তুলনা
তারকোভস্কি বনাম বেলা তার

ইভান’স চাইল্ডহুড। চলচ্চিত্রকার: আন্দ্রেই তারকোভস্কি
চলচ্চিত্রের মতো একটি শব্দ ও দৃশ্যপ্রধান মাধ্যমের ভেতর দিয়ে দর্শককে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন করা যে সম্ভব, তর্কসাপেক্ষে এর সবচেয়ে সফল উদাহরণগুলো সৃষ্টি করে গেছেন রুশ চলচ্চিত্রকার আন্দ্রেই তারকোভস্কি। বাণিজ্য নয়; বরং শিল্প হিসেবে এই মাধ্যমকে গণ্য করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাববিস্তারী চলচ্চিত্রকারদেরও অন্যতম তিনি। পরের প্রজন্মের, বিশেষ করে হাঙ্গেরিয়ান চলচ্চিত্রকার বেলা তারের চলচ্চিত্রে এই প্রভাব বেশ স্পষ্ট। শেষোক্তজন তা স্বীকারও করেছেন। তবে তারকোভস্কির সঙ্গে নিজের কাজের পার্থক্য টানতে এক সাক্ষাৎকারে বৃষ্টির প্রসঙ্গ এনেছিলেন বেলা তার। বলেছিলেন, ‘তারকোভস্কির সিনেমার বৃষ্টি মানুষকে খাঁটি করে তোলে। আর আমার সিনেমার বৃষ্টি স্রেফ কাদা বানায়।’
শুধু উদাহরণের উপমা হিসেবে নয়; বরং আক্ষরিক অর্থেই এ দুই ফিল্মমেকারের ফিল্মোগ্রাফিজুড়ে বৃষ্টি বারবার ফিরে এসেছে। তারকোভস্কির সিনেমার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বেশি পুনরাবৃত্তিমূলক উপাদানগুলোর একটি। এই চলচ্চিত্রকারের সৃষ্টিকর্মে বৃষ্টি স্রেফ ব্যাকড্রপের বদলে পরিণত হয়েছে স্মৃতি, বিশুদ্ধতা, বিষাদ ও সময়কে মূর্ত করে তোলার আধার হিসেবে। তার ‘আন্দ্রেই রুবলেভ’-এ (১৯৬৬) প্রবল ঝোড়োবৃষ্টিতে সাদা ওক গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া তিন সন্ন্যাসীর এক হৃদয়ছোঁয়া ও নির্বাক স্মৃতির দৃশ্য রয়েছে, যা তাদের জন্য একই সঙ্গে হাড় কাঁপানো কষ্ট এবং জীবনদায়ী প্রকৃতির এক মেলবন্ধন হয়ে ধরা দেয়। ‘দ্য মিরর’-এ (১৯৭৫) ঘরের দেয়াল বেয়ে নিরন্তর ঝরতে থাকে বৃষ্টি, যা গভীর স্মৃতিকাতরতা আর বারবার ফিরে আসা শৈশবস্মৃতির সঙ্গে চারপাশের বস্তুগত ক্ষয়কে এক সুতায় গেঁথে নেয়। ‘স্টকার’-এ (১৯৭৯) বহুল আলোচিত সেই পরিত্যক্ত ও রহস্যময় স্থাপনার ভাঙা ছাদের ফাঁক গলিয়ে যখন তুমুল বর্ষণ শুরু হয়, ব্যক্তিমানুষের অন্তস্তল ও বাহ্যিক জগতের ভেদাভেদ তখন পুরোদস্তুর ভেঙে পড়ে। ‘নস্টালজিয়া’য় (১৯৮৩) কেন্দ্রীয় চরিত্রটি পরদেশে বিচরণকালে যখনই স্বদেশের জন্য কাতর হয়ে ওঠে, প্রায় প্রতিবারই ঝরতে থাকে বৃষ্টি।
অন্যদিকে, বৃষ্টিকে সাধারণত রোমান্টিক বা ভাবালু ব্যাকড্রপ হিসেবে ব্যবহার করেননি বেলা তার। এই চলচ্চিত্রকারের সৃষ্টিসম্ভারে বৃষ্টি তাই কোনো প্রতীকী, রূপকধর্মী কিংবা গোপন অর্থ বহন করে না; বরং তা প্রকাশ ঘটায় বস্তুগত স্থবিরতা, দুর্ভোগ ও কাদামাটির। তার চলচ্চিত্রের বৃষ্টি বাস্তবজীবনের সাধারণ মানুষের কাছে উপদ্রবের মতোই।
বালিকাটি যখন বুঝতে পারে, জাগতিক লালসা ও ক্লেদে ডুবে আছেন বড়রা, তখন সেই পৃথিবী থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। নিজের পোষা বিড়ালকেও এই পৃথিবীতে রেখে যাওয়ার ভরসা সে পায় না
বেলা তারের ‘ড্যামনেশন’ (১৯৮৮) চলচ্চিত্রের পুরো গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে বৃষ্টি। একটি প্রচলিত চোরাকারবারির গল্পকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে পানশালায় আটকা পড়া কিংবা জলসিক্ত ও ক্ষয়িষ্ণু রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকা চরিত্রগুলোর ওপর দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকে ক্যামেরা। চলচ্চিত্রটির বিখ্যাত শেষ দৃশ্যে তুমুল বর্ষণের মধ্যে কেন্দ্রীয় চরিত্রকে আমরা দেখি পথকুকুরের সঙ্গে অনেকটাই কুকুর হয়ে গিয়ে ঘেউ ঘেউ করতে। সেখানে যদি কোনো কাব্য ফুটে উঠে থাকে, তা মোটেই স্বপ্নতুল্য নয়; বরং কংক্রিটে ঠাসা রুক্ষ ও নিষ্প্রাণ। বেলা তারের শেষ সিনেমা ‘দ্য তুরিন হর্স’-এ (২০১১) বৃষ্টি ধারণ করে এক চরম নিষ্ঠুর আবহাওয়াগত রূপ। নিরন্তর শোঁ শোঁ করা ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টির এমন হানাদারের মতো আবির্ভাব একজন দরিদ্র ঘোড়ার গাড়ির চালক এবং তার মেয়ের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেয় ধীরে ধীরে।
