ইঙ্গমার বার্গম্যান
আমি উন্মাদের মতো আচারনিষ্ঠ

ক্রাইজ অ্যান্ড উইস্পারস। চলচ্চিত্রকার: ইঙ্গমার বার্গম্যান
যখন কোনো চলচ্চিত্রের চিত্র্যনাট্য লিখতে শুরু করি, ভিত্তি হিসেবে একটি সূচনামূলক দৃশ্য আগে থেকেই ভাবনায় থাকে। ‘ক্রাইজ অ্যান্ড উইস্পারস’-এর ক্ষেত্রে একটি লালরঙা ঘরে চার শুভ্রবসনা নারী— এই চিত্রকল্প আমার মাথায় বহুদিন ধরে ছিল। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, তারা ওই ঘরে কেন রয়েছে, কী আলাপ করছে। বিষয়টি আমার কাছে রহস্যময় ছিল। এই চিত্রকল্প আমাকে অস্থির করে তুলেছিল। এটি একধরনের অন্তর্দৃষ্টি। তারপর একটি দীর্ঘ সুতা টানতে শুরু করলাম। সেটি কোথাও থেকে আসছিল এবং সেই সুতা হুট করেই ছিঁড়ে যেতে পারে। তার মানে যদি ছিঁড়ে যায়, ওই সুতা থেকে আর কিছুই পাব না। কিন্তু আচমকাই আমার কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ সুতার বল ধরা দিতে পারে। সুতা ছিঁড়ে গেছে— এমন ঘটনা আমার ক্ষেত্রে বহুবার ঘটেছে। তবে আমার অভ্যাস হলো, এমনিতে যখনই কিছু লিখতে শুরু করি, নিজের ওয়ার্কবুক শেষ করে তবেই থামি। নিরন্তরভাবে, বহু কিছু নিয়ে লিখতে থাকি। কিন্তু কোনো চিত্রনাট্য লেখার কাজ শুরু করামাত্রই জানি, কী লিখছি।
আমার হাতে অবশ্য কখনোই খুব বেশি অলস সময় থাকে না। কিন্তু যখনই নিজেকে দেওয়ার মতো সময় পাই, লিখি। যখন অল্পবয়সী ছিলাম এবং স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য উপার্জনের বাধ্যবাধকতা ছিল, বহুবারই বাধ্য হয়ে চিত্রনাট্য লিখতে বসে পড়েছি। তবে এখন এই বার্ধক্যে এসে সোফায় শুয়ে নিজের ভাবনাগুলোর সঙ্গে খেলা করার, ছবিগুলো দেখার, গবেষণা চালানোর ফুরসত পাই। আর তা আমাকে ভীষণ আনন্দ দেয়।
দুনিয়ার অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী চলচ্চিত্রকার তিনি। সুইডিশ এই কিংবদন্তির জন্ম ১৪ জুলাই ১৯১৮। জন্মদিন সামনে রেখে চিত্রনাট্য বিষয়ে তার এই বয়ান হাজির করা হলো
যখন কোনো চিত্রনাট্য লিখি, প্রতিদিনই নির্দিষ্টসংখ্যক পৃষ্ঠা ভরে ফেলি। চিরকাল এভাবেই লিখে এসেছি। চেষ্টা করে দেখেছি, মেশিনে লিখতে পারি না। আমার একটি নির্দিষ্ট ধরনের রাইটিং প্যাড আছে। সেগুলোতেই লিখি। ১৯৪২ সালে চিত্রনাট্যকার হিসেবে সভেনস্ক ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যখন কাজ করতাম, একধরনের হলুদ রেখা টানা প্যাড ছিল সেখানে। সেগুলোতে মোটা নিবের ফাউন্টেন পেন দিয়ে লেখার চল ছিল। তখন থেকে এখনো আমি এসব হলুদরঙা কাগজের প্যাডেই লিখি। বছর বিশেক আগে (১৯৭৮ সালের দিকে) জানতে পেরেছিলাম, ওই প্যাডগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। তাই ৮০০ কপির মতো প্যাড বানিয়ে নিয়েছিলাম। এখনো কয়েকটি খালি প্যাড টিকে আছে। আশা করি, আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এগুলো ফুরাবে না!
এখন অবশ্য ফাউন্টেন পেনের বদলে বলপয়েন্ট পেন দিয়ে লিখি। তবে কোনো পুরনো দিনের বলপয়েন্টে নয়। আমার কলমটি হওয়া চাই একেবারেই বিশেষ, বেশ মোটা নিবের। এই কলম নিজেই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। যদিও আমার চিত্রনাট্য খুব একটা সুখপাঠ্য নয়, তবে লিখে আনন্দ পাই। হাতে লিখতেই পছন্দ করি।
যেহেতু সবসময়ই একই ধরনের প্যাডে লিখি, ফলে বুঝে ফেলি কতটুকু লিখেছি। দিনে তিন ঘণ্টার বেশি লিখি না। ওই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ামাত্রই, এমনকি যদি তখন কোনো দৃশ্যের মাঝপথেও থাকি, সেদিনের মতো লেখালেখি থামিয়ে দিই। কারণ, এ কাজ বড়ই একঘেয়ে। তবে ওয়ার্কবুক বেশ মজার। এটি নিজেই একটি সৃজনশীল প্রক্রিয়া। চিত্রনাট্য লেখা মানে হলো প্রক্রিয়াটিকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা। এই নির্দিষ্ট কাগজ-কলমে, নির্দিষ্ট সময় ধরে, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় চিত্রনাট্য লেখাকে আমি আচারনিষ্ঠতা হিসেবে গণ্য করি।
আমার মধ্যে কখনোই শৃঙ্খলার ঘাটতি ছিল না। যদি থাকত, সব রসাতলে যেত— এ কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি
আমি বলব, চিত্রনাট্য লেখার সময় কারও সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা কিংবা পত্রিকা পড়া যাবে না। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নাশতা খেয়ে একটু হেঁটে আসুন। তারপর সোজা বসে পড়ুন লেখার টেবিলে। টেবিল পরিচ্ছন্ন থাকা চাই। লেখার টেবিলের কী অবস্থা, সেখানে বসে কাজ করতে পারব কি না— এসব ব্যাপারে আমি উন্মাদের মতো আচারনিষ্ঠ। প্রথমে টানা ৪৫ মিনিট লিখে তারপর বিরতি নিই। ততক্ষণে পিঠব্যথা শুরু হয়ে যায়। তাই উঠে বাড়িতে হাঁটাহাঁটি করি অথবা সমুদ্র দেখে কিংবা কিছু একটা করে ১৫ মিনিট কাটিয়ে দিই। তারপর আবার টেবিলে বসে আরও ৪৫ মিনিট লিখি।
চিত্রনাট্যের লেখা একটি অবশ্যকর্তব্য কাজ। লেখার সময় কিছু বিষয়ের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। যেমন— বিশৃঙ্খলা, দায়িত্বহীনতা। আমার মধ্যে কখনোই শৃঙ্খলার ঘাটতি ছিল না। যদি থাকত, সব রসাতলে যেত— এ কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি। চিত্রনাট্য লেখা মানে নিজের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই। আমার কাজে বিশৃঙ্খলার জায়গা নেই। এ কারণেই আমি এত কঠোর এবং অনেকের কাছে এত জবরদস্তিমূলক ও আচারনিষ্ঠ।
সূত্র: ইঙ্গমার বার্গম্যান অন লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্ক, সুইডিশ টেলিভিশন ডকুমেন্টারি
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ





