সালমান শাহ হত্যায় তিন কারণে খলনায়ক ডনের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়েছে সিআইডি

সালমান শাহ ও আশরাফুল হক ডন
চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক মো. মুজিবুর রহমান গত ২০ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ আবেদন করেন।
রিমান্ড আবেদনে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত সূত্র জানিয়েছে, আসামির উপস্থিতিতে রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা।
যে তিন কারণে রিমান্ড
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে করা মামলাটি একটি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। মামলার ভুক্তভোগী জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। ঘটনার পর থেকে তার মা নীলা চৌধুরী নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তৎপরতা রয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, মামলাটি সুষ্ঠুভাবে তদন্তের স্বার্থে আশরাফুল হক ডনকে পুলিশ হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ডন অত্যন্ত সুকৌশলী ও ধূর্ত প্রকৃতির। তাকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার ঘটনায় জড়িত অন্য সহযোগীদের অবস্থান শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হতে পারে। এ কারণে মামলার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও তদন্তের স্বার্থে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
তৃতীয় কারণ হিসেবে রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, ডনের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন কৌশলে বিদেশে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কী কারণে এবং কার ইন্ধনে তিনি বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য জানার জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এসব তথ্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার
এর আগে গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সিআইডি তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক আরিফুর রহমান ওই আবেদন করেছিলেন।
যে মামলায় ডনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার পর নতুন করে তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়। আদালতের ওই নির্দেশের পর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন।
মামলায় সাবেক স্ত্রী সামীরা হক, আশরাফুল হক ডনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সামীরা হকের মা লতিফা হক লুছি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘ তদন্ত
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে চিত্রনায়ক সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রথমে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়।
মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে। তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। ওই প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। পরে ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।
তবে ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান।
দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। ওই প্রতিবেদনেও সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু বলা হয়।
এরপর কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী নীলা চৌধুরী বাদী হিসেবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত হন। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন।
সর্বশেষ মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা করা হয়।
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর মামলাটি নতুন করে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের পর্যায়ে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে আশরাফুল হক ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে সিআইডি। এখন আদালতের শুনানিতে রিমান্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।





