়াল নয়, একটা স্বপ্নের ক্যানভাসের ছড়ানো হতো বার্তা। বার্জার পেইন্টের বিজ্ঞাপনে মনির খান শিমুল আর লামিয়া তাবাসসুমের অভিনয় কিংবা রক্সি পেইন্ট, মোল্লা সল্ট, জুঁই নারিকেল তেল (‘আমার মন এখনো হারায়’), নিপ্পন টিভি (‘নিপ্পন হাজির’), ডিপ্লোমা গুঁড়ো দুধ, ফিনলে চা, লিপটন চা, বম্বে পটেটো স্টিকস (‘একা একা খেতে চাও, দরজা বন্ধ করে খাও’), স্টারশিপ কনডেন্সড মিল্ক, হুইল (‘আমার বাংলাদেশ’), আজাদ প্রোডাকস, ক্যামেলিয়া সাবান, শাকিলা জাফর অভিনীত লাক্সের বিজ্ঞাপন, গোয়ালিনী, কুল শেভিং, তিব্বত ল্যাদার শেভিং ক্রিম, শ্রাবণী অভিনীত হেনোলাক্স, মেরিল স্প্ল্যাশ সোপ, তিশা-রুমি অভিনীত সিটিসেলের ‘পালাবি কোথায়?’, ড্যানিশ কনডেন্স মিল্কসহ অনেক বিজ্ঞাপন জনপ্রিয় হয়েছিল। তা ছাড়া কে ভুলতে পারে ‘ইকোনো বলপেনের বিজ্ঞাপনের কথা? ‘যুগের সাথে চলো, ইকোনো লিখে ভালো’— এই সংলাপ শুনলেই হাত চলে যেত কলমের দিকে। চিত্রনায়ক জাফর ইকবালের ‘বলপেন ক্যাম্পাস’ বিজ্ঞাপনও সে সময়ের স্কুলছাত্রদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছিল।
বিটিভির শুক্রবারের বাংলা সিনেমা চলাকালে নন্দিনী, পাকিজা, সুন্দরী, জনী প্রিন্ট, বৌ রানী প্রিন্ট শাড়ি (‘রানী রানী বৌরানী’)— এসব শাড়ির বিজ্ঞাপনের জৌলুসে চোখ ঝলসে যেত! চম্পা, বিজরী বরকতুল্লাহ, দিতি, শাবনূর, মৌসুমী, বিপাশা প্রমুখ ছিলেন টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের মডেলিংয়ের যেন একেকজন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী! মডেলের আঁচল উড়ে যেত, জিঙ্গেল বাজত, আর দর্শকের মন ভেসে যেত রঙের ঢেউয়ে। সঙ্গে সুমনা হকের সেই মিষ্টি জিঙ্গেল।
সাদিয়া ইসলাম মৌ ও আদিল হোসেন নোবেল ছিলেন নব্বইয়ের দশকের টিভিসি মডেলিং রাজা-রানী। তাদের পর্দায় দেখা মানেই ছিল স্টাইল, ক্লাস আর চোখে পড়া সৌন্দর্য। সঙ্গে ছিলেন মনির খান শিমুল, তানিয়া আহমেদ, ফয়সাল আহসান, তানভীন সুইটি, পল্লব চক্রবর্তী, ফারজানা চৌধুরী রিয়া, সাব্বির আহমেদ, রোমানা খান, পাপ্পু (মোল্লা সল্ট), স্মৃতি ফাহমি (লেমন ডিউ), ফারিয়া, লামিয়া, ঈশিতা, লামিয়া, জারা, সোনিয়া— যাদের ভঙ্গিমা ও হাসি আজও দর্শকের মনে রয়ে গেছে। তখন ‘বাটা পাপা’ গানের তালে তালে সবাই নাচত। আর শিশুদের কাছে প্রিয় ছিল আলোজ্বলা কেডসের ‘জাম্প জাম্প জাম্প কেডস’-এর বিজ্ঞাপন। কেউ রান্নাঘরে নতুন লবণ এনে স্ত্রীকে অবাক করছে (‘মধুমতী লবণে আছে আয়োডিন’), কেউ ফ্ল্যাট কিনে আনন্দে বলছে— ‘সুন্দর বাড়ি হলো, এবার সুন্দর দেখে একটা বউ আন’, কিংবা ‘এই যে শোনো! ব্রিজের কন্ট্রাক্টটা পেয়ে গেলাম’, অথবা ‘বাড়ি! আমার জন্য বাড়ি!’ বলা যায়, তখনকার বিজ্ঞাপনগুলোয় জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-বাসনা— সবই ছড়িয়ে পড়ত দারুণ নান্দনিকভাবে।




