নেটফ্লিক্সের শীর্ষে ‘মনস্টার’, ১৮৯২ সালের সেই ভয়াবহ সকালে কী ঘটেছিল?

‘মনস্টার’ সিরিজে এলা বিটি
মুক্তির পরপরই বিশ্বজুড়ে ঝড় তুলেছে নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় ট্রু-ক্রাইম অ্যান্থোলজি সিরিজ ‘মনস্টার’-এর চতুর্থ কিস্তি—‘মনস্টার: দ্য লিজি বোর্ডেন স্টোরি’। গত ১৬ সেপ্টেম্বর মুক্তির পর থেকেই সমালোচকদের তীব্র বিতর্ক আর মিশ্র প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও প্ল্যাটফর্মটির শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে ৮ পর্বের এই মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার।
আমেরিকান ট্রু-ক্রাইম ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর ও রহস্যময় হত্যাকাণ্ড—১৮৯২ সালের লিজি বোর্ডেন কেস। একটি ধারালো কুড়াল, দুটি ক্ষতবিক্ষত লাশ এবং কোটিপতি বাবার এক রহস্যময়ী মেয়ে। ১৩৪ বছর পার হয়ে গেলেও আজও এই রহস্যের কোনো জট খোলেনি। বিশ্বজুড়ে চর্চিত এই শিউরে ওঠা ঘটনাটিকে ভিত্তি করেই সম্প্রতি নেটফ্লিক্স প্রকাশ করেছে তাদের নতুন ট্রু-ক্রাইম সিরিজ ‘মনস্টার: দ্য লিজি বোর্ডেন স্টোরি’।
১৮৯২ সালের ৪ আগস্ট, আমেরিকার ফল রিভারের এক বিলাসবহুল বাড়িতে ঘটে সেই ভয়াবহ ঘটনা। সকাল ১১টা নাগাদ গৃহপরিচারিকাকে চিৎকার করে ডেকে তোলেন ৩২ বছর বয়সী লিজি বোর্ডেন। বসার ঘরের সোফায় রক্তে ভেসে যাচ্ছিল কোটিপতি বাবা অ্যান্ড্রু বোর্ডেনের ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। ধারালো অস্ত্রের ১০-১১টি কোপে তার মুখ চেনা যাচ্ছিল না। আর ওপরের গেস্টরুমে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল লিজির সৎ মা অ্যাবি বোর্ডেনের বীভৎস লাশ।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, দিনের আলোয় এই জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটে গেলেও কোনো ধস্তাধস্তির শব্দ শোনেননি কেউ। চুরির কোনো প্রমাণ মেলেনি, এমনকি কোনো অপরিচিত মানুষকেও বাড়ি থেকে বের হতে দেখা যায়নি।
তদন্তে নেমে পুলিশ প্রধানত লিজিকেই মূল সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে। কারণ, সম্পত্তির বড় অংশ তার সৎ মার নামে লিখে দেওয়ায় বাবার ওপর ক্ষুব্ধ লিজি ও তার বোন এমার সঙ্গে সৎ মা অ্যাবির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বিষাক্ত।
এছাড়া খুনের সময় বাড়ির বাইরে পেয়ারা খাওয়ার দাবি করলেও ভেতরে দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কোনো শব্দ না শোনা এবং ঘটনার ঠিক আগেই ফার্মেসি থেকে প্রাণঘাতী প্রুসিক অ্যাসিড কেনার চেষ্টা তার বক্তব্যকে অসংলগ্ন করে তোলে।
পরবর্তীতে রান্নাঘরের আগুনে নিজের পোশাক পুড়িয়ে প্রমাণের চিহ্ন মোছার চেষ্টা এবং বাড়ির বেসমেন্ট থেকে ছাইমাখা একটি ভাঙা কুড়াল উদ্ধার হওয়া পুলিশকে লিজির দিকেই আরও জোরালোভাবে ইঙ্গিত করে।
১৮৯৩ সালের জুনে শুরু হয় বহুল আলোচিত এই বিচারপ্রক্রিয়া। তবে তৎকালীন ভিক্টোরিয়ান সমাজব্যবস্থায় এক ধনী ও গির্জায় যাওয়া ভদ্রঘরের নারী এত নৃশংস খুন করতে পারেন—তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না বিচারকরা।
তাছাড়া, কুড়ালে লিজির আঙুলের ছাপ বা শরীরে সরাসরি রক্তের দাগ না থাকায় এবং কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না মেলায়, কেবল সন্দেহের বশে জুরি বোর্ড লিজিকে ‘দোষী নয়’ বলে খালাস দেয়।
খালাস পেলেও লিজিকে সমাজ কখনো ক্ষমা করেনি। প্রতিবেশীরা তাকে একঘরে করে দেয়, এমনকি খুনের বিচার চলাকালীন পাশে থাকা নিজের বোন এমাও ১৯০৫ সালে লিজিকে ছেড়ে চিরতরে চলে যান। ১৯২৭ সালে লিজি মারা যান, কিন্তু মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত মুখ খোলেননি তিনি।
কে মেরেছিল অ্যান্ড্রু ও অ্যাবি বোর্ডেনকে? লিজি কি সত্যিই ঠান্ডা মাথার খুনি ছিলেন, নাকি অধরা থেকে গিয়েছিল আসল ঘাতক? ১৩৪ বছর পর আজও আমেরিকার ইতিহাস সেই উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে।




