নির্দেশনাই আমার জায়গা

‘গোলমাথা আর চোখামাথা’র মহড়ায় সৈয়দ জামিল আহমেদ - স্পর্ধা
নাট্যনির্দেশক ও শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি রয়েছে সৈয়দ জামিল আহমেদের। দীর্ঘ ৪২ বছর পর মঞ্চে আবারও অভিনয় করতে দেখা যাবে তাকে। অভিনয়ে ফেরা ও গ্রুপ থিয়েটার চর্চার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পাভেল রহমান
মঞ্চে অভিনয় না করার কারণ কী?
নিজেকে কখনোই অভিনেতা মনে করিনি, এখনো করি না। আমি মূলত একজন নির্দেশক। ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় যখন পড়েছি, তখন আমার শিক্ষক অভিনয়ের জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমার ‘মুখভঙ্গি খুবই অভিব্যক্তিপূর্ণ’; অভিনয় করলে ভালো করতে পারতাম। কিন্তু তখনো মনে করতাম, মঞ্চে অভিনয় নয়; নির্দেশনাই আমার জায়গা। ঢাকা থিয়েটারে দুটি নাটকে অভিনয় করেছিলাম। সর্বশেষ ১৯৮৪ সালে ‘ফণীমনসা’ নাটকে অভিনয় করেছি। বুঝতে পারছিলাম, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি না। তাই সিদ্ধান্ত নিই নির্দেশনাতেই থাকব।
এত বছর পর অভিনয়ে ফিরলেন কেন?
পুরোপুরি দলের প্রয়োজনে। যে নাটকে অভিনয় করছি, এতে অনেক চরিত্র। অভিনেতা পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। আমাদের সংকট অভিনেতার সংখ্যা নয়; সংকট হলো নিয়মিত সময় দিতে পারে– এমন অভিনেতার। অনেকেই অভিনয় করতে চান, কিন্তু নিয়মিত মহড়া করতে চান না। তখন বললাম, প্রয়োজন হলে আমিই অভিনয় করব। নির্দেশক আমার বয়স ও শারীরিক চাপ বিবেচনা করে বিচারপতির একটি ছোট চরিত্র দিল। এটি কোনো সংকোচের বিষয় মনে করি না।
নির্দেশক ও নাট্যশিক্ষক হিসেবে এতদিন কাজ করার পর অভিনেতার জায়গায় দাঁড়িয়ে নতুন কী অভিজ্ঞতা হলো?
তিনটি বিষয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, অভিনেতাদের সংকট নতুন করে উপলব্ধি করেছি। নির্দেশক হিসেবে বাইরে থেকে যেটি দেখা যায়, অভিনেতা হয়ে ভেতর থেকে সেটি আরও গভীরভাবে অনুভব করেছি। দ্বিতীয়ত, আমি অত্যন্ত গর্বিত যে আমার ছাত্রীর নির্দেশনায় অভিনয় করছি। তৃতীয়ত, এই প্রযোজনায় চার প্রজন্ম একসঙ্গে কাজ করছে বুমার্স, জেন এক্স, মিলেনিয়াল ও জেনজি। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা, তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পাওয়া আমার জন্য গর্বের বিষয়।
আপনি থিয়েটারের শিক্ষক। অভিনয়ের সময়তত্ত্ব কি চাপ তৈরি করে?
একেবারেই না; বরং তত্ত্ব ছাড়া কোনো কাজই হয় না। আপনি হাঁটেন— তারও একটা তত্ত্ব আছে। আপনি কথা বলেন— তার পেছনেও ব্যাকরণ কাজ করে। আমরা ব্যাকরণ মেনেই কথা বলি, যদিও প্রতিবার সেটি আলাদা করে ভাবি না। অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তাই।
বিভিন্ন দলে অতিথি নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন। এখন স্পর্ধার সংগঠক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন? গ্রুপ থিয়েটারের বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখেন?
নব্বইয়ের দশকেই বলেছিলাম, প্রচলিত অর্থে গ্রুপ থিয়েটারের সময় শেষ হয়ে আসছে। কারণ, এর সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তিই বদলে গেছে। সত্তরের দশকে মধ্যবিত্তের উদ্বৃত্ত সময় ছিল। এখন গ্লোবালাইজেশন ও নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মানুষকে নিজের জীবিকা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ বড় দলের নয়; ছোট, নিবেদিত দল এবং ছোট আকারের প্রযোজনার। দুই-তিন কিংবা অল্পসংখ্যক চরিত্রের নাটক, ছোট স্টুডিও থিয়েটার এবং নিজস্ব পরিবেশনায় ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বেশি। আমাদের নিজস্ব ‘অ্যাটেলিয়ার’ থাকায় শিল্পকলা একাডেমির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় না। নিয়মিত মহড়া করা যায়, নিজেদের মতো নাটক করা যায়। ঢাকায় এর মধ্যে কয়েকটি ছোট স্টুডিও থিয়েটার গড়ে উঠেছে। আমি মনে করি, এই ধরনের জায়গা থেকেই ভবিষ্যতে ছোট পরিসরে পেশাদার থিয়েটারের চর্চা তৈরি হতে পারে।
নাটকের তথ্য
জার্মান নাট্যকার বের্টল্ট ব্রেখটের নাটক অবলম্বনে ‘গোলমাথা আর চোখামাথা’র অনুবাদ করেছেন অনিরুদ্ধ অনু। স্পর্ধা’র প্রযোজনায় নাটকটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন মহসিনা আক্তার। মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে আগামীকাল সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে এর প্রথম প্রদর্শনী হবে। ২৪ ও ২৫ জুলাই প্রতিদিন বিকাল ৪টা এবং সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে রয়েছে এই নাটকের আরও দুটি করে প্রদর্শনী।