আন্দ্রেই তারকোভস্কি ও বেলা তার— এই দুই অসামান্য চলচ্চিত্রকারের কাজের তুলনা টানতে দুটি চলচ্চিত্রের দুই দৃশ্যের উদাহরণে নজর দেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত তারকোভস্কির প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’-এর (১৯৬২) এক স্বপ্নদৃশ্যে বালক ইভান ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে তুমুল বর্ষণের। মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে দুপাশে গাছের সারির মাঝখানের সড়ক ধরে এগিয়ে আসে একটি ট্রাক। সেই ট্রাক থেকে রাস্তায় টুপটাপ পড়তে থাকে আপেল। আপেলভর্তি সেই খোলা ট্রাকে ভিজতে ভিজতে ইভান ও তার ছোট্ট বোনের আহ্লাদি সময় কাটানো শৈশবের সারল্যের এক কাব্যিক প্রকাশ। কিন্তু ক্লোজআপ শটে বোনটির অভিব্যক্তি হাসিমুখ থেকে রূপ নেয় বিষাদে। আর সড়ক পেরিয়ে সৈকতে ছোটা ট্রাকের পেছন থেকে ছড়িয়ে পড়তে থাকা আপেলগুলো খাওয়ার জন্য মানুষের বদলে এগিয়ে আসে ঘোড়া। এক আর্মি অফিসারের ডাকে তখনই ঘুম ভেঙে যায় ইভানের। সে ফিরে আসে যুদ্ধের নির্দয় বাস্তবতায়, যা তার পরিবারকে কেড়ে নিয়েছে; শেষের দিকে কেড়ে নেবে তারও জীবন। কিন্তু যুদ্ধরত এই একরোখা শিশুর স্বপ্নের ভেতর দিয়ে প্রবল বর্ষণে শৈশব তথা জীবনের শাশ্বত সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন তারকোভস্কি।
বৃষ্টিতে শিশুর চোখ দিয়ে জীবনের চিত্র এঁকেছেন বেলা তারও। তার বহুল আলোচিত সাড়ে সাত ঘণ্টা সময়ব্যাপ্তির ফিচার ফিল্ম ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’তে (১৯৯৪) এস্তিকে নামের বালিকাটি যখন বুঝতে পারে, জাগতিক লালসা ও ক্লেদে ডুবে আছেন বড়রা, তখন সেই পৃথিবী থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। নিজের পোষা বিড়ালকেও এই পৃথিবীতে রেখে যাওয়ার ভরসা সে পায় না; তাই অবুঝ প্রাণীটিকে মেরে ফেলে। তারপর মৃত বিড়ালকে বগলে নিয়ে বৃষ্টির ভেতর নিরুদ্দেশ হাঁটা দেয়। মাঝপথে এসে থামে দূর থেকে আলো জ্বলতে দেখা পানশালার সামনে। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায়। ভিজতে ভিজতেই পানশালায় উঁকি দিয়ে দেখে, মাতাল বড়রা নাচ-গানে উন্মত্ত। সেখানে নিজের কোনো জায়গা নেই তার, এমন অনুভূতি নিয়ে আবারও হাঁটতে থাকে এস্তিকে। দীর্ঘ সেই দৃশ্যে বনের ভেতর দিয়ে যখন সে হাঁটে, ক্লোেআপ শটে তার মুখে ভেসে ওঠে বিষাদ ও শূন্যতার গভীর বার্তা। তারপর বহুদূরে পৌঁছে, বিষ খেয়ে, মৃত বিড়ালকে কোলে নিয়ে, মাটিতে চিরকালের মতো ঘুমে ডুব দেয় মেয়েটি।
‘ইভান’স চাইল্ডহুড’ ও ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’— দুটি চলচ্চিত্র সাদাকালো হলেও একদিকে যুদ্ধবিগ্রহ এবং অন্যদিকে লোভ ও লালসার বৃত্ত; বড়দের গড়া পৃথিবীতে উভয় ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত দুই শিশুরই মৃত্যু হলেও তারকোভস্কির বালকটি হয়েছিল বীরের মতো শহীদ; অন্যদিকে বেলা তারের বালিকাটি আত্মহননে টেনেছিল জীবনের ইতি। ইভান যেখানে তুমুল বৃষ্টিতে শৈশবের স্বপ্নিল উচ্ছ্বাসে হয়েছিল মাতোয়ারা; এস্তিকে সেখানে ঝিরিঝিরি বারিধারায় বিষাদের গহ্বরে হয়ে পড়েছিল নিমজ্জিত। আর সেখানেই বৃষ্টির মতো একটি অভিন্ন উপাদান সত্ত্বেও চলচ্চিত্রকার হিসেবে তারকোভস্কি ও বেলা তারের জীবনবোধের প্রকট পার্থক্যকে অনুধাবন করা সম্ভব।





