করণের মেট গালা লুক ‘ফ্রেমড ইন ইটার্নিটি’

সংগৃহীত ছবি
পোশাক শুধু পরিধেয় বস্তু নয়, বরং গল্প বলার মাধ্যম। এতে ধারণ করা যায় সংস্কৃতি ও শিকড়ের টান। তাই অনায়াসেই, পোশাক হয়ে ওঠে গল্প বলার ভাষা। বাহারি রঙ, মোটিফ ও বুননে ছবির মতোই ফুটিয়ে তোলা যায় মানুষের ব্যক্তিত্ব, তার অতীত ও বর্তমান এবং এর যতটুকু সে ধারণ করে। তাই ফ্যাশন শুধু আটপৌরে ব্যাপার নয়, বরং এটি মানুষেরই বর্ধিত একটি অংশ।
করণ জোহরও একই ধারণা পোষণ করেন। গত ৫ মে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় আয়োজন মেট গালায় প্রথমবারের মতো অংশ নেন তিনি।
এ বছরের থিম ছিল ‘ফ্যাশন মানেই শিল্প’। এই থিমেই করণ ভারতীয় শিল্পকলা ও সংস্কৃতির বার্তাবাহক রূপে হাজির হন। সেখানে তিনি মানিশ মালহোত্রার ভিনটেজ জ্যাকেট ও কেপে চোখ ধাঁধিয়েছেন হাজার হাজার দর্শকের, ইন্টারনেটেও কুড়োচ্ছেন ভুরিভোজ প্রশংসা।
দর্শকদের মতে, তিনি ছিলেন মেট গালার সবচেয়ে সুসজ্জিত পুরুষ। অনেকেই তাকে জনপ্রিয় তারকা ও সংগীতশিল্পী প্রিন্সের সঙ্গে তুলনা করেছেন। রাজা রাভি ভার্মার একাধিক ছবি জোড়া দিয়ে সাজানো হয়েছে দামি এই লুক। যেখানে প্রতিটি ছবির নিজস্ব একেকটা গল্প আছে।
সেখানে করণ বলেছেন, ‘আমার চলচ্চিত্রে পোশাক সব সময়ই চরিত্রের বড় একটি অংশ। এটি একই সঙ্গে আবেগের প্রকাশ ও গল্পের ধারক। তাই আমার কাছে এই থিম আসলে এমন এক আলাপ, যা আমি বহু দশক ধরে করে আসছি।’
রাজা রাভি ভার্মার ছবিতেও সাবজেক্টের কাপড়ের ভাঁজ ও চলন যেন বলে দেয়, মানুষ কী অনুভব করছে, কী গল্প লুকিয়ে আছে তার ভেতরে। আমরা বিদেশি জিনিস যতটা প্রচার করি ততটা নিজের বেলায় করি না, করণ যেন তার নতুন লুকে সেই ধারণাটিই ভেঙে দিলেন।
স্টেটমেন্ট লুক : কেন পরলেন, কী বোঝালেন
করণ জোহরের পোশাকটি ডিজাইন করেছেন তার দীর্ঘদিনের সহযোগী মানিশ মালহোত্রা। স্টাইল করেছেন ইকা লাখানি। এটি ভারতীয় কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী রাজা রাভি ভার্মার শিল্পকলা থেকে অনুপ্রাণিত একটি ‘ওয়েরেবল আর্ট’ বা পরিধানযোগ্য শিল্পকর্ম। ভারতীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক শিল্পের মিশ্রণে তৈরি এটি একটি হাই-ফ্যাশন কৌচার পিস।
করণ জোহর নিজেই তার ইনস্টাগ্রাম পোস্টে দিয়েছেন, ‘রাজা রাভি ভার্মাকে বেছে নেওয়ার কারণ, আমি যা সিনেমায় দেখাতে চাই, সেটি তিনি তার কাজেই করে দেখিয়েছেন। তিনি অনুভূতির ছবি আঁকতেন।’
তার পোশাকটি যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি, আবেগ ও কৃতজ্ঞতা একসঙ্গে বোনা হয়েছে। ডিজাইনার মানিশ মালহোত্রাকে উদ্দেশ করে করণ বলেছেন, ‘ভারতীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পোশাকের নকশা ও বুননশৈলীর মিশ্রণই এখন একধরনের শিল্পে পরিণত হয়েছে, যা তিনি নিপুণভাবে আয়ত্ত করেছেন।’
জামার বিবরণ : কেইপ ও জামা থাকার ছবির মানে কী
যা দেখা যাচ্ছে, তার প্রতিটি মোটিফ সম্পূর্ণ হাতে আঁকা। ৫০ জনের বেশি শিল্পী ৫ হাজার ৬০০ ঘণ্টা ধরে ৮৬ দিনে এটি তৈরি করেছেন। এমব্রয়ডারিতে দেওয়া হয়েছে অ্যাক্রিলিক ও তেলরঙের ফিনিশিং ও বার্নিশ- যাতে জামাটি আসল পেইন্টিংয়ের মতোই প্রাণবন্ত থাকে।
বর্ডারগুলো রাবার দেওয়া বেইসের ওপর জরদৌজি দিয়ে লেয়ার করে বানানো। যার ফলে নকশাটি ভাস্কর্যের মতো উঁচু ও ঘন হয়েছে। ছবিগুলো জামার পটে ত্রিমাত্রিকভাবে ফুটে উঠেছে।
পুরো পোশাকটিই হাতে করা, সাধারণত কেউ দেখবে না এমন ডিটেইল- যেমন জ্যাকেটের লাইনিংটাও হাতে আঁকা।
তার ভাষায়, ‘শুরু থেকেই আমি কিছুই অনুকরণ বা ছোট পরিসরে না করার সিদ্ধান্ত নেই। কোনো প্রিন্ট নয়, কিছু ডিজিটাল নয়।’ ভার্মার মতো একজন শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে তার কাজের ধরনকে সম্মান করা, তাই এটি হতে হবে সম্পূর্ণ হাতে তৈরি। ‘প্রতিটি ব্রাশস্ট্রোক আসল হতে হবে, প্রতিটি এমব্রয়ডারি নিখুঁত হতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
করণের পোশাকের নাম ছিল ‘ফ্রেমড ইন ইটার্নিটি’। যেন শিল্প ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত মেলবন্ধন। এতে ছিল রাজকীয় শোল্ডার প্যাডসহ একটি কালো ভিনটেজ জ্যাকেট এবং প্রায় ছয় ফুট লম্বা হাতে আঁকা কেপ। নিজের গয়নার ব্র্যান্ড ‘তিয়ানীর’ রত্নখচিত মাল্টি-জেমস্টোন নেকলেস ও আংটি তার লুকে এনেছিল রাজকীয় আভিজাত্য।
জ্যাকেটে আঁকা ছিল ‘লেডি হোল্ডিং আ ফ্রুট’, আর ওপরের বড় কেপে ফুটে উঠেছে রাজা রাভি ভার্মার বিখ্যাত চিত্রগুলো— ডান পাশে হংসা দাময়ন্তী, বামে কাদম্বরী আর মাঝখানে অর্জুন ও সুভ্রদ্রা। কেপে ব্যবহৃত হয়েছে থ্রিডি স্কাল্পটিং, কুইল্টিং ও জরদৌজি অ্যামব্রয়ডারি, যা এটিকে পরিধানযোগ্য শিল্পে পরিণত করেছে।
কেইপে যা যা আছে
রবি বর্মা ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনির চরিত্রগুলোকে ইউরোপীয় শিল্পরীতির মিশেলে অপরূপভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার মধ্যে থেকে কয়েকটি তুলে ধরা হলো এখানে।
ফলধারিণী নারী
চিত্রটি ইউরোপীয় ও ভারতীয় নান্দনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। নারীর হাতে থাকা ফলটি আকাঙ্ক্ষা, জ্ঞান ও প্রলোভনের প্রতীক। এটি জীবনের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে ইঙ্গিত করে। তার মুখ ও দেহভঙ্গিতে আছে লজ্জা, আগ্রহ ও সরলতা।
পরনে শাড়ি, হাতে একটি ছোট হলুদ ফল ধরে রেখেছেন এক নারী। তার পোশাকের রঙ গোলাপি ও সোনালি। সঙ্গে হলুদ ব্লাউজ। পরেছেন সোনার কানপাশা, নাকের নথ, হার ও চুড়ি।
পটভূমি গাঢ় রঙের হওয়ায় নারীটির অবয়ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। নরম আলো তার পোশাক ও গয়নার দীপ্তি বাড়িয়েছে, যেন বাস্তবের সঙ্গে স্বপ্নের সীমারেখা মিলিয়ে যায়।
হংস দাময়ন্তী
মহাভারতের বনপর্বে দময়ন্তী ও নলের গল্প বলা হয়েছে। এখানে আছে অদেখা প্রেমের আকর্ষণ, ভাগ্যের টানাপড়েন, দেবতার ছলনা। একদিকে নলের দ্বিধা, দায়িত্ব ও কামনা, অন্যদিকে দময়ন্তীর প্রেম ও দৃঢ়তা। শেষ পর্যন্ত দময়ন্তীর অটল প্রেম দেবতাদেরও নত করে।
কাদম্বরী
একজন নারী মার্বেল পাটিতে বসে সেতার বাজাচ্ছেন। নাম তার কাদম্বরী। পোশাকে ফুটে উঠেছে অভিজাত্যে। পরনে ভেলভেটের স্লিপার, পাশে রয়েছে ময়ূরের পালক দিয়ে সাজানো পাখা। সিতারের সুরে সম্পূর্ণ নিমগ্ন তিনি, সম্ভবত এই কারণেই প্রথমে ছবিটির নাম রাখা হয়েছিল ‘সঙ্গীতের আছে মোহময়তা’।
