আমার প্রিয় বাবা

বুলবুল আহমেদ (জন্ম: ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৪১; মৃত্যু: ১৫ জুলাই, ২০১০)
অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক বুলবুল আহমেদের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী আজ। স্মৃতিচারণ করেছেন তার বড় মেয়ে তাহসিন ফারজানা তিলোত্তমা
অভিনয়ের পাশাপাশি বাবা যখন প্রযোজনা ও পরিচালনায় হাত দেন, তখন তার চলচ্চিত্রগুলোর স্ক্রিপ্ট লেখা থেকে শুরু করে গান রচনা— সবই আমাদের বাড়িতে বসে হতো। মহিলা শিল্পীরা সাধারণত বাসায় আসতেন না। তাই অনেক সময় সুবীর নন্দী আঙ্কেল কিংবা আব্দুল হাদী চাচার সঙ্গে ডুয়েট গানগুলোর রিহার্সেলের সময় নারী কণ্ঠটি আমাকেই দিতে হতো। সেই থেকে আব্বুর অনেক প্রিয় গান আমার মুখস্থ হয়ে যায়। বেড়ে ওঠার পরও ছুটির দিনে বাবার বাড়িতে গেলে সেই পুরনো দিনের গানগুলো আমাকে গেয়ে শোনাতে হতো। বাবা চোখ বন্ধ করে গান শুনতেন, আর শুনতে শুনতে কখনো ঘুমিয়ে পড়তেন।
বাবা খুবই পরিবারমুখী মানুষ ছিলেন। মাকে ঘিরে আমরা ভাইবোনরা তার আশপাশে যতই হইচই করতাম, তিনি উপভোগ করতেন।
বাইরে গেলেও বেশিরভাগ সময় আমাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন, এমনকি অনেক শুটিংয়েও। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের কাছে বাবা আন্তরিকতা, সরলতা আর সততার জন্য অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। আমার অনেক বন্ধু বিশ্বাসই করতে পারত না যে, শত ব্যস্ততার মধ্যেও বাবা আমাদের স্কুলের হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করতেন! নিজে ইতিহাসে এমএ করেছিলেন বলে যেকোনো বিষয় বিস্তারিতভাবে জানার প্রবল আগ্রহ ছিল তার। কোনো বিষয়ে সাহায্য চাইলে তিনি একেবারে বিষয়টির গভীরে ঢুকে যেতেন।
ছোটবেলায় আমরা মায়ের কাছে বাংলা পড়লেও, গণিত আর ইংরেজি পড়তাম বাবার কাছে। একটি রচনা বা প্যারাগ্রাফ কীভাবে লিখলে আরও ভালো হবে, কীভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে, এসব নিয়ে বাবা বারবার বলতেন। মাঝে মাঝে মনে হতো, কেন যে বাবার কাছে পড়তে বসলাম! হোমওয়ার্ক যেন আর শেষই হতো না!
বাবার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। তখনকার দিনে থিয়েটারের নাটক কিংবা টেলিভিশন নাটকের দীর্ঘ স্ক্রিপ্টগুলো তিনি অনায়াসে মুখস্থ করে ফেলতেন। সেই মানুষটিই যখন ২০০৯ সালে অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং ধীরে ধীরে অনেক কিছু ভুলে যেতে শুরু করলেন, তখন তাকে দেখে খুব মায়া লাগত। মাঝে মাঝে সকালে ঘুম থেকে উঠে বলতেন, ‘দেখো তো, শুটিংয়ের গাড়ি এসেছে কি না? ওরা কি আমার জন্য অপেক্ষা করছে?’
কোনো এক বিকালে হয়তো বলে বসতেন, ‘ফরীদির (হুমায়ূন ফরীদি) মেকআপ শেষ হয়েছে? দেখো তো। ক্যামেরা রেডি?’
২০০৯-১০ সালের দিকে ডিমেনশিয়া নিয়ে আমাদের তেমন ধারণা ছিল না। এখন মনে হয়, আব্বুর হয়তো তখন কিছুটা ডিমেনশিয়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল।
বাবাকে ঘিরে অসংখ্য স্মৃতি আমাদের মনের মণিকোঠায় প্রতিদিনই ফিরে আসে। সময় চলে যায়, বছর পেরিয়ে যায়; কিন্তু বাবার স্মৃতি, তার কণ্ঠ, তার ভালোবাসা এবং তার উপস্থিতির অনুভূতি আমাদের হৃদয়ে আজও অমলিন।
বাবা যে তিনটি পরিচয়ে মানুষের ভালোবাসায় ভূষিত হয়েছিলেন— ১. ভালো মানুষ, ২. মহানায়ক, ৩. দেবদাস। আজও মানুষ তাকে এসব পরিচয়েই স্মরণ করে। এটি আমাদের কাছে কতটা গর্বের, সম্মানের ও আনন্দের— সেটি হয়তো আমরা পরিবারের মানুষরাই সবচেয়ে বেশি অনুভব করি। দেশের মানুষ ও বাবার অগণিত শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই তার নামে ‘বুলবুল আহমেদ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’ গঠন করেছি। আমার ভাই ওয়াসিফ আহমেদ শুভ ‘মহানায়ক বুলবুল আহমেদ’ নামে ফেসবুক পেজ নিয়মিত আপডেট করছে। আমার ছোট বোন ঐন্দ্রিলা আহমেদ বাবাকে নিয়ে ‘একজন মহানায়কের কথা’ নামে একটি জীবনী লিখেছে এবং একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেছে। আমি ‘মহানায়কের গান’ শিরোনামে একটি সিডি প্রকাশ করেছি এবং সিলন মিউজিক লাউঞ্জের প্রস্তাবে বাবার অভিনীত চলচ্চিত্রের ১২টি গান কণ্ঠে ধারণ করেছি।






