সেই বাসরও নেই, বাঁশরী নেই

বরেণ্য সংগীতশিল্পী মো. খুরশীদ আলম। ছবি: আগামীর সময়
বরেণ্য সংগীতশিল্পী মো. খুরশীদ আলমের ৮১তম জন্মদিন আজ। এ উপলক্ষে চ্যানেল আইয়ে বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে প্রচার হবে প্রামাণ্যচিত্র ‘হৃদয়ে কী সুর বাজে’। দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মীর রাকিব হাসান
জন্মদিন সাধারণত কীভাবে কাটে?
একসময় স্ত্রী, সন্তান, মেয়েরা, নাতি-নাতনিদের নিয়ে হোটেলে জন্মদিন পালন করেছি। মেয়েরা বিভিন্ন জায়গা থেকে কেক আনত, আয়োজন করত। ওরা এখনো চেষ্টা করে। তবে এখন কোনোভাবে জন্মদিনটা পার করতে পারলেই হলো। এখন বাবা-মা কেউ নেই। ভাই-বোনদের মধ্যেও অনেকেই নেই। জন্মদিন এলে এ শূন্যতা আরও বেশি অনুভব করি।
শারীরিকভাবে এখন কেমন আছেন?
আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া। এখনো নিজে চলাফেরা করতে পারছি। তবে একটি সমস্যা হচ্ছে, ঢাকার রাস্তায় এখন অনেক জ্যাম। একা একা বের হওয়া কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। আমার দুই মেয়ে আছে। তারা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তবুও সকালে-বিকালে আসে, কেমন আছি দেখে যায়।
আপনার সমসাময়িক শিল্পীদের অনেকেই তো নেই...
খুব কষ্ট লাগে। জব্বার ভাই আমার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন, তিনি চলে গেছেন। সুবীর নন্দী ও এন্ড্রু কিশোর আমার চেয়ে ছোট ছিলেন। ওরাও নেই। খুব ভালো সম্পর্ক ছিল ওদের সঙ্গে। এখন সৈয়দ আব্দুল হাদী ভাই, ফেরদৌসী আপা, রফিকুল আলম, সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা আছেন। টেলিফোনে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। তবে আড্ডা দেওয়ার মানুষের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। আগের দিনের কথা মনে পড়লে শ্যামল মিত্রের সেই গানটির কথা মনে হয়, ‘সেই বাসরও নেই, বাঁশরী নেই, ভোর যে হয়ে গেল’। সময় আসলে চলে যাচ্ছে। আমাদের শিল্পীদের তো কোনো সংগঠনও নেই, কোনো অফিস নেই, থাকলে হয়তো দেখা-সাক্ষাৎ বেশি হতো।
শিল্পীদের জন্য সংগঠন জরুরি বলে মনে করেন?
সংগঠন থাকলে শিল্পীদের অনেক সমস্যার কথা সম্মিলিতভাবে বলা যেত। সবচেয়ে বড় কথা, গানের রয়্যালটির বিষয়ে সমাধান হওয়া দরকার। সারা পৃথিবীতে রয়্যালটি ব্যবস্থা আছে। আমাদের দেশে গীতিকাররা কিছু ক্ষেত্রে রয়্যালটি পান; কিন্তু কণ্ঠশিল্পীরা সেভাবে পান না। যদি বলি, ৩০ বছরে ৫০০ চলচ্চিত্রে গান করেছি তাহলে সেগুলো যদি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়, সেখান থেকে শিল্পীর একটা রয়্যালটি পাওয়ার কথা। আমি তো পাচ্ছি না। অনেকবার চেষ্টা করেছি; কিন্তু আমরা নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ নই। সরকারও হয়তো বুঝে গেছে, শিল্পীদের একটি মজবুত সংগঠন নেই। ফলে আমাদের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরার জায়গাটা দুর্বল।
এখনকার ব্যস্ততা কেমন?
আমাদের সময়ের মতো এখন আর চলচ্চিত্রের গান হচ্ছে না। টেলিভিশন ও লাইভ অনুষ্ঠান আছে, সেখানেই কিছুটা কাজ হয়। বয়সও তো হয়েছে। নতুন প্রজন্ম আসছে, তাদের জায়গা করে দিতে হবে। এটাই স্বাভাবিক। তবে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি। কারণ এখনো মানুষ আমাকে ডাকে, আমার গান শুনতে চায়। এটা অনেক বড় পাওয়া। লাইভ প্রোগ্রামে গেলে পুরনো গানগুলো গাই।
নায়করাজ রাজ্জাকের সিনেমা মানেই ছিল আপনার গান। সেটি কতটা মিস করেন?
চলচ্চিত্রে ১০০টি গান যদি ধরি, তার মধ্যে হয়তো ৬০টিতে ঠোঁট মিলিয়েছেন রাজ্জাক ভাই। বাকিগুলোতে অভিনয় করেছেন বিভিন্ন নায়ক। আমার গান ছাড়া রাজ্জাক ভাইয়ের চলতোই না। তখন আমরা সম্মানী কত পেলাম, সেটা বড় বিষয় ছিল না। ভালো কাজ করতে হবে— এটাই ছিল মূল কথা। মানুষ যদি একটি গান শুনে বলে, ‘ভালো হয়েছে’, সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় সম্মান।
প্রায়ই বলেন, আপনাদের সময়টা ছিল ‘গোল্ডেন’। কেন?
আমাদের সময়টা সত্যিই গোল্ডেন ছিল। শিল্পী, গীতিকার, সুরকার সবাই তখন একটি গান তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় পেতেন। এত তাড়াহুড়ো ছিল না। অভাব-অনটন হয়তো ছিল; কিন্তু মানুষের মধ্যে মিল-মহব্বত বেশি ছিল। এখন সবাই ব্যস্ত।
এখনকার প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
নতুন প্রজন্ম অত্যন্ত মেধাবী। খুব দ্রুত গান শিখতে ও গাইতে পারে। প্রযুক্তি সম্পর্কে তারা অনেক বেশি জানে। তাদের নিজস্ব স্টুডিও এবং ইউটিউব চ্যানেলসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আছে। অনেক দিক থেকেই তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে। তবে সুরকার, গীতিকার, পরিচালক, প্রযোজক সবাই মিলে আমরা যেভাবে কাজ করতাম তারা সেই পরিবেশ পাচ্ছে না।