এই চিত্রটি রবি বর্মার জীবনের শেষ দিকের কাজগুলোর একটি। ‘কাদম্বরী’ ছিল তার মৃত্যুর (১৯০৬) আগে আঁকা অন্যতম এক ছবি। তার আঁকা মূল ছবির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই চিত্রটি রবি বর্মা প্রেসে প্রকাশিত একটি প্রিন্ট।
অর্জুন ও সুভদ্রা
রবি বর্মার আঁকা ‘অর্জুন ও সুভদ্রা’ চিত্রটি মহাভারতের প্রেম ও ভক্তির উপাখ্য্যান। ছবিতে অর্জুন তপস্বীর বেশে হাত বাড়িয়ে সুভদ্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন; আর সুভদ্রা যেন তাকে ঠিক সরিয়েও দিচ্ছেন না আবার কাছেও যাচ্ছেন না। চারপাশে শান্ত প্রাকৃতিক দৃশ্য-সবুজ গাছপালা ও পাথরের কূপ।
মহাভারতে সুভদ্রা ছিলেন কৃষ্ণ ও বলরামের বোন। অর্জুন তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বলরাম তাকে দুর্যোধনের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তখন কৃষ্ণ, দুই তরুণ-তরুণীর গভীর প্রেম বুঝে, অর্জুনকে সুভদ্রাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে বলেন।
এমনকি কৌশল হিসেবে দেন মজার সমাধান— সুভদ্রা রথের সারথি হয়ে অর্জুনকে অপহরণ করার ভান করবেন, যাতে বাইরে থেকে মনে হয় তিনিই তাকে নিয়ে গেছেন। প্রথমে বলরাম ক্ষুব্ধ হলেও কৃষ্ণের কথায় শান্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের বিয়ে দেন।
রাজা রাভি ভার্মা
রাজা রাভি ভার্মা আঠারো শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী। তিনি ইউরোপীয় রিয়েলিজমকে ভারতীয় পুরাণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে নতুন একটি ধারার সৃষ্টি করেন।
তার বিখ্যাত কাজের মধ্যে রয়েছে ‘শকুন্তলা’, ‘শ্রী রামা ভ্যানকুইশিং দ্য সি’, ‘জটায়ু বধ’, ‘হরিশচন্দ্র ইন ডিসট্রেস’ ইত্যাদি। তিনি প্রথম ভারতীয় শিল্পী, যিনি তেলরঙ এবং লিথোগ্রাফিক প্রিন্টিং জনপ্রিয় করেন।
তার শিল্পে নারী চরিত্রের সৌন্দর্য, ভারতীয় পুরাণের দেব-দেবীর মানবিক রূপ এবং পুরাণের আবেগ বাস্তবতার সঙ্গে মিশে গেছে। তার কাজ ভারতীয় সংস্কৃতির শিকড়ের গভীরে প্রোথিত, যেখানে আবেগ, ধর্ম, ও মানবতা একসঙ্গে মিশে যায়। অনিন্দ্যসুন্দর এসব পোর্ট্রেটে ভারতীয় নারীর অনন্য রূপ তার মতো করে খুব মানুষই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। করণ জোহারের পোশাকে সেই শিকড়ের প্রতিফলন দেখা যায়— ভার্মার ছবির রাজকীয় পিলার, পদ্মফুল, অলংকার ও রাজকন্যার আবেগ যেন কাপড়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
রাজা রাভি ভার্মা কোনো রাজা ছিলেন না। তিনি কেরালার কালিমানুর শহরের এক সামন্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া প্রতিভাবান চিত্রকর। তবে তার খ্যাতি ও ট্রাভাঙ্কোর রাজপরিবারের সমাদরে তার নামের সঙ্গে ‘রাজা’ উপাধি যুক্ত হয়েছিল।
কেমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন করণ
তার পোশাক ও উপস্থিতি নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা হয়েছে। ফ্যাশন সমালোচকরা বলেছেন, করণ ‘থিমটি পুরোপুরি ধারণ করেছেন’ এবং ‘ভারতীয় শিল্পকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।’ দর্শকরা মন্তব্য করেছেন, ‘করণ যেন রাজা রাভি ভার্মার ছবির মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা এক জীবন্ত চরিত্র।’




