কতদিন এভাবে চলবে জানি না

আজাদ আবুল কালাম। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইনের ২৫ বছর পূর্তি উদযাপনে ৩০ ও ৩১ জুলাই দুদিন উৎসব হবে। এ প্রসঙ্গে কথা বললেন প্রাচ্যনাটের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর আজাদ আবুল কালাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পাভেল রহমান
কোন ভাবনা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল প্রাচ্যনাট স্কুল?
প্রাথমিক ভাবনা ছিল যে, অনেকে নাটক ও থিয়েটার করতে চায়; কিন্তু তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। অভিনয় বা থিয়েটার করার ইচ্ছা থেকে অনেকেই আসত। তখন আমাদের মাথায় এলো— একটি প্রাথমিক শিক্ষা বা ওরিয়েন্টেশন যদি দেওয়া যায়, অন্তত একটা দক্ষতা যদি তৈরি হয়, তাহলে তাদের থিয়েটার শুরু করার সুবিধা হবে। ঘটনাক্রমে আমরা দলের চারজন নাট্য ও চারুকলা শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ভাবলাম, আমরাই শুরু করি। পরে যে যে ক্ষেত্রে দক্ষ লোক লাগবে, তাদের নিয়ে আসব। মূলত থিয়েটার করতে আগ্রহীরা যেন একটু প্রস্তুতি নিতে পারে, এটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
২৫ বছর পর সেই ভাবনার কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে?
ভাবনার বাস্তবায়ন বলতে আমাদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন হয়েছে। প্রতি সেশনে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করা হয়। এখন যেমন কারিকুলামে থিয়েটারের পাশাপাশি সিনেমা, টেলিভিশন বা নানা মিডিয়াম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আরেকটি বিষয় হলো, এর বিস্তার। আমরা যেখানেই কাজ করতে যাই, নাটকের দলগুলোতে প্রাচ্যনাট স্কুল থেকে বের হওয়া ছেলেমেয়েরা আছে। ঢাকার এমন কোনো দল নেই বললেই চলে, যেখানে প্রাচ্যনাটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা নেই। তা ছাড়া চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, নির্মাণ, সেট ও অন্যান্য ডিজাইন, স্ক্রিপ্ট রাইটিং— নানা ক্ষেত্রে গত দুই যুগের বেশি সময় ২৫টি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সফলভাবে কাজ করছে। সবাই তো আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নাটকে পড়ার সুযোগ পায় না। সেদিক থেকে এটিকে একটি সাফল্য বলা যায়।
চব্বিশের জুলাইয়ের পর একধরনের গোষ্ঠী বা শ্রেণিকে দেখছি, যারা ভেতরে ভেতরে প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মান্ধ এবং এসব সংস্কৃতিচর্চার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে এগুলোকে ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে চায়
এ যাত্রায় কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন?
বড় একটি সংকট হলো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আমরা শিক্ষার্থীদের ওপর বেশি ফি-র চাপ দিতে পারি না। তাই প্রাচ্যনাটের সঙ্গে যুক্ত আমরা যারা শিক্ষকতা করি, তারা কোনো অর্থ গ্রহণ করি না। বাইরে থেকে শিক্ষক হিসেবে যাদের আনা হয়, তাদেরও খুব নামমাত্র যাতায়াত খরচ দেওয়া হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বা বড় বড় প্র্যাকটিশনার্স এই সামান্য সম্মানী জেনেও আনন্দ ও আগ্রহ নিয়ে শেখাতে এগিয়ে আসেন। এ ছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তো আছেই, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে পরিবারগত অসম্মতি বা সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরার ভয় থাকে। দ্বিতীয়ত, আমাদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী জায়গা নেই, ভাড়া করে চালাতে হয়। দিন দিন জায়গার ভাড়া বাড়ছে। কতদিন এভাবে চলবে জানি না।
কখনো কোনো বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে?
প্রত্যক্ষ বাধার মুখোমুখি হতে হয়নি, তবে দৃষ্টিভঙ্গিগত কিছু সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে, এখনো করছি। নাটক নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বা কথা প্রসঙ্গে একধরনের তাচ্ছিল্য বা প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব দেখা যায়। থিয়েটার বা নাট্যচর্চাকে সবসময়ই আমরা একধরনের শক্তি হিসেবে দেখি। একটি সংস্কৃতিচর্চা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কিছু বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ সবসময়ই থাকে। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাইয়ের পর একধরনের গোষ্ঠী বা শ্রেণিকে দেখছি, যারা ভেতরে ভেতরে প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মান্ধ এবং এসব সংস্কৃতিচর্চার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে এগুলোকে ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে চায়।
শিক্ষায় তো গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নাট্য গবেষণার ক্ষেত্রে প্রাচ্যনাট স্কুল কী ভূমিকা রাখছে?
যেহেতু এটি মাত্র ছয় মাসের একটি কোর্স, তাই কারিকুলাম অনুযায়ী সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর গবেষণা চাপিয়ে দেওয়া মূল লক্ষ্য নয়। তবে প্রাচ্যনাটের প্রাক্তন ও বর্তমান সদস্যরা নিজেদের তাগিদে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় বা মাস্টার্সের কাজ করার সময় যাদের গবেষণার প্রয়োজন হয়, তাদের আমরা সবসময় সহযোগিতা করি এবং তথ্য দিয়ে সাহায্য করি।
আগামীর দিনের ভাবনা বা পরিকল্পনা কী?
এখন মূল ভাবনা হলো স্কুলটির প্রসার ঘটানো। বর্তমানে এটি ঢাকা শহর তথা এলিফ্যান্ট রোডকেন্দ্রিক। এটিকে প্রসারিত করে ঢাকার অন্য জায়গায় এর শাখা তৈরি করা যায় কি না, সেটি নিয়ে আমরা ভাবছি। কারিকুলাম উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারি বা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকাঠামোর সঙ্গে এর কোনো সংযোগ ঘটানো যায় কি না, অর্থাৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক সংযোগ তৈরির বিষয় নিয়েও আমাদের চিন্তাভাবনা চলছে।




