নগ্ন দৃশ্যের বিতর্কের পর ২১ বছরেই করুণ পরিণতি বিজয়শ্রীর

বিজয়শ্রী। ছবি: সংগৃহীত
মাত্র ১৩ বছর বয়সে রূপালি জগতে পা রেখেছিলেন তিনি। রূপ আর অভিনয়ের অনন্য মিশ্রণে খুব অল্প সময়েই জয় করে নিয়েছিলেন লাখো দর্শকের হৃদয়।
বলা হচ্ছে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের সত্তরের দশকের অন্যতম সেনসেশন বিজয়শ্রীর কথা, যাকে বলা হতো ‘মালয়ালম সিনেমার মেরিলিন মনরো’। কিন্তু যে রূপ আর গ্ল্যামার তাকে খ্যাতির চূড়ায় বসিয়েছিল, সেই রূপই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ, মাত্র ২১ বছর বয়সে এক করুণ আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে নিভে যায় এই তারকার জীবনপ্রদীপ।
তার মৃত্যুর পাঁচ দশক পার হয়ে গেলেও, তার মৃত্যুর নেপথ্যে থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য ও শোষণের অভিযোগ আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৬৬ সালে তামিল সিনেমা ‘চিত্ত’ দিয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন বিজয়শ্রী। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে ‘পূজাপুষ্পম’ সিনেমার মাধ্যমে মালয়ালম ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখেন।
তৎকালীন সময়ের মহানায়ক প্রেম নাজিরের সাথে তার অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি এতটাই জমে উঠেছিল যে, তাদের একের পর এক সিনেমা বক্স অফিসে সুপারহিট হতে শুরু করে।
চিত্রপরিচালক ভারতন থেকে শুরু করে জয়রাজ— সবাই তার ঐশ্বরিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন। পরিচালক জয়রাজের মতে, ‘তিনি ছিলেন মালয়ালম সিনেমার মেরিলিন মনরো। তার মতো জনপ্রিয়তা খুব কম অভিনেত্রীই পেয়েছেন।’
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা জগতে তাকে গ্ল্যামারাস ও সাহসী চরিত্রে টাইপকাস্ট করা শুরু হলে মানসিকভাবে ব্যথিত হন বিজয়শ্রী। দর্শকরা তাকে ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে দেখতে শুরু করায় তিনি সেই ইমেজ ভাঙার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন।
সে লক্ষ্যে তিনি চরিত্রপ্রধান ও গভীর আবেগনির্ভর সিনেমাগুলোতে অভিনয় শুরু করেন। কিন্তু সেই পথেই তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা।
১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পোন্নাপুরম কোট্টা’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় ঘটে এক মর্মান্তিক ঘটনা। জলপ্রপাতের তীব্র স্রোতে ‘ভিলিয়োর কাভেরে’ গানের শুটিং চলাকালে দুর্ঘটনাবশত বিজয়শ্রীর পরনের সাদা পাতলা পোশাকটি খসে পড়ে। লজ্জিত হয়েও পেশাদারিত্বের খাতিরে তিনি কোনোমতে নিজেকে ঢেকে দৃশ্যটি শেষ করেন। কিন্তু ক্যামেরা তখনো সচল ছিল।
বিজয়শ্রী বিশ্বাস করেছিলেন, চলচ্চিত্র নির্মাতারা এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও আপত্তিকর অংশটি এডিট করে কেটে বাদ দেবেন। কিন্তু সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি চরম ধাক্কা খান। আপত্তিকর ছবিটি অবিকল রেখে দেওয়া হয়েছিল হলে দর্শক টানার বাণিজ্যিক হাতিয়ার হিসেবে!
মুহূর্তেই সিনেমাটি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে প্রচুর দর্শক ভিড় জমায়, কিন্তু মানসিকভাবে চরম ভেঙে পড়েন অভিনেত্রী। তার বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও পরিচালক বা প্রযোজক সিনেমা থেকে ওই দৃশ্য ছাঁটাই করতে রাজি হননি। গুঞ্জন রয়েছে, তৎকালীন এক চিত্রগ্রাহক সেই দৃশ্যটি ব্যবহার করে তাকে মানসিকভাবে উত্ত্যক্ত ও ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করেছিলেন।
এই ঘটনার মাত্র এক বছরের মাথায়, ১৯৭৪ সালে নিজ বাসভবন থেকে বিজয়শ্রীর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি কোনো সুইসাইড নোট রেখে যাননি। অনেকের মতে, ইন্ডাস্ট্রির চরম শোষণ, নগ্নতার বিতর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন সহ্য করতে না পেরেই মৃত্যুর পথ বেছে নেন এই উদীয়মান তারকা।
পরবর্তীতে ২০১১ সালে তার জীবনকাহিনির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয় ‘নায়িকা’ নামের একটি চলচ্চিত্র। বিজয়শ্রীর এই বিদায় কেবল একটি জীবনাবসান নয়, বরং গ্ল্যামার জগতের পেছনের নির্মম সত্যের এক জীবন্ত দলিল।
সূত্র: এনডিটিভি







